৮৯ দেশের ৭১২ দলের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের দল সেরা পাঁচে; জার্মানির ELSA accelerator-এ গবেষণা পরীক্ষা করে এসেছে তরুণরা
ঢাকা | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষায় নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে পাঁচ শিক্ষার্থীর একটি দল। ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা সংস্থা CERN-এর Beamline for Schools বা BL4S প্রতিযোগিতার ১৩তম আসরে বাংলাদেশের Team POLARIS বিজয়ী হয়েছে।
এবারের প্রতিযোগিতায় ৮৯টি দেশ থেকে ৭১২টি দল অংশ নেয়। সেখান থেকে বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবের মানের ভিত্তিতে মাত্র পাঁচটি দলকে বিজয়ী নির্বাচিত করা হয়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের দল এই তালিকায় জায়গা করে নেয়।
বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ BL4S-এর ইতিহাসে এটি দেশের প্রথম বিজয়।
POLARIS-এর সদস্যরা কারা
বাংলাদেশের দলটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিয়ে তৈরি নয়। নোয়াখালী, ঢাকা ও রংপুরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিলে দলটি গঠন করেছে।
দলের সদস্যরা হলেন Salman Alam Sohan, Nazifa Tasneem, Md Abdul Rahim Parosh, Nazia Titim এবং S M Tawsif।
তাদের বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে কোচ হিসেবে যুক্ত ছিলেন Md. Nishad Ahmed Jibon।
এই বৈচিত্র্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখায়, আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণার প্রাথমিক পর্যায়েও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।
এটি সাধারণ বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা নয়
Beamline for Schools মূলত একটি physics experiment design competition।
অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের নিজেদের একটি particle physics experiment-এর পরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। সেরা দলগুলোকে পরে সত্যিকারের particle accelerator facility-তে গিয়ে সেই পরীক্ষাটি করার সুযোগ দেওয়া হয়।
২০২৬ সালে বিজয়ী পাঁচটি দল CERN, DESY এবং জার্মানির University of Bonn-এর ELSA accelerator facility-তে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে।
অর্থাৎ POLARIS-এর সাফল্য শুধু একটি পুরস্কার নয়; এটি সরাসরি আন্তর্জাতিক গবেষণা অবকাঠামোর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ।
তাদের গবেষণার বিষয় কী
POLARIS-এর প্রস্তাবের কেন্দ্রবিন্দু ছিল radiation beam monitoring এবং ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত radiotherapy।
রেডিওথেরাপিতে রোগীর টিউমারের নির্দিষ্ট অংশে সঠিক মাত্রায় radiation পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য radiation beam-এর বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করার প্রয়োজন হয়।
বাংলাদেশি দলটি পরীক্ষা করেছে, polysiloxane-ভিত্তিক scintillator বা radiation-sensitive material প্রচলিত plastic scintillator-এর একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে কি না।
তাদের লক্ষ্য ছিল materialটির radiation exposure সহ্য করার ক্ষমতা এবং detector হিসেবে ব্যবহারযোগ্যতা পরীক্ষা করা।
কেন এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ
এখানে এখনই কোনো চিকিৎসা-প্রযুক্তির চূড়ান্ত সাফল্য দাবি করা যাবে না।
POLARIS মূলত একটি research hypothesis পরীক্ষা করেছে।
যদি polysiloxane প্রত্যাশিত বৈশিষ্ট্য দেখায়, তাহলে ভবিষ্যতে radiation monitoring equipment আরও টেকসই ও নির্ভরযোগ্য করার গবেষণায় এটি কাজে লাগতে পারে।
অর্থাৎ একটি শিক্ষার্থী দল সরাসরি এমন একটি সমস্যাকে নিয়ে কাজ করেছে, যার সম্ভাব্য প্রয়োগ চিকিৎসা প্রযুক্তিতে।
ELSA accelerator-এ বাস্তব পরীক্ষা
CERN-এর তথ্য অনুযায়ী, Team POLARIS-এর experiment করার স্থান ছিল জার্মানির University of Bonn-এর ELSA accelerator।
আগস্ট ২০২৬-এ আয়োজিত BL4S programme-এ দলটি accelerator beam, detector physics, data acquisition এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ পায়।
CERN-এর ২০২৬ সালের আনুষ্ঠানিক programme-এ POLARIS-এর presentation এবং ELSA beamline-সংক্রান্ত কার্যক্রমও নথিভুক্ত রয়েছে।
অর্থাৎ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা এবার শুধু গবেষণার proposal লিখে থেমে থাকেনি; তারা বাস্তব particle accelerator-এর পরিবেশে গিয়ে experiment করার সুযোগও পেয়েছে।
৭১২ দলের মধ্যে সেরা পাঁচ
এবারের প্রতিযোগিতার পরিসর সাফল্যটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
অংশ নিয়েছে ৮৯টি দেশের ৭১২টি দল। এতে অংশগ্রহণ করেছে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী।
এই বিশাল প্রতিযোগিতা থেকে মাত্র পাঁচটি দলকে বিজয়ী করা হয়েছে।
তার একটি বাংলাদেশ।
এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষায় এর শিক্ষা কোথায়
এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় বার্তা হলো—বিজ্ঞান শিক্ষা শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।
গবেষণা মানে প্রশ্ন করা, একটি ধারণা তৈরি করা, সেই ধারণাকে পরীক্ষাযোগ্য করা এবং ফলাফল থেকে নতুন প্রশ্ন তৈরি করা।
POLARIS সেই কাজটিই করার সুযোগ পেয়েছে।
বাংলাদেশে এমন সুযোগ যত বাড়বে, স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকেই গবেষণামুখী শিক্ষার্থী তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তত বাড়বে।
আন্তর্জাতিক যোগাযোগও বড় অর্জন
এই ধরনের প্রতিযোগিতার আরেকটি বড় মূল্য হলো আন্তর্জাতিক exposure।
একজন শিক্ষার্থী যখন CERN, DESY বা University of Bonn-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান, তখন তিনি শুধু একটি experiment শিখছেন না; আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হচ্ছেন।
ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশে পদার্থবিজ্ঞান, চিকিৎসা প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও অন্যান্য বিজ্ঞানভিত্তিক ক্ষেত্রে তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে।
কিন্তু গবেষণার সুযোগ ও আন্তর্জাতিক exposure এখনও সীমিত।
POLARIS-এর মতো সাফল্য দেখাচ্ছে, সুযোগ তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সেই জায়গায় ভালো করতে পারে।
এখন প্রয়োজন এসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য স্কুল-কলেজে আরও mentorship, laboratory access, research club এবং আন্তর্জাতিক programme-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা।
শুধু পুরস্কার নয়, একটি দৃষ্টান্ত
POLARIS-এর গল্পের সবচেয়ে বড় দিক হলো—এটি দেখিয়েছে, বিশ্বমানের গবেষণা নিয়ে কাজ করার জন্য শিক্ষার্থীদের অবশ্যই বড় কোনো গবেষণাগারে আগে থেকেই থাকা প্রয়োজন নেই।
সঠিক প্রশ্ন, বৈজ্ঞানিক চিন্তা, ভালো proposal এবং কাজের প্রতি আগ্রহ থাকলে ছোট পরিসর থেকেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব।
এটি আরও অনেক শিক্ষার্থীকে এমন প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে উৎসাহ দিতে পারে।
শেষ কথা
CERN-এর Beamline for Schools-এ বাংলাদেশের প্রথম জয় একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কারের চেয়েও বেশি কিছু।
এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য একটি সম্ভাবনার সংকেত।
৮৯ দেশের ৭১২ দলের মধ্যে সেরা পাঁচে জায়গা করে নেওয়ার পর Team POLARIS বাস্তব particle accelerator facility-তে নিজেদের গবেষণা পরীক্ষা করেছে।
পরীক্ষার ফল ভবিষ্যৎ গবেষণায় কতটা কাজে আসবে, তা সময় বলবে। কিন্তু একটি বিষয় ইতোমধ্যেই পরিষ্কার—
বাংলাদেশের তরুণ শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণার কঠিন মঞ্চে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে।
এখন সেই সক্ষমতাকে নিয়মিত সুযোগ, গবেষণা অবকাঠামো ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যুক্ত করাই হবে পরবর্তী বড় কাজ।
তথ্যসূত্র: CERN Beamline for Schools, CERN, University of Bonn, DESY, BSS ও সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক গবেষণা কর্মসূচির তথ্য।




