মহিউদ্দিন মুহাম্মদের লেখায় ইসলামের ১৪০০ বছরের ইতিহাসকে ‘তৌহিদী জনতা বনাম ইসলাম’ বয়ানে বাঁধার চেষ্টা—ফাতিমার ঘরের ঘটনা, রিদ্দা যুদ্ধ, উসমান-আলী হত্যাকাণ্ড, কারবালা, কাবা অবরোধ, কারামাতিদের আক্রমণ, ফাতেমীয় গ্রন্থাগার ও আধুনিক জঙ্গিবাদ—কোন তথ্য প্রতিষ্ঠিত, কোনটি বিতর্কিত, আর কোনটি সরাসরি ভুল?
টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান
ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ, রাজনৈতিক সংঘাত, খেলাফত নিয়ে বিরোধ, গৃহযুদ্ধ এবং নানা ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘটনা রয়েছে। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে একটি মাত্র আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয়ের অধীনে এনে পুরো মুসলিম সমাজের সঙ্গে একাকার করে ফেলা ইতিহাসের মৌলিক পার্থক্যগুলোকে মুছে দিতে পারে।
মহিউদ্দিন মুহাম্মদের উদ্ধৃত লেখাটিতে এই পদ্ধতিই লক্ষ করা যায়। সেখানে “তৌহিদী জনতা” শব্দটি কখনো প্রাথমিক মুসলিম সমাজের বিরোধী গোষ্ঠী, কখনো রিদ্দা বিদ্রোহী, কখনো খারেজি, কখনো উমাইয়া বাহিনী, কখনো কারামাতি এবং কখনো আধুনিক জঙ্গিদের বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে লেখাটিতে উত্থাপিত কিছু ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে সত্য, কিছু ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে প্রাচীন সূত্রে মতভেদ রয়েছে, আবার কয়েকটি দাবির মধ্যে স্পষ্ট কালানুক্রমিক ও ঐতিহাসিক সমস্যা রয়েছে।
এই অনুসন্ধানের উদ্দেশ্য কোনো ধর্মীয় পক্ষকে সঠিক বা ভুল প্রমাণ করা নয়; বরং ইসলামের ইতিহাসকে ইতিহাসের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে দেখা—কোনটি প্রমাণিত, কোনটি বিতর্কিত এবং কোনটি অতিরঞ্জিত, তা আলাদা করা।
প্রথম সমস্যা: ‘তৌহিদী জনতা’ নামে কোনো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ছিল না
তাওহিদ ইসলামের মৌলিক আকিদা—আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস। কিন্তু ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসে “তৌহিদী জনতা” নামে কোনো একক রাজনৈতিক, সামরিক বা ধর্মীয় সংগঠন ছিল না।
অথচ আলোচিত লেখায় এই একটি শব্দের অধীনে রাখা হয়েছে—রিদ্দা বিদ্রোহী, উসমান (রা.)-বিরোধী বিদ্রোহী, খারেজি, উমাইয়া বাহিনী, কারামাতি এবং আধুনিক জঙ্গি সংগঠন। এরা একই গোষ্ঠী নয়, একই সময়ের মানুষ নয়, একই আকিদা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অনুসারীও নয়।
তাই “তৌহিদী জনতা”কে ১৪০০ বছরের একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক সংগঠন হিসেবে দেখানো পদ্ধতিগতভাবে ভুল।
মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর ‘গোসল বন্ধে মিছিল’—দাবিটির ভিত্তি কোথায়?
লেখাটির শুরুতেই বলা হয়েছে, মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর একদল মানুষ মিছিল করে বলেছিল—তাঁকে গোসল দেওয়া যাবে না।
এটি প্রামাণ্য ইসলামী ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর মুসলিম সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল—কে নেতৃত্ব দেবেন, খেলাফতের কাঠামো কী হবে, এবং মদিনার রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কার হাতে যাবে—এসব প্রশ্নে সাকিফা সভা হয়।
কিন্তু “গোসল দেওয়া যাবে না”, “কাপড় খুললে অবমাননা হবে”—এমন কোনো ব্যাপক “তৌহিদী জনতার মিছিল”-এর নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক সূত্র লেখাটিতে নেই। অতএব এ অংশকে অপ্রমাণিত বা অতিরঞ্জিত দাবি হিসেবে দেখা উচিত।
হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি—ঘটনাটি কি সম্পূর্ণ কাল্পনিক?
এটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর অংশগুলোর একটি।
মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর হযরত আলী (রা.) ও তাঁর ঘনিষ্ঠদের বাইআত প্রসঙ্গে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেই প্রেক্ষাপটে হযরত উমর (রা.) হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘরের সামনে গিয়েছিলেন এবং ঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছিল—এমন বর্ণনা কিছু প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।
তবে এই ঘটনার বিস্তারিত নিয়ে সুন্নি ও শিয়া ঐতিহ্যে ব্যাপক মতভেদ রয়েছে। বিশেষ করে ঘরে প্রবেশ করা হয়েছিল কি না, শারীরিক সংঘর্ষ হয়েছিল কি না, হযরত ফাতিমা (রা.) আহত হয়েছিলেন কি না, তাঁর গর্ভপাত ঘটেছিল কি না—এসব বিষয়ে সুন্নি ও শিয়া বয়ানে বড় পার্থক্য রয়েছে।
অতএব “হযরত ফাতিমা (রা.)-কে কিল-ঘুষি মেরে আহত করা হয়েছিল এবং লাথি মেরে তাঁর গর্ভের সন্তান নষ্ট করা হয়েছিল”—এটিকে সর্বসম্মত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।
অবশ্যই, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মর্যাদা ইসলামী ঐতিহ্যে অত্যন্ত উচ্চ। সহিহ মুসলিমে মহানবী (সা.)-এর একটি বাণী আছে—হযরত ফাতিমা (রা.) তাঁর একটি অংশ এবং তাঁকে কষ্ট দেওয়া তাঁকে কষ্ট দেওয়ার সমতুল্য। সুতরাং ঘটনাটি নিয়ে মতভেদ থাকলেও, হযরত ফাতিমা (রা.)-এর মর্যাদা নিয়ে সুন্নি ও শিয়া—উভয় ঐতিহ্যেই গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফত ও রিদ্দা যুদ্ধ
হযরত আবু বকর (রা.) প্রায় দুই বছর তিন মাস খলিফা ছিলেন। তাঁর খেলাফতের প্রথম দিকে রিদ্দা যুদ্ধ সংঘটিত হয়—এটি ইতিহাসে সুপ্রতিষ্ঠিত।
তবে রিদ্দা বিদ্রোহের সব অংশকে একই ধরনের ধর্মীয় বিদ্রোহ বলা যায় না। কিছু গোষ্ঠী ইসলামের রাজনৈতিক আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, কিছু গোষ্ঠী জাকাত দেওয়ার বিরোধিতা করেছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে নবুয়তের দাবিদারদের অনুসারীরা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
মুসাইলিমা অবশ্যই নিজেকে নবী দাবি করেছিলেন। কিন্তু “তৌহিদী জনতাই প্রথম ইসলাম ত্যাগ করে মুসাইলিমাকে নতুন নবী মেনেছিল”—এটি ইতিহাসের জটিল রিদ্দা যুদ্ধকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে।
হযরত উমর (রা.)-কে কে হত্যা করেছিলেন?
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে মদিনার মসজিদে ফজরের নামাজের সময় আবু লুলুয়া ফিরোজের হামলায় আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাটি ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম সুপরিচিত হত্যাকাণ্ড।
কিন্তু তাঁকে “তৌহিদী জঙ্গি” বলা ঐতিহাসিকভাবে সমস্যাজনক। আবু লুলুয়ার ধর্মীয় পরিচয়, হত্যার উদ্দেশ্য এবং ঘটনাটির পেছনের ব্যক্তিগত/রাজনৈতিক কারণ নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
অতএব হযরত উমর (রা.) হত্যাকাণ্ডের মূল ঘটনা সত্য, কিন্তু আবু লুলুয়াকে আধুনিক অর্থে “তৌহিদী জঙ্গি” বলা ইতিহাসের ভাষাকে আধুনিক রাজনৈতিক পরিভাষায় পুনর্লিখন।
হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকাণ্ড: সত্য, কিন্তু ‘তৌহিদী জনতা’ নয়
হযরত উসমান ইবন আফফান (রা.) ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহীদের হাতে নিহত হন। তাঁর হত্যাকাণ্ড প্রথম ফিতনার সূচনা-পর্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
তাঁর প্রশাসনিক নিয়োগ, আত্মীয়দের প্রভাব, প্রাদেশিক প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। সেই অসন্তোষ শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডে পরিণত হয়।
অতএব হযরত উসমান (রা.)-কে মুসলিম রাজনৈতিক বিদ্রোহীরা হত্যা করেছিল—এটি সত্য। কিন্তু সেই বিদ্রোহীদের “তৌহিদী জনতা” নামে একটি ঐক্যবদ্ধ ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।
হযরত আলী (রা.)-কে খারেজি হত্যা করেছিল—এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত
হযরত আলী ইবন আবি তালিব (রা.) ৬৬১ খ্রিস্টাব্দে কুফায় ফজরের নামাজের সময় আবদুর রহমান ইবন মুলজাম নামের এক খারেজির হামলায় গুরুতর আহত হন এবং পরে ইন্তেকাল করেন।
এই অংশটি ইসলামের প্রাথমিক ইতিহাসের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ঘটনা। খারেজিদের উত্থান ঘটে হযরত আলী (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধের পর সালিশ গ্রহণকে কেন্দ্র করে। পরবর্তীকালে খারেজিদের একটি চরমপন্থী অংশ তাকফির—অন্য মুসলমানকে অবিশ্বাসী ঘোষণা—করার প্রবণতা এবং সহিংসতার জন্য পরিচিত হয়।
তবে এখান থেকেই একটি বড় ভুল শুরু হয়। “পৃথিবীর যত ইসলামী দল আছে, সব খারেজির বংশধর”—এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়। পরবর্তী মুসলিম রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে খারেজিদের কোনো কোনো ধারণার তুলনা করা যায়, কিন্তু সব আধুনিক ইসলামী দলকে সরাসরি খারেজিদের বংশধর বলা ঐতিহাসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য।
খারেজি কারা ছিলেন?
খারেজিদের ইতিহাস বুঝতে হলে সপ্তম শতকের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হবে। সিফফিনের যুদ্ধের পরে হযরত আলী (রা.) ও মুয়াবিয়া (রা.)-এর মধ্যে সালিশের সিদ্ধান্তে হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষের একটি অংশ অসন্তুষ্ট হয়। তারা মনে করে, “আল্লাহর হুকুমের বদলে মানুষকে বিচারক বানানো হয়েছে।” এই রাজনৈতিক-ধর্মতাত্ত্বিক অবস্থান থেকেই খারেজি আন্দোলনের উত্থান।
তাদের মধ্যে কেউ কেউ অত্যন্ত কঠোর তাকফিরি অবস্থান নেয় এবং মুসলিম সমাজের বড় অংশকে কাফের ঘোষণা করতে থাকে। কিন্তু খারেজিদের সমস্ত শাখা একই ছিল না; ইতিহাসে তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটেছিল। তাই প্রাচীন খারেজি এবং বর্তমানের সব ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠনকে একই গোষ্ঠী হিসেবে দেখা ভুল।
কারবালা: হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত
৬৮০ খ্রিস্টাব্দের কারবালা ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়গুলোর একটি। মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতি হযরত হুসাইন ইবন আলী (রা.) এবং তাঁর অল্পসংখ্যক সঙ্গী উমাইয়া শাসনের প্রতিনিধিদের হাতে নিহত হন।
হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত কেবল শিয়া ইতিহাসেই নয়; সুন্নি মুসলিম ঐতিহ্যেও গভীর শোক ও শ্রদ্ধার বিষয়। মহানবী (সা.)-এর পরিবার তথা আহলে বাইতের মর্যাদার কথা সহিহ হাদিসেও এসেছে। সহিহ মুসলিমে হযরত আলী (রা.), হযরত ফাতিমা (রা.), হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হুসাইন (রা.)-কে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত করে মহানবী (সা.)-এর বর্ণনা রয়েছে।
তাই কারবালাকে “মুসলমান বনাম মুসলমান” বলে সংক্ষিপ্ত করার চেয়ে বলা বেশি সঠিক—একটি মুসলিম সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে উমাইয়া রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হাতে মহানবী (সা.)-এর প্রিয় নাতি হযরত হুসাইন (রা.) শাহাদাত বরণ করেন।
‘তৌহিদী জনতা’ কি হযরত হুসাইন (রা.)-কে হত্যা করেছিল?
এখানে শব্দ ব্যবহারের সমস্যা আরও স্পষ্ট। কারবালার ঘটনায় দায়ী ছিল কুফাভিত্তিক রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো, উমাইয়া কর্তৃপক্ষ এবং তাদের অধীন বাহিনী। তাই “তৌহিদী জনতা” বলে পুরো মুসলিম সমাজকে দায়ী করা ঐতিহাসিকভাবে অন্যায়। বরং কারবালা মুসলিম ইতিহাসের ভেতরে জুলুমের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধের অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে।
৬৮৩ সালে কাবা আক্রান্ত হয়েছিল—কী ঘটেছিল?
৬৮৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় ফিতনার সময় মক্কা অবরোধ করা হয়। উমাইয়া বাহিনী এবং আবদুল্লাহ ইবন জুবাইর (রা.)-এর অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং আগুনও লাগে।
কিন্তু লেখাটির “তৌহিদী জনতা কাবা ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল”—এই বাক্যটি সঠিক নয়। এটি একটি মুসলিম রাজনৈতিক গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। আর আগুনের কারণ নিয়েও প্রাথমিক সূত্রে ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে—কিছু সূত্র উমাইয়া বাহিনীর আক্রমণের দিকে ইঙ্গিত করে, আবার কিছু বর্ণনায় অন্য কারণও এসেছে।
অতএব সঠিক ভাষা: মুসলিম গৃহযুদ্ধের সময় কাবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
৯৩০ সালের কারামাতি আক্রমণ: লেখাটির সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক অংশ
৯৩০ খ্রিস্টাব্দে আবু তাহির আল-জান্নাবির নেতৃত্বে কারামাতিরা মক্কায় হামলা চালায়। হজের মৌসুমে তারা হাজিদের ওপর আক্রমণ করে, বিপুল মানুষ হত্যা করে, কাবা লুট করে এবং হাজরে আসওয়াদ নিয়ে যায়। হাজরে আসওয়াদ প্রায় দুই দশক মক্কার বাইরে ছিল এবং পরবর্তীতে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনা ইসলামের ইতিহাসে সত্যিই ভয়াবহ। তবে কারামাতিরা ছিল একটি নির্দিষ্ট ইসমাইলি শিয়া বিপ্লবী আন্দোলন; তাদের সমগ্র মুসলিম সমাজের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা ইতিহাসের অপব্যাখ্যা।
ফাতেমীয়দের দারুল হিকমা ও গ্রন্থাগার ধ্বংসের দাবি
কায়রোতে ফাতেমীয় খলিফা আল-হাকিম ১০০৫ সালে দার আল-হিকমা বা দার আল-ইলম প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
কিন্তু “তৌহিদী জনতা সব লাইব্রেরি ধ্বংস ও বই পুড়িয়ে দিয়েছিল”—এমন সরল বিবরণ ইতিহাস দ্বারা সমর্থিত নয়। আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, ফাতেমীয় গ্রন্থসংগ্রহ বিভিন্ন সময়ে লুট, বিক্রি, ছড়িয়ে পড়া ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে বিলীন হয়েছে। পুরো সংগ্রহ একবারে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল—এমন জনপ্রিয় গল্পের ঐতিহাসিক ভিত্তি দুর্বল।
হযরত হাসান (রা.)-এর বিষপ্রয়োগের বিষয়টি
হযরত হাসান ইবন আলী (রা.) ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন এবং বহু ঐতিহাসিক ও শিয়া সূত্র তাঁর মৃত্যুকে বিষপ্রয়োগের সঙ্গে যুক্ত করে।
কিন্তু কে বিষ দিয়েছিল, এটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ছিল কি না, মুয়াবিয়া (রা.) সরাসরি জড়িত ছিলেন কি না—এসব বিষয়ে প্রাচীন সূত্রে মতভেদ রয়েছে।
তাই “তৌহিদী জনতা হযরত হাসান (রা.)-কে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছিল”—এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে লেখা সঠিক হবে না।
হযরত আয়েশা (রা.)-সহ নবী পরিবারের নারীদের যৌন হয়রানির দাবি
লেখাটির সবচেয়ে গুরুতর অথচ সবচেয়ে কম-প্রমাণিত অংশগুলোর একটি হলো—”নবীপত্নী হযরত আয়েশা (রা.), ইমাম হাসানের স্ত্রী হাফসা, হুসাইনের স্ত্রী সহরবানু—তাঁদের প্রত্যেককে যৌন হয়রানি ও কুপ্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।”
এই নির্দিষ্ট দাবিগুলোর জন্য লেখাটিতে কোনো প্রাথমিক ঐতিহাসিক সূত্র, গ্রন্থ, অধ্যায় বা নির্দিষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়নি। ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাজনৈতিক সংঘাত, অপমান, বিদ্বেষ, কুৎসা ও বন্দিত্বের বহু ঘটনা আছে। কিন্তু এসব নির্দিষ্ট যৌন অভিযোগকে প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখানে নেই।
তাই এই অংশকে উৎসবিহীন গুরুতর অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
২০১৬: মসজিদে নববীতে আত্মঘাতী হামলা
২০১৬ সালের ৪ জুলাই মদিনায় মসজিদে নববীর কাছে আত্মঘাতী বোমা হামলায় চারজন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। একই দিনে সৌদি আরবের অন্য শহরেও হামলা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সূত্র হামলাগুলোকে ISIS-এর সঙ্গে সম্পর্কিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছিল।
এই অংশটি ঘটনাগতভাবে সঠিক। কিন্তু সপ্তম শতকের খারেজিদের সঙ্গে ২০১৬ সালের আইএসের সরাসরি সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা প্রমাণিত নয়। আধুনিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর কিছু মতাদর্শিক বৈশিষ্ট্যকে গবেষকেরা নিও-খারেজি বা খারেজি-সদৃশ বলে তুলনা করেছেন। কিন্তু এটিকে সরাসরি ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বলা একেবারে একই বিষয় নয়।
‘খারেজিরাই সব ইসলামী রাজনৈতিক দলের পূর্বপুরুষ’—কেন ভুল
খারেজি আন্দোলন ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। তারা তাকফিরি প্রবণতা, রাজনৈতিক বিদ্রোহ এবং সহিংসতার ইতিহাস সৃষ্টি করেছে।
কিন্তু ইসলামের পরবর্তী ইতিহাসে গড়ে ওঠা সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তাধারা, শিয়া রাজনৈতিক আন্দোলন, ইবাদি মত, সুফি ঐতিহ্য, সালাফি আন্দোলন, দেওবন্দি ধারা, ব্রেলভি ধারা এবং আধুনিক ইসলামী রাজনৈতিক দল—এসবকে সরাসরি খারেজিদের “বংশধর” বলা যায় না। ইতিহাসে মতাদর্শের প্রভাব থাকতে পারে, কিন্তু বংশপরম্পরা ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এক জিনিস নয়।
তাহলে লেখাটির সবচেয়ে বড় সমস্যা কোথায়?
লেখাটি ইতিহাসের নানা সময়ের নানা গোষ্ঠীকে একই নামে ডাকছে—রিদ্দা বিদ্রোহী = খারেজি = উমাইয়া বাহিনী = কারামাতি = আধুনিক জঙ্গি = ‘তৌহিদী জনতা’।
এই সমীকরণটি ঐতিহাসিকভাবে টেকসই নয়। কারণ এসব গোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ৩০০ বছরের বেশি সময়ের ব্যবধান, ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ভিন্ন ধর্মতত্ত্ব, ভিন্ন নেতৃত্ব, ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট, এবং বহু ক্ষেত্রে একে অপরের বিরোধিতা—সবই ছিল।
এতে কি ইসলাম বা মুসলমানদের অবমাননার চেষ্টা আছে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করা দরকার। ইসলামের ইতিহাসের সমালোচনা ইসলাম অবমাননার সমান নয়। কোনো ধর্মের অনুসারীরা ইতিহাসে অপরাধ করেছে—এ নিয়ে গবেষণা বা সমালোচনা ধর্মীয় অবমাননা নয়। ইসলামের ইতিহাসে যুদ্ধ, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ক্ষমতার লড়াই এবং চরমপন্থী আন্দোলন নিয়ে গবেষণা অবশ্যই করা যায়।
কিন্তু আলোচিত লেখায় সমস্যা তৈরি হয়েছে শব্দের ব্যাপকীকরণে। “তৌহিদী জনতা” শব্দটি এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মুসলমানের ধর্মীয় পরিচয় এবং ইতিহাসের কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
বিশেষ করে শেষ দিকে বলা হয়েছে, “মুসলমানরা তৌহিদী জনতা উরফে তৌহিদী জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শক্তভাবে না দাঁড়ালে…” এখানে লেখক সম্ভবত ধর্মীয় উগ্রবাদবিরোধী বক্তব্য দিতে চেয়েছেন। কিন্তু ভাষাটির কাঠামো এমন যে, পাঠকের কাছে ‘তৌহিদী’ পরিচয়কে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সমার্থক করার ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে অবমাননাকরভাবে সাধারণীকরণের অভিযোগের জন্ম দিতে পারে।
আইনগতভাবে ধর্মীয় অবমাননা কি?
শুধু একটি লেখার ভিত্তিতে নিশ্চিতভাবে বলা উচিত নয় যে এটি আইনত ধর্মীয় অবমাননার অপরাধ। বাংলাদেশের ফৌজদারি আইনে ধর্মীয় অনুভূতি, ধর্মীয় বিশ্বাসকে ইচ্ছাকৃতভাবে ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে অপমান করা নিয়ে বিধান রয়েছে। এ ধরনের বিষয়ে উদ্দেশ্য, নির্দিষ্ট শব্দচয়ন, প্রসঙ্গ এবং সামগ্রিক বক্তব্য বিবেচনা করতে হয়।
অতএব আইনগত সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয়। কিন্তু সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়—লেখাটিতে মুসলিম পরিচয় ও ইসলামের ইতিহাসের মধ্যে এমন একটি বিস্তৃত নেতিবাচক সমীকরণ তৈরির ঝুঁকি আছে, যা ঐতিহাসিকভাবে যথেষ্ট সমস্যাজনক।
ইসলামের সঠিক ইতিহাস কীভাবে পড়া উচিত?
এই প্রশ্নটিই সম্ভবত পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইসলামের ইতিহাসকে পড়তে হলে তিনটি স্তর আলাদা করতে হবে।
এক. ইসলাম কী শিক্ষা দেয়—কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর ধর্মীয় শিক্ষা।
দুই. মুসলমানেরা ইতিহাসে কী করেছে—এখানে ভালো-মন্দ সবই থাকতে পারে।
তিন. চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো কী করেছে—তাদের কাজকে পুরো মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব হিসেবে দেখা যায় না।
এই তিনটি স্তর এক করে ফেললেই ইতিহাস বিকৃত হয়।
🔎 দাবি বনাম ঐতিহাসিক সত্য
| আলোচিত দাবি | অনুসন্ধানের ফল |
|---|---|
| মহানবী (সা.)-এর ওফাতের পর “গোসলবিরোধী তৌহিদী মিছিল” | ❌ নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি |
| হযরত ফাতিমা (রা.)-এর ঘরে আগুন দেওয়ার হুমকি | ⚠️ প্রাচীন সূত্রে বর্ণনা আছে; বিস্তারিত নিয়ে মতভেদ |
| হযরত ফাতিমা (রা.)-কে আঘাত ও গর্ভপাত | ⚠️ শিয়া ঐতিহ্যে গুরুত্বপূর্ণ; সুন্নি ঐতিহ্যে বিতর্কিত/অস্বীকৃত |
| হযরত আবু বকর (রা.)-এর সময় রিদ্দা যুদ্ধ | ✅ সত্য |
| মুসাইলিমার নবুয়তের দাবি | ✅ সত্য |
| হযরত উমর (রা.)-কে আবু লুলুয়া হত্যা করেন | ✅ সত্য |
| আবু লুলুয়া “তৌহিদী জঙ্গি” | ❌ ঐতিহাসিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক আধুনিক লেবেল |
| হযরত উসমান (রা.) বিদ্রোহীদের হাতে নিহত | ✅ সত্য |
| হযরত আলী (রা.)-কে খারেজি হত্যা করে | ✅ সত্য |
| সব আধুনিক ইসলামি দল খারেজিদের বংশধর | ❌ ভুল |
| হযরত হুসাইন (রা.) কারবালায় নিহত | ✅ সত্য |
| কাবা ৬৮৩ সালে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত | ✅ সত্য |
| ৯৩০ সালে কারামাতিরা মক্কা আক্রমণ করে | ✅ সত্য |
| কারামাতিরা হাজরে আসওয়াদ নিয়ে যায় | ✅ সত্য |
| ফাতেমীয় সব গ্রন্থাগার “তৌহিদী জনতা” পুড়িয়ে দেয় | ❌ অতিরঞ্জিত/অপ্রমাণিত |
| ২০১৬ সালে মসজিদে নববীতে আত্মঘাতী হামলা | ✅ সত্য |
| আধুনিক আইএস সরাসরি প্রাচীন খারেজিদের সংগঠনগত উত্তরসূরি | ⚠️ সরলীকরণ; মতাদর্শগত তুলনা করা হয় |
শেষ কথা: ইতিহাসকে অভিযোগপত্র নয়, গবেষণার বিষয় হতে হবে
মহিউদ্দিন মুহাম্মদের লেখায় এমন বহু ঘটনা রয়েছে যেগুলো ইসলামের ইতিহাসের বাস্তব অংশ—হযরত উমর (রা.)-এর হত্যাকাণ্ড, হযরত উসমান (রা.)-এর হত্যাকাণ্ড, হযরত আলী (রা.)-এর হত্যাকাণ্ড, কারবালায় হযরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত, কাবা অবরোধ, কারামাতিদের মক্কা আক্রমণ, হাজরে আসওয়াদ অপহরণ এবং মসজিদে নববীতে আধুনিক সন্ত্রাসী হামলা। এসব ঘটনা গোপন করার কোনো প্রয়োজন নেই।
কিন্তু একই সঙ্গে ইতিহাসের নামে রিদ্দা বিদ্রোহীকে খারেজি বানানো, খারেজিকে সব ইসলামি দলের পূর্বপুরুষ বানানো, উমাইয়া রাষ্ট্রকে ‘তৌহিদী জনতা’ বলা, কারামাতিদের পুরো মুসলিম সমাজের প্রতিনিধি বানানো, অথবা আধুনিক জঙ্গিদের অপরাধের দায় ১৪০০ বছরের সব মুসলমানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া—এসবও ইতিহাস নয়।
ইসলামের ইতিহাসে মুসলমানদের গৌরব আছে, ভুল আছে, রাজনৈতিক সংঘাত আছে, রক্তক্ষয় আছে, জ্ঞানচর্চা আছে এবং আত্মসমালোচনার দীর্ঘ ঐতিহ্যও আছে। মহানবী (সা.)-এর পরিবার—হযরত ফাতিমা (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হুসাইন (রা.)—ইসলামী ঐতিহ্যে গভীর মর্যাদার অধিকারী। সহিহ মুসলিমে তাঁদের আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত করে বর্ণনা রয়েছে। আর হযরত হাসান (রা.) ও হযরত হুসাইন (রা.)-এর প্রতি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসার কথা হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে।
অতএব ইসলামের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার অর্থ কারও অপরাধ ঢেকে দেওয়া নয়। বরং—যে গোষ্ঠী যা করেছে, তার দায় সেই গোষ্ঠীর। যে ঘটনা প্রমাণিত, তাকে প্রমাণিত বলব। যে ঘটনা মতভেদপূর্ণ, তাকে মতভেদপূর্ণ বলব। আর যে ঘটনা প্রমাণিত নয়, তাকে সত্য বলে প্রচার করব না।
এই পদ্ধতিই একই সঙ্গে ইসলামের ইতিহাসের প্রতি সম্মান এবং সাংবাদিকতার প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে।
— টুডে টিভি বিডি | বিশেষ অনুসন্ধান




