Bank Resolution Act-এর বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের প্রস্তাব; সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ নিয়ে নতুন আইনি অবস্থান
ঢাকা | ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক পুনর্গঠনের সময় সাবেক মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে জাতীয় সংসদে Bank Resolution (Amendment) Bill, 2026 উত্থাপন করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার বিলটি সংসদে দেন। এতে Bank Resolution Act, 2026-এর ধারা ১৮(ক) বাতিল করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমান আইনের ওই ধারা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, কারণ এর মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত বা রেজল্যুশনে যাওয়া কোনো ব্যাংকের সাবেক মালিক বা পরিচালক নির্দিষ্ট শর্তে আবার নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারতেন। প্রস্তাবিত সংশোধনী সেই পথ বন্ধ করবে। বিলটি ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে এবং কমিটিকে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
৭.৫ শতাংশ টাকা দিলেই কি নিয়ন্ত্রণ ফেরত পাওয়া যেত
The Daily Star-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইনের ধারা ১৮(ক)-তে সাবেক মালিকদের জন্য এমন একটি ব্যবস্থা ছিল, যাতে রাষ্ট্র বা বাংলাদেশ ব্যাংক যে পরিমাণ অর্থ সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকে ঢেলেছে তার ৭.৫ শতাংশ প্রথমে পরিশোধ এবং বাকি ৯২.৫ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের সুযোগ ছিল। এই বিধানকে অনেকে দুর্বল ব্যাংকের সাবেক মালিকদের জন্য বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখছিলেন।
সমালোচকদের উদ্বেগ ছিল, জনগণের অর্থে একটি ব্যাংক পুনর্গঠন করার পর সাবেক মালিক তুলনামূলক সহজ শর্তে আবার সেই ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে ফিরতে পারেন। নতুন সংশোধনী সেই সম্ভাবনা বাদ দিতে চায়।
কেন এই ধারা নিয়ে এত আলোচনা
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং সুশাসনের দুর্বলতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে নতুন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক গঠনের পর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Bank Resolution Act মূলত এমন পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য, যখন কোনো ব্যাংক গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়ে এবং আমানতকারী ও আর্থিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে নিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাংক পুনর্গঠন করতে হয়।
সরকার কেন এখন ধারা বাদ দিতে চাইছে
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণের বিবৃতিতে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আইন কার্যকর হওয়ার পর কেউ ধারা ১৮(ক)-এর পূর্ণ শর্ত মেনে আবেদন করেননি। সরকারের যুক্তি হলো, যেহেতু এই বিধানের ব্যবহার হয়নি, তাই এটি বাতিল করাই উপযুক্ত।
তবে এর পাশাপাশি বৃহত্তর নীতিগত বিষয়ও রয়েছে। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুনর্গঠনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহার হলে সেই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে—এ প্রশ্নে স্পষ্ট ও কঠোর নিয়ম না থাকলে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সংশোধনী পাস হলে কী বদলাবে
ধারা ১৮(ক) বাতিল হলে সাবেক মালিকদের জন্য ওই বিশেষ পুনরুদ্ধার পথ আর থাকবে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে ব্যাংকের মালিকানা নিয়ে সব আইনি প্রশ্নের সমাধান হয়ে যাবে। ব্যাংক রেজল্যুশনের ক্ষেত্রে শেয়ার, সম্পদ, দায় এবং আমানতকারীর স্বার্থ কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে—এসব প্রশ্ন আইন ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার অন্যান্য অংশের ওপরও নির্ভর করবে।
ব্যাংকিং খাতে এর বড় বার্তা কোথায়
প্রস্তাবিত সংশোধনী সবচেয়ে বড় যে বার্তা দেয় তা হলো—রাষ্ট্রীয় অর্থে উদ্ধার করা কোনো দুর্বল ব্যাংকের ওপর পুরোনো মালিকের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ সহজ রাখা হবে না।
এটি ভবিষ্যতের ব্যাংক রেজল্যুশন প্রক্রিয়ায় আমানতকারীর স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় অর্থের সুরক্ষা এবং মালিকানার জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয়কে আরও স্পষ্টভাবে আলাদা করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
📊 প্রস্তাবিত আইনি পরিবর্তন
• বাতিলের প্রস্তাব: ধারা ১৮(ক)
• প্রথম পর্যায়ে পরিশোধের পুরোনো বিধান: ৭.৫%
• অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের সময়: ২ বছর
• প্রস্তাবকারী: অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী
• বিলের বর্তমান অবস্থা: সংসদীয় কমিটিতে
🧭 এখন নজর সংসদীয় কমিটির দিকে
কমিটির পর্যালোচনার পর বিলের চূড়ান্ত ভাষা ও পরবর্তী সংসদীয় ধাপ স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক রেজল্যুশনের বৃহত্তর কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট সমাধান শুধু আইন বদলালেই হবে না; ঋণ আদায়, সুশাসন, মালিকানার জবাবদিহি এবং আমানতকারীর সুরক্ষা—সবগুলো ক্ষেত্রেই বাস্তব পরিবর্তন দরকার।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ, বাংলাদেশ ব্যাংক, The Daily Star, BSS।




