Homeটুডে টেক১৩ মিলিয়ন ডলারের AI প্রকল্পে বাংলাদেশের বড় পদক্ষেপ, কারওয়ান বাজারে হচ্ছে জাতীয়...

১৩ মিলিয়ন ডলারের AI প্রকল্পে বাংলাদেশের বড় পদক্ষেপ, কারওয়ান বাজারে হচ্ছে জাতীয় AI Hub

দক্ষ জনবল, গবেষণা, স্টার্টআপ ও শিল্প-একাডেমিয়ার সংযোগ বাড়াতে ২০২৬–২০২৯ মেয়াদের উদ্যোগ; লক্ষ্য AI দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি

ঢাকা | ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI-কে ঘিরে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়া ২৫ আগস্ট ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি অনুদান প্রকল্পে আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি করেছে। এর লক্ষ্য দেশে AI ও উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি, গবেষণা বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ গড়ে তোলা।

‘Fostering Innovative Technology Experts with a Focus on Artificial Intelligence in Bangladesh’ নামের এই প্রকল্পটি ২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকার কারওয়ান বাজারের Software Technology Park-2-তে গড়ে উঠবে AI Hub।

AI-তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দক্ষ মানুষ

বিশ্বজুড়ে AI দ্রুত ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা ও সফটওয়্যার শিল্পের কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে। কিন্তু AI ব্যবহার করতে পারা আর AI তৈরি বা উন্নত করতে পারা এক বিষয় নয়।

বাংলাদেশে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, স্টার্টআপ ও সফটওয়্যার কোম্পানি AI নিয়ে কাজ করলেও উন্নত AI research, model development এবং বড় পরিসরে প্রযুক্তি প্রয়োগের জন্য দক্ষ মানুষের ঘাটতি এখনো রয়েছে।

নতুন AI Hub-এর মূল লক্ষ্য তাই শুধু একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র তৈরি করা নয়। বরং দক্ষতা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ব্যবসাকে একই জায়গায় আনার চেষ্টা করা।

তৈরি হবে শত শত বিশেষজ্ঞ

প্রকল্প নথিতে ৮৬৫ জন AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তি পেশাজীবীর দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ৩০টি AI-ভিত্তিক স্টার্টআপ তৈরি এবং অন্তত ১০টি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাপত্র প্রকাশের লক্ষ্যও রয়েছে।

প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের ৮০ শতাংশের কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আরও একটি বিশেষ দিক হলো, প্রযুক্তি পেশাজীবীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করতে কোরিয়ান ভাষা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

অর্থাৎ প্রকল্পটির লক্ষ্য শুধু দেশের চাকরির বাজার নয়; আন্তর্জাতিক IT বাজারেও বাংলাদেশের দক্ষ কর্মীদের প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো।

গবেষণা থেকে পণ্য, পণ্য থেকে বাজার

AI গবেষণার বড় সমস্যা হলো—অনেক সময় গবেষণার ফল বাস্তব পণ্য বা ব্যবসায় রূপ নেয় না।

এই জায়গায় AI Hub-এর পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক, শিক্ষার্থী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করা গেলে একটি ধারণা ধাপে ধাপে পণ্যে রূপ নিতে পারে।

সম্ভাব্য পথটি হতে পারে—

গবেষণা → পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি → স্টার্টআপ → পণ্য → বাজার

এই ব্যবস্থা সফল হলে AI বাংলাদেশের জন্য শুধু নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র হবে না; সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি রপ্তানিরও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা কেন গুরুত্বপূর্ণ

১৩ মিলিয়ন ডলারের পুরো অর্থই অনুদান হিসেবে দিচ্ছে Korea International Cooperation Agency বা KOICA।

২৫ আগস্ট ঢাকায় প্রকল্পের Record of Discussion এবং Terms of Reference স্বাক্ষরিত হয়েছে। ফলে দীর্ঘ প্রস্তুতির পর প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নের পথে এসেছে।

দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পভিত্তিক ডিজিটাল রূপান্তরে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাই এই সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থের উৎস নয়; প্রশিক্ষণ, জ্ঞান ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ তৈরিরও সুযোগ।

বাংলা AI-এর জন্য নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের জন্য AI-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিজস্ব ক্ষেত্রগুলোর একটি হতে পারে বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি।

বাংলা ভাষায় সরকারি নথি বিশ্লেষণ, শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, আইন কিংবা গ্রাহকসেবায় AI ব্যবহার করতে হলে স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতা বোঝে এমন system প্রয়োজন।

দেশীয় গবেষকরা যদি বাংলাদেশের নিজস্ব data ও language resources ব্যবহার করে AI solution তৈরি করতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে শুধু দেশের বাজার নয়, বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের জন্যও প্রযুক্তি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।

IT খাতে কী পরিবর্তন আসতে পারে

AI ইতোমধ্যে software development, data analysis, customer support এবং automation-এর কাজ বদলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের IT sector যদি AI-কে শুধু কর্মসংস্থানের হুমকি হিসেবে না দেখে productivity ও নতুন ব্যবসার হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও উচ্চমূল্যের সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে AI-based cybersecurity, financial technology, healthcare এবং agriculture technology-তে দেশীয় সমাধানের সম্ভাবনা রয়েছে।

বড় প্রশ্ন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর

এ ধরনের প্রকল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু ভবন নির্মাণ বা প্রশিক্ষণের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।

প্রশিক্ষণ পাওয়া ৮৬৫ জনের কতজন দীর্ঘমেয়াদে AI sector-এ কাজ করবেন, ৩০টি startup-এর কতগুলো টিকে থাকবে, গবেষণার কতটি ফল বাস্তব পণ্যে রূপ নেবে—এসবই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ২০২৯ সালের পর AI Hub কীভাবে নিজস্ব অর্থায়ন ও প্রতিষ্ঠানগত কাঠামোর মাধ্যমে টিকে থাকবে।

ব্যয়ের স্বচ্ছতাও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকল্পটির মোট ব্যয় প্রায় ১৯২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৫৯ কোটি টাকা KOICA-এর অনুদান এবং ৩৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বাংলাদেশের সরকারি অর্থায়ন।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে পরামর্শক ব্যয়, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের ব্যয় যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

এ কারণে প্রকল্পের সাফল্যের পাশাপাশি অর্থের কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের AI যাত্রায় একটি নতুন সুযোগ

বাংলাদেশ এখন আর AI-এর বাইরে নেই। কিন্তু ব্যবহারকারী দেশ থেকে প্রযুক্তি নির্মাতা দেশে যেতে হলে দক্ষ মানুষ, গবেষণা, computing infrastructure, investment এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—সবকিছু একসঙ্গে প্রয়োজন।

জাতীয় AI Hub সেই সমন্বয়ের একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

সফল হলে কারওয়ান বাজারের একটি প্রযুক্তি কেন্দ্র ভবিষ্যতে বাংলাদেশের AI গবেষক, উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি পেশাজীবীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মিলনস্থলে পরিণত হতে পারে।

শেষ কথা

দক্ষিণ কোরিয়ার ১৩ মিলিয়ন ডলারের অনুদানে শুরু হওয়া এই উদ্যোগকে তাই শুধু একটি সরকারি প্রশিক্ষণ প্রকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

এটি বাংলাদেশের AI ecosystem তৈরির একটি বড় পরীক্ষা।

দক্ষতা, গবেষণা, স্টার্টআপ, শিল্প ও আন্তর্জাতিক বাজার—এই পাঁচটি জায়গাকে যদি একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত নতুন এক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে যেতে পারে।

আর সেই পরিবর্তনের প্রথম দৃশ্যমান কেন্দ্র হতে পারে ঢাকার এই AI Hub।

তথ্যসূত্র: Economic Relations Division, ICT Division, Bangladesh Hi-Tech Park Authority, KOICA, The Daily Star, The Business Standard, BSS ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্প নথি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments