আমি কওমী মাদ্রাসায় দীর্ঘ ৭ বছর শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবা চেয়েছিলেন আমাকে মুত্তাকি এবং পরহেযগার আলেম বানাতে। ছোটকালে থাকতে আমি স্বপ্ন দেখতাম একদিন অনেক বড় আলেম হবো। তবে সময়ের ঘূর্ণাবর্তে আমার জীবনের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গেছে। বর্তমানে আমি মূলধারার (জাতীয় শিক্ষাক্রম অনুযায়ী) বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছি।আজকে একটি বিষয় আলোচনার অবতারণা করব। সাম্প্রতিক সময়ে দেখছি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছেলে শিশুদের যৌন নির্যাতন ও বলাৎকারের খবর আসছে । অপরাধের সঙ্গে জড়িত মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। এটি অবশ্যই আশাব্যঞ্জক একটি ব্যাপার।সবাই কম-বেশি এই ব্যাপার নিয়ে মুখ খুলেছেন। কওমী মাদ্রাসা সংস্কারের পক্ষে সমাজের কওমী মাদ্রাসার শুভাকাঙ্ক্ষী বর্গ এবং সচেতন ইসলাম-প্রিয় মানুষেরা সরব হয়েছেন। এসব বিষয় সচেতন পাঠক মাত্রই সকলে জানেন। তবে এর পিছনের অনুঘটক অনুসন্ধানের চেষ্টা করব। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো একটি মেয়ে শিশু ধর্ষিত হলে আমরা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠি এবং বিচারের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলি কিন্তু একটা ছেলে শিশু ধর্ষিত হলে আমরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকি। অতএব এ বিষয়ে জনপরিসরে সামান্য যা আলোচনা হয়েছে তা অবশ্যই আশাব্যঞ্জক তবে আমাদের বহু পথ পারি দিতে হবে।
কওমী মাদ্রাসায় বেশকিছু নেতিবাচক জিনিস দেখেছি।এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ছেলেদের পরস্পরের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক। সম্ভবত এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হতে পারে। প্রথমে হয়তোবা আপনাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা একটু খটকা লাগবে। ছেলে-মেয়েদের মধ্যে প্রেম হলে এটা মানা যায় কিন্তু ছেলে-ছেলে প্রেম!! জ্বি আপনি ঠিক ই পড়েছেন। তবে ব্যাপারটা আমার কাছে এতটা অস্বাভাবিক নয়। শৈশব থেকে এগুলো দেখে অভ্যস্ত। এই বিষয়টা এই লেখায় একটু গভীরভাবে পাঠ করব।তবে বলে নেওয়া ভালো। এটা কোনো গবেষণালব্ধ তথ্য বা উপাত্তের উপর ভিত্তি করে বলছি না। এটা সম্পূর্ণ আমার অভিজ্ঞতা, খালি চোখে যা দেখেছি তাই লিখছি।
সম্পর্কের ধরন: সাধারণত নর-নারীর প্রেমের পরিণয় থাকে। এখানে তা সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত। আমার হাফেজ বা অধ্যয়নরত হাফেজ বন্ধুদের দেখেছি পরস্পরের নিকট খুব গুরুতরভাবে প্রেম নিবেদন করতে। তাদের কারও নাম উল্লেখ করছি না। ছদ্মনাম হিসেবে বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করছি। ‘ক’ বন্ধুকে দেখেছি ‘খ’ বন্ধুর জন্য বিরহে ধারালো ব্লেড দিয়ে হাত কাঁটতে। ‘হাফেজ ক’ এর হাতের ক্ষত প্রায় হাফ ইঞ্চি গভীর এবং এক আঙুল পরিমাণ লম্বা ছিলো। অন্য আরেক হাফেজ বন্ধু ‘গ’ কে দেখেছি ‘ঘ’ এর জন্য বুকের ভিতর ব্লেড দিয়ে তার নামের ইংরেজি আদ্যাক্ষর এস লিখতে এবং এস অক্ষরকে কেন্দ্র করে লাভ শেপ আঁকতে। তাছাড়াও অনেক বন্ধুদের দেখেছি তার ভালোবাসার মানুষের বিরহে হাত অনেকটা গ্রিল চিকেন এর বুকের মধ্যে ফালি ফালি কাটা গোস্তের মত ঝাঁঝড়া করে ফেলেছে। এরা ভালোবাসা নিয়ে কত সিরিয়াস তার কিছু নমুনা উপস্থাপন করলাম। সংক্ষিপ্ত করলাম না হয় বাদবাকি ফিরিস্তি দিলে লেখা বড় হয়ে যাবে।
পরিবেশগত কারণ: এটা আসলে সরলভাবে পাঠ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। বিশেষ করে আমার মত অধমের পক্ষে তো নয়। বিখ্যাত সিচুয়েশনাল হোমোসেক্সুয়ালিটি তত্ত্ব দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।এই তত্ত্বের মূল কথা হচ্ছে যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো পরিবেশে দীর্ঘদিন আবদ্ধ থাকে যেখানে বিপরীত লিঙ্গের মানুষ সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিত তবে তারা সমলিঙ্গের মানুষের প্রতি সাময়িকের জন্য যৌন আকর্ষণ অনুভব করতে পারে। তবে এটি কারও যৌন অভিমুখিতা স্থায়ী পরিবর্তন করে না। আবার যখন মানুষটা সাধারণ পরিবেশে ফেরত আসে সে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন যাপন করে।এই আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে কওমী মাদ্রাসার পরিবেশ খুবই আবদ্ধ। আর বিপরীত লিঙ্গের উপস্থিতি একদম নেই। ফলে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এই ধরনের আচরণ করে।
সিদ্ধান্ত: নর-নারীর মধ্যে যৌনতার অপরিহার্যতা আছে। মোটাদাগে যৌনতার উদ্দেশ্যকে দুটো ভাগ করা যায়: ক) প্রয়োজনীয়তা, এবং খ) আনন্দ। পরবর্তী প্রজন্ম সৃষ্টির জন্য যৌনতা অত্যাবশ্যকীয় এটা সকলেই জানে।আমি আলোকপাত করব আনন্দের দিকে। যৌনক্রিয়া আমাদের আনন্দ দেয়। এখন বিষয় হলো মাদ্রাসার ভিতরে দেখেছি যেসব ছেলেরা তুলনামূলকভাবে ফর্সা এবং স্থুল স্বাস্থ্যের অধিকারী তাদেরকে সবাই মেয়ে ভাবে। মাদ্রাসায় থাকতে আমি আমার একবন্ধুকে বলেছিলাম যে দেখ যেসব ছেলেরা বাহিরে স্মার্ট,মেয়েরা দেখলে ক্রাশ খায় সেসব ছেলেরা মাদ্রাসায় আসলে আমাদের কাছে হয়ে যায় মাগী। অন্য ছেলেদের দেখতাম সব সময় এসব ছেলেদের উত্যক্ত করতে।নানা অশ্লীল-অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করতে, বুলিং করতে এবং প্রায় সময় যৌনহয়রানি করতে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের হিফজ খানার পরিবেশে সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে এই বিশেষ বর্গের ছেলেদের প্রতি অন্য ছেলেরা যৌন উত্তেজনা করবে,এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।মাঝে মধ্যে দেখতাম ছেলেরা পরস্পরের সম্মতিতে যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হত।আবার অনেক সময় দেখতাম কিছু ছেলেকে অন্য ছেলেরা ভয়-ভীতি দেখিয়ে যৌনক্রিয়ায় সংযুক্ত হতে বাধ্য করত এবং বল প্রয়োগ করত। এখান থেকেই মূলত তাদের কল্পনা বা ফ্যান্টাসির জগতে প্রেমের উপাদান ঢোকা শুরু করে। বিশেষ করে হেফজখানায় বেশিরভাগ ছেলে কৈশোরের সময় পার করে। এজন্য এদের মধ্যে প্রেমের আবেগ উদগ্র হয়ে উঠে।তারা মেয়েদের প্রতি প্রেম নিবেদনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে সমলিঙ্গের প্রতি এই আচরণ করে।এখন এই যদি অভ্যন্তরীণ অবস্থা হয়,তখন একজন শিক্ষক যদি কোনো শিশুকে যৌন নিপীড়ন করে তা মাদ্রাসার ভিতরে খুব বেশি আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়? উত্তর হচ্ছে না। আর মাদ্রাসাগুলো হচ্ছে সমাজ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। সাংবাদিক যায় না, পূর্ণাঙ্গভাবে অভিভাবক কমিটি নেই,সরকারি জবাবদিহিতা নেই এজন্য প্রকৃত চিত্র কখনো আমাদের সামনে আসে না।এ নিয়ে কোনো গবেষণা হয় না।আর যেসব ঘটনা সামনে আসে মাদ্রাসার সুনাম রক্ষার জন্য সেগুলো ধামাচাপা দিয়ে দেয়। আর কেউ যদি এগুলো নিয়ে অভিযোগ করে তাকে পশ্চিমাদের এজেন্ট, ইহুদী-খৃষ্টানদের গভীর ষড়যন্ত্র কিংবা ইসলাম বিদ্বেষী তকমা দিয়ে দেয়।আসলে আমাদের বুঝতে হবে যে শিশুদের সঙ্গে মাদ্রাসায় যে ভয়াবহ যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে এগুলো সরাসরি ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক। ভন্ড হুজুরদের সমালোচনা করলে, আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিলে প্রকৃত হুজুরদের প্রতি মানুষের আস্থা বা বিশ্বাস কমবে না।আর হুজুরদের সমালোচনা করা মানে ইসলামের সমালোচনা নয়। (এ বিষয়ে আমার একটি লেখা আছে পড়তে চাইলে লিঙ্ক দেখুন। https://www.facebook.com/share/1CkfuQBf78/ )
সর্বোপরি কওমী মাদ্রাসার শীর্ষ স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম , নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উচ্চপদস্থ সামরিক-বেসামরিক আমলা, রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সকলকে আলোচনার টেবিলে আসতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি-বিদেশি গবেষকদের প্রণোদনা দিয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণার ব্যবস্থা করতে হবে।এর মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র আমাদের সামনে উঠে আসবে। এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে তথ্য-উপাত্ত নেই।গবেষণার মাধ্যমে আমাদের সামনে সবকিছু পরিষ্কার করতে হবে। এজন্য এই বিষয়টি সকলকে উপলব্ধি করতে হবে। অন্যথায় সময় চলে গেলে সাধন হবে না।
অতএব, এ বিষয়ে আমাদের খোলাখুলি আলাপ করতে হবে। দ্বীন-ইসলাম রক্ষার স্বার্থে আমাদের এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদের বোঝার তৌফিক দান করুন। আমীন।
হাফেজ মাহমুদ হাসান জাবের
৯ম শ্রেণি, মানবিক বিভাগ, আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, মিরপুর-১০, ঢাকা




