Homeনাগরিক দর্পণপ্রতি ২০ মিনিটে একটি শিশু নিখোঁজ? সাত মাসে ১৫,৯১৭ জিডি—শিশুরা যাচ্ছে কোথায়

প্রতি ২০ মিনিটে একটি শিশু নিখোঁজ? সাত মাসে ১৫,৯১৭ জিডি—শিশুরা যাচ্ছে কোথায়

জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ে শিশু নিখোঁজের অভিযোগে ১৫ হাজার ৯১৭টি সাধারণ ডায়েরি; তবে কতজন ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কতজন অপহরণ বা পাচারের শিকার—তার পূর্ণাঙ্গ জাতীয় হিসাব কোথায়?

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

একটি শিশু সকালে স্কুলে গেল, বিকেলে আর ফিরল না। কেউ খেলতে বেরিয়ে হারিয়ে গেল, কেউ বাজারে গিয়ে আর বাড়ি ফেরেনি। কোনো শিশু অভিমানে ঘর ছেড়েছে, কেউ পথ হারিয়েছে, আবার কারও ক্ষেত্রে সন্দেহ উঠেছে অপহরণ বা পাচারের। এরপর শুরু হয় পরিবারের দৌড়ঝাঁপ—থানা, হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, সিসিটিভি ফুটেজ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে দেশের থানাগুলোতে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ১৫ হাজার ৯১৭টি সাধারণ ডায়েরি হওয়ার তথ্য নতুন করে সেই উদ্বেগ সামনে এনেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে ১ হাজার ৭৬৮, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৩৯২, মার্চে ১ হাজার ৭০৮, এপ্রিলে ২ হাজার ৬৬০, মে-তে ২ হাজার ৫৬, জুনে ৩ হাজার ১৬৩ এবং জুলাইয়ে ৩ হাজার ১১টি জিডি হয়েছে। এই হিসাবে সাত মাসে দৈনিক গড়ে ৭৫টিরও বেশি নিখোঁজ-সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে। তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি—১৫ হাজার ৯১৭টি জিডি মানেই ১৫ হাজার ৯১৭ শিশু এখনো নিখোঁজ নয়। অনেক শিশু পরে ফিরে আসে বা উদ্ধার হয়। প্রকৃত উদ্বেগের জায়গা হলো, এই বিপুল সংখ্যার মধ্যে কতজন ফিরে এসেছে, কতজন এখনো নিখোঁজ, কতটি ঘটনায় অপহরণ বা পাচারের সন্দেহ পাওয়া গেছে এবং কতটি মামলা হিসেবে এগিয়েছে—তার একটি সমন্বিত, নিয়মিত ও সর্বজনীন জাতীয় চিত্র সাধারণ মানুষের সামনে নেই।

সংখ্যাটাই বড় খবর নয়, বড় খবর হলো সংখ্যার ভেতরের অন্ধকার

একটি নিখোঁজ-জিডি আসলে একটি পরিবারের সংকটের শুরু। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা থানার রেজিস্টারে থেকে গেলে জাতীয় ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি হয় না। একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর উদ্ধার হয়ে গেলে তার জিডির status কীভাবে বদলাল, কোথায় পাওয়া গেল, কত সময় পরে পাওয়া গেল এবং কী কারণে সে নিখোঁজ হয়েছিল—এসব তথ্য যদি কেন্দ্রীয় ডেটাবেসে যুক্ত না হয়, তাহলে নিখোঁজ শিশুর প্রকৃত সংখ্যা, দীর্ঘমেয়াদি নিখোঁজের হার কিংবা ঝুঁকির ধরন নির্ধারণ করা কঠিন। ফলে ১৫ হাজার ৯১৭ সংখ্যাটি একই সঙ্গে বড় সতর্কসংকেত এবং একটি বড় তথ্য-ঘাটতির প্রতীক।

প্রথম ভুলটি হবে—সব নিখোঁজ শিশুকে অপহৃত ভাবা

শিশু নিখোঁজ হলেই যে সে অপরাধচক্রের হাতে পড়েছে, এমন নয়। পারিবারিক বিরোধ, অভিমান, পথ হারানো, বন্ধু বা আত্মীয়ের সঙ্গে চলে যাওয়া, জনসমাগমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত পরিস্থিতিতেও শিশু নিখোঁজ হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত ঘটনাটিও সত্য—অপহরণ ও মানবপাচার বাস্তব ঝুঁকি। তাই জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো প্রতিটি missing-child case-কে দ্রুত risk classification-এর আওতায় আনা। অর্থাৎ কোনটি routine missing, কোনটি suspected abduction, কোনটি trafficking risk এবং কোনটি high-risk case—প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা নির্ধারণ করতে হবে।

শিশুপাচারের ঝুঁকি বাস্তব, এবং সেটি কেবল সীমান্তে নয়

ইউনিসেফের ২০২৫ সালের Stopping the Traffic প্রতিবেদনে বাংলাদেশে নারী ও শিশু পাচারের ঝুঁকি এখনো গুরুতর বলে তুলে ধরা হয়েছে। দারিদ্র্য, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি, অনিরাপদ অভিবাসন, সামাজিক দুর্বলতা এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার ঘাটতি পাচারের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়েছে, আইনি কাঠামো থাকার পরও detection ও survivor support এখনো পর্যাপ্ত নয়।

আর একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—শিশু পাচার মানেই বিদেশে নিয়ে যাওয়া নয়। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ trafficking-এর বড় উপস্থিতির কথাও উঠে এসেছে। অর্থাৎ গ্রাম থেকে শহর, এক জেলা থেকে অন্য জেলা, পরিবার থেকে কর্মস্থল কিংবা রাস্তার জীবন—দেশের ভেতরেই একটি শিশু শোষণের শিকার হতে পারে। তাই “শিশুটি সীমান্ত পেরিয়েছে কি না” প্রশ্নের পাশাপাশি “দেশের ভেতরে কোথায় নেওয়া হয়েছে”—এই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুরা পাচার হলে তাদের কী হতে পারে?

একটি নিখোঁজ শিশুকে খুঁজতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে সম্ভাবনাগুলো তদন্তে রাখা প্রয়োজন, তার মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক শ্রম, গৃহকর্ম, ভিক্ষাবৃত্তি, যৌন শোষণ, অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার এবং অন্য ধরনের exploitation। আন্তর্জাতিক trafficking assessments-এ বাংলাদেশি শিশুদের কৃষিকাজ, ইটভাটা, গৃহকর্ম, নির্মাণ, মাছ ও অন্যান্য শ্রমে শোষণ এবং কিছু ক্ষেত্রে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ কোনো শিশু ফিরে না এলে শুধু “অপহরণ” খুঁজলে তদন্ত অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে; তাকে কোনো চক্র শ্রম, ভিক্ষা বা অন্য শোষণের কাজে ব্যবহার করছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার।

তাহলে কি অঙ্গ পাচারকারীদের হাতেও যাচ্ছে শিশুরা?

এটি এমন একটি প্রশ্ন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক তৈরি করে। কিন্তু এখানে তথ্য ও গুজবকে আলাদা করা জরুরি। বাংলাদেশে নিখোঁজ শিশুদের বড় একটি অংশ অঙ্গ পাচারের শিকার হচ্ছে—এমন কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ আমাদের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিকভাবে organ removal-এর উদ্দেশ্যে trafficking একটি বাস্তব অপরাধ হলেও এটি জটিল এবং সাধারণত চিকিৎসা অবকাঠামো, মধ্যস্থতাকারী, রোগী ও অর্থের সমন্বিত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কোনো শিশু নিখোঁজ হলেই তার অঙ্গ কেটে নেওয়া হয়েছে—এমন ধারণা প্রমাণ ছাড়া ছড়ানো বিপজ্জনক।

অন্যদিকে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনায় organ trafficking-এর concrete evidence পাওয়া গেলে অবশ্যই সেটি আলাদা করে তদন্ত করতে হবে। কিন্তু “হারিয়ে যাওয়া শিশু মানেই অঙ্গ পাচার”—এমন ধারণা বাস্তব তদন্তকে ভুল দিকে নিয়ে যেতে পারে এবং প্রকৃত নিখোঁজ শিশুর সন্ধানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ভিক্ষাবৃত্তির জন্য শিশু চুরি—আশঙ্কাটি কিন্তু উড়িয়ে দেওয়ার নয়

বাংলাদেশের trafficking assessments-এ শিশুদের জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তি ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার কথা বহুবার এসেছে। বিশেষ করে street situations-এ থাকা শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। ইউনিসেফের সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশে এমন বিপুলসংখ্যক শিশু রয়েছে, যারা parental care-এর বাইরে বা রাস্তায় বসবাস করে এবং trafficking, exploitation ও abuse-এর ঝুঁকিতে থাকে। তাই নিখোঁজ শিশুদের মধ্যে কেউ উদ্ধার হওয়ার পর কোথায় পাওয়া গেল এবং কী অবস্থায় পাওয়া গেল—এই তথ্য জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হলে ভিক্ষাবৃত্তি বা শ্রমে ব্যবহারের মতো pattern চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।

‘মুন এলার্ট’: নতুন উদ্যোগ, কিন্তু এটি কি যথেষ্ট?

নিখোঁজ ও অপহৃত শিশু দ্রুত উদ্ধারের জন্য ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশ যৌথভাবে MUN Alert চালু করে। এর জরুরি হেল্পলাইন ১৩২১৯, পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়। সিআইডি প্রথম তিন ঘণ্টাকে ‘Golden Time’ হিসেবে গুরুত্ব দিয়েছে—কারণ এই সময়ের মধ্যে শিশুর সর্বশেষ অবস্থান, সিসিটিভি, প্রত্যক্ষদর্শী ও মোবাইল-সংক্রান্ত তথ্য কাজে লাগানোর সুযোগ সবচেয়ে বেশি থাকে।

MUN Alert-এর ওয়েবসাইটে missing-child-এর পৃথক case database রয়েছে এবং সেখানে প্রতিটি কেসের জন্য unique case ID, ছবি, সর্বশেষ দেখা স্থান ও যোগাযোগের তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

তবে এই প্ল্যাটফর্মের সংখ্যা আর পুলিশের থানাভিত্তিক মোট জিডির সংখ্যা এক নয়। একটি MUN Alert case national missing-child statistics-এর সব কেসকে প্রতিনিধিত্ব করে না। তাই MUN Alert গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই এখনো পুরো সমস্যার জাতীয় চিত্র নয়।

সাইটে আছে ‘অ্যাকটিভ কেস’—কিন্তু জাতীয় হিসাব কোথায়?

MUN Alert-এর active-cases পেজে সাম্প্রতিক সময়ে ১৪৯টি সক্রিয় নিখোঁজ কেস দেখানো হয়েছে। সেখানে ঢাকা, রংপুর, গাজীপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন এলাকার শিশুদের তথ্য রয়েছে।

এই সংখ্যা দেখেই আবার প্রশ্ন আসতে পারে—তাহলে ১৫ হাজার ৯১৭ কোথায়?

উত্তর হলো, দুটি তথ্যের প্রকৃতি এক নয়। ১৫ হাজার ৯১৭ হলো পুলিশের থানাভিত্তিক reported missing GD, আর MUN Alert-এর ১৪৯ হলো তাদের প্ল্যাটফর্মে থাকা active cases। তাই একটিকে আরেকটির সঙ্গে তুলনা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। বরং দুটিকে সমন্বয় করাই হওয়া উচিত পরবর্তী বড় কাজ।

প্রতি নিখোঁজ শিশুর জন্য একটি ‘ইউনিক কেস আইডি’ দরকার

একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে থানায় জিডি নম্বরের পাশাপাশি জাতীয় একটি ইউনিক case ID তৈরি করা যেতে পারে। এরপর সেই শিশুর পুরো যাত্রাপথ ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে—কখন নিখোঁজ, কোথায় শেষ দেখা, কারা পরিবারের সদস্য, কোন থানায় জিডি, কোন কর্মকর্তার কাছে তদন্ত, কোন কোন CCTV সংগ্রহ হয়েছে, মোবাইল ট্র্যাকিং হয়েছে কি না, উদ্ধার হয়েছে কি না এবং উদ্ধার হলে কোন পরিস্থিতিতে পাওয়া গেছে।

এই একীভূত ব্যবস্থা তৈরি হলে কয়েক মাসের মধ্যেই রাষ্ট্র বুঝতে পারবে—শিশুরা আসলে কোথায় হারায়, কোন এলাকা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং নিখোঁজের পর তাদের কী ধরনের পরিণতি হচ্ছে।

প্রথম তিন ঘণ্টা—তদন্তের সোনালি সময়

MUN Alert-এর উদ্যোগে প্রথম তিন ঘণ্টাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাস্তবেও সময় এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু হারিয়ে যাওয়ার পরপরই তার সর্বশেষ দেখা স্থান, CCTV, রিকশা/গাড়ির চলাচল, মোবাইল লোকেশন, দোকানের ক্যামেরা এবং প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি সংগ্রহ করা সহজ। কয়েক ঘণ্টা পর CCTV footage overwrite হতে পারে, মোবাইল বন্ধ হয়ে যেতে পারে, আর প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনাটি ভুলে যেতে পারেন।

তাই থানায় জিডি গ্রহণ করেই যদি একটি automatic rapid-response protocol চালু হয়, তাহলে নিখোঁজ শিশুকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বাড়তে পারে।

শিশু নিখোঁজের ঘটনায় কি বিশেষ টাস্কফোর্স প্রয়োজন?

বাংলাদেশে মানবপাচার প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন কমিটি, কর্তৃপক্ষ ও সমন্বয় কাঠামো ইতোমধ্যে রয়েছে। তাই “কোনো টাস্কফোর্স নেই”—এমন দাবি সঠিক নয়। কিন্তু নিখোঁজ শিশুকে কেন্দ্র করে পুলিশ, সিআইডি, ডিবি, সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সমাজসেবা, হাসপাতাল, শিশু আশ্রয়কেন্দ্র, স্থানীয় প্রশাসন ও এনজিওগুলোকে একই case file-এর অধীনে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্ত করার মতো একটি dedicated national mechanism কতটা কার্যকর—সেটিই বড় প্রশ্ন।

আমাদের প্রস্তাব, নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার আগে বিদ্যমান কাঠামোগুলোকে একটি National Missing Children Rapid Response Cell-এর অধীনে প্রযুক্তিগতভাবে সংযুক্ত করা হোক। প্রয়োজনে এটি Police Headquarters-এর অধীনে একটি বিশেষ সমন্বয় সেল হতে পারে, যার সঙ্গে MUN Alert ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থা real-time data exchange করবে।

এই টাস্ক সেলের কাজ কী হতে পারে?

কোনো শিশুর নিখোঁজের খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় থানাকে সহায়তা করা, high-risk case চিহ্নিত করা, দ্রুত CCTV ও মোবাইল ডেটা সংরক্ষণে ব্যবস্থা নেওয়া, বাস-রেল-লঞ্চ টার্মিনাল ও সীমান্ত পয়েন্টে alert পাঠানো, শিশু আশ্রয়কেন্দ্র ও হাসপাতালের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে verified alert ছড়ানো এবং শিশু উদ্ধার হলে কী পরিস্থিতিতে পাওয়া গেছে তা database-এ নথিভুক্ত করা—এগুলো হতে পারে এর মূল দায়িত্ব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একটি শিশু উদ্ধার হওয়ার পরও তদন্ত শেষ হবে না। সে কীভাবে নিখোঁজ হয়েছিল এবং কোথায় ছিল—সেটির কারণ বিশ্লেষণ করতে হবে। কারণ সেই তথ্যই পরবর্তী ১০টি শিশুকে বাঁচাতে পারে।

সীমান্তে নজরদারি যথেষ্ট নয়

পাচার নিয়ে আলোচনা হলেই সীমান্তকেন্দ্রিক ভাবনা চলে আসে। কিন্তু শিশুপাচারের বড় অংশ দেশের ভেতরেই ঘটতে পারে। তাই সীমান্তে নজরদারির পাশাপাশি বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, ঘাট, শহরের শ্রমবাজার, ইটভাটা, গৃহকর্মের বাজার, অনানুষ্ঠানিক শ্রমক্ষেত্র এবং ভিক্ষাবৃত্তির চক্র—সব জায়গাকেই trafficking risk zone হিসেবে মানচিত্রে আনতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: উদ্ধারেও শক্তিশালী, ভুল তথ্যের ক্ষেত্রেও বিপজ্জনক

একটি শিশুর ছবি কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এটি উদ্ধার কার্যক্রমে বিশাল সুবিধা। কিন্তু ভুল ছবি, পুরোনো ছবি বা ভুয়া অপহরণ তথ্যও একই গতিতে ছড়াতে পারে। ফলে শিশুর পরিচয় ও ছবি প্রচারে কিছু নিরাপত্তা নীতি থাকা দরকার। MUN Alert ইতোমধ্যে case ID, verified report এবং child-first privacy-এর ধারণা ব্যবহার করছে।

গণমাধ্যম ও সাধারণ ব্যবহারকারীদেরও পুলিশের যাচাই ছাড়া কোনো শিশুর ছবি “অপহরণকারী” বা “পাচারকারী” বলে প্রচার করা উচিত নয়। তাতে নিরপরাধ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং তদন্ত বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

পরিবারের জন্য সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি অভ্যাস

শিশুকে অন্তত একজন অভিভাবকের মোবাইল নম্বর মুখস্থ করানো, সম্প্রতি তোলা পরিষ্কার ছবি সংরক্ষণ, জন্মনিবন্ধনের তথ্য হাতে রাখা এবং জনসমাগমে বাড়তি নজর রাখা জরুরি। শিশু নিখোঁজ হলে প্রথমেই থানায় জিডি করতে হবে এবং একই সঙ্গে ৯৯৯ ও MUN Alert-এর ১৩২১৯ নম্বরে জানানো উচিত। MUN Alert নিজেও দ্রুত রিপোর্ট করার ওপর জোর দেয়।

দাবি বনাম বাস্তবতা

বিষয়বর্তমান বাস্তবতা
২০২৬ সালের জানুয়ারি–জুলাইয়ে ১৫,৯১৭ নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি✅ প্রকাশিত পুলিশ-তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন
১৫,৯১৭ শিশু এখনো নিখোঁজ❌ এমন তথ্য নেই
প্রতিটি নিখোঁজ শিশু অপহৃত❌ নয়
শিশুপাচার বাংলাদেশে বাস্তব ঝুঁকি✅ আন্তর্জাতিক গবেষণা ও মূল্যায়নে সমর্থিত
নিখোঁজ শিশুদের বড় অংশ অঙ্গ পাচারের শিকার❌ জাতীয় প্রমাণ নেই
শিশুকে জোরপূর্বক ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়✅ trafficking assessments-এ নথিভুক্ত
MUN Alert চালু হয়েছে✅ জানুয়ারি ২০২৬
MUN Alert hotline✅ ১৩২১৯; জরুরি সেবা ৯৯৯
MUN Alert-এর active cases = দেশের সব নিখোঁজ শিশু❌ নয়
MUN Alert-এ ১৪৯ active case দেখা যাচ্ছে✅ ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত
নিখোঁজ শিশুর জন্য সমন্বিত national case lifecycle দরকার✅ তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ

টুডে টিভি বিডির অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণ

বাংলাদেশে শিশু নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে আলোচনার সময় সবচেয়ে সহজ কাজ হলো ভয় তৈরি করা—“প্রতিদিন এত শিশু চুরি হয়ে যাচ্ছে”, “শিশু পাচারকারীরা সক্রিয়”, “অঙ্গ কেটে নেওয়া হচ্ছে” ইত্যাদি। কিন্তু সাংবাদিকতার কাজ আতঙ্ক তৈরি করা নয়; আতঙ্কের আড়ালে থাকা বাস্তব ঝুঁকিকে আলাদা করে বের করা।

১৫ হাজার ৯১৭টি জিডি ভয়াবহভাবে বড় একটি সংখ্যা। কিন্তু এটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া শিশুদের চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। একইভাবে প্রতিটি ঘটনাকে পাচার বা অপহরণ বলাও ভুল হবে। তবে এই সংখ্যার ভেতরে যদি কয়েকশ বা কয়েক হাজার শিশু দীর্ঘ সময় নিখোঁজ থেকে থাকে, তাহলে সেটি ছোট কোনো সমস্যা নয়।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—আমরা এখনো জাতীয়ভাবে নিশ্চিতভাবে জানি না, সেই শিশুরা কোথায়।

কতজন ফিরে এসেছে?

কতজন স্বাভাবিক কারণে হারিয়েছিল?

কতজন অপহৃত?

কতজন trafficking-এর শিকার?

কতজন শ্রমে?

কতজন ভিক্ষাবৃত্তিতে?

কতজন যৌন শোষণের শিকার?

কতজন এখনো অন্ধকারে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বের করতে হলে একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার মুহূর্ত থেকেই তাকে জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে।

MUN Alert একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা করেছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন এটিকে থানাভিত্তিক জিডি, জাতীয় পুলিশ ডেটা, সীমান্ত নজরদারি, হাসপাতাল, সমাজসেবা এবং বেসরকারি শিশু সুরক্ষা সংস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা।

প্রতিটি নিখোঁজ শিশু একটি আলাদা কেস নয়; প্রতিটি কেস একটি সম্ভাব্য জাতীয় সতর্কবার্তা।

রাষ্ট্র যদি আজ থেকেই প্রতিটি শিশুর নিখোঁজ ও উদ্ধারের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করে, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই আমরা বুঝতে পারব—বাংলাদেশে শিশুরা কোথায় হারায় এবং হারিয়ে যাওয়ার পর তাদের কী হয়।

শেষ কথা

একটি শিশুর নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা-মা যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি করেন, সেটি খুব সাধারণ—

“আমার সন্তান কোথায়?”

রাষ্ট্রের কাছে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা থাকা উচিত।

শুধু একটি জিডি নম্বর দিয়ে সেই দায়িত্ব শেষ হয় না। শুধু একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়েও কাজ শেষ হয় না। আর একটি শিশুকে পাওয়া গেলেই তদন্তও শেষ হওয়া উচিত নয়।

কারণ শিশুটি কোথায় ছিল, কেন নিখোঁজ হয়েছিল এবং কার কারণে সে বিপদে পড়েছিল—সেই উত্তর না পাওয়া গেলে একই ঝুঁকিতে আরও একটি শিশু পড়বে।

তাই এখন সময় এসেছে নিখোঁজ শিশুকে ‘থানার জিডি’ নয়, ‘জাতীয় জরুরি কেস’ হিসেবে দেখার।

অঙ্গ পাচারের গুজব নয়—প্রমাণ চাই।

পাচারের বাস্তব ঝুঁকি গোপন নয়—তদন্ত চাই।

ভিক্ষাবৃত্তি ও শিশুশ্রমে ব্যবহারের আশঙ্কা নয়—ডেটা চাই।

আর সবচেয়ে বেশি চাই—

যে শিশু আজ নিখোঁজ, সে যেন আগামীকালও শুধু একটি পোস্টারের ছবি হয়ে না থাকে।

প্রতিটি শিশুকে খুঁজে পাওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর প্রতিটি নিখোঁজ শিশুর শেষ পরিণতি জানা—একটি সভ্য সমাজের ন্যূনতম দাবি।

—টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments