ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি ও ‘জুলাই জজবা’ মহাসমাবেশ; দিল্লির যন্তর মন্তরে অনড় আন্দোলনকারীরা, ছড়িয়েছে নিউ ইয়র্ক-লন্ডনেও
ঢাকা | ২৫ জুলাই ২০২৬
ভারতের চলমান ছাত্র আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত বুধবার (২২ জুলাই) ঢাকায় মশাল মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। রাজধানীর শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বর থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হওয়া এই মিছিল শেষে সংগঠনটি ঘোষণা দেয় ‘জুলাই জজবা‘ নামে একটি মহাসমাবেশের, যা অনুষ্ঠিত হয়েছে গতকাল ২৪ জুলাই। এদিকে সীমান্তের ওপারে দিল্লিতে আন্দোলন থামেনি — বরং তা ছড়িয়ে পড়েছে ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে নিউ ইয়র্ক ও লন্ডন পর্যন্ত।
ঢাকায় সংহতি মিছিলের প্রেক্ষাপট
ভারতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশি হামলা ও গণগ্রেপ্তারের প্রতিবাদেই এই মশাল মিছিলের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে বক্তারা বলেন, “ভারতে জনতার যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, আমরা সেটিকে যৌক্তিক মনে করি। কিছুদিন আগেও বাংলাদেশে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। পৃথিবীর অনেক শাসকের ভাষা ও আচরণ যেন একই রকম। কেউ আন্দোলনকারীদের ‘তেলাপোকা’ বলে, কেউ ‘ফার্মের মুরগি’ বলে। অথচ এই তথাকথিত তেলাপোকা ও ফার্মের মুরগিরাই একদিন তাদের শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেবে।”
ইনকিলাব মঞ্চের সংগঠক খালেদ সাইফুল্লাহ বলেন, “আমরা আশা করি, ভারতের সরকার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেবে। একই সঙ্গে ভারতের জনগণের প্রতি আহ্বান জানাই, তাদের দেশ যেন গণহত্যাকারীদের আশ্রয়স্থল না হয়। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবির সঙ্গে তারাও সংহতি জানাক।”
সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফজলে রাব্বি সরকার এক গুরুত্বপূর্ণ শঙ্কার কথা তুলে ধরে বলেন, “আমরা জানি না, সামনের দিনে কোনো সাম্প্রদায়িক বয়ান তৈরি করে এই আন্দোলন দমন করা হবে কি না। তবে আন্দোলন দমন হলে সেখানে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মুসলমানদের ওপর কী ধরনের নির্যাতন নেমে আসতে পারে, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।” তিনি স্পষ্ট করেন, “ভারত সরকারের আধিপত্যবাদী নীতির সমালোচনা আমরা করেছি এবং করব। কিন্তু ভারতের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কোনো শত্রুতা নেই।”
দিল্লিতে আন্দোলনের সর্বশেষ চিত্র
বাংলাদেশে সংহতি প্রকাশের এই কর্মসূচির মধ্যেই দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলন ক্রমেই জোরালো রূপ নিচ্ছে। প্রতিদিন সকাল থেকেই অনশনমঞ্চে শিক্ষার্থী, তরুণ, সমাজকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের ভিড় বাড়ছে। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি— কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ, প্রখ্যাত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক, অনশনের একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তা সত্ত্বেও ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ রাজপথ ছাড়তে নারাজ — যন্তর মন্তরে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান অব্যাহত রয়েছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, লোকসভা অভিমুখী মিছিল থেকে আটক হওয়া বিক্ষোভকারীদের অনেকেই মুক্তি পেয়ে ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যেই আবার ফিরে এসেছেন যন্তর মন্তরে — কেউ কেউ সরাসরি থানা থেকেই। প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও আন্দোলনস্থলে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছেন একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক, যারা হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করা থেকে শুরু করে ভিড় নিয়ন্ত্রণে মানবশৃঙ্খল তৈরি পর্যন্ত নানা দায়িত্ব সামলাচ্ছেন।
রাজনৈতিক উত্তাপ ও রাহুল গান্ধীর আটক
আন্দোলনকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেও তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। ছাত্র-যুবদের মিছিলে পুলিশের লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের প্রতিবাদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে ধরনায় বসেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। পরে তাঁকে আটক করা হলে সেখান থেকেই তিনি সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেন।
তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র শুরু থেকেই সিজেপির আন্দোলনের পাশে রয়েছেন — যন্তর মন্তরে গিয়ে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতও করেছেন তিনি, এবং দিল্লির রাস্তায় প্রতিবাদেও অংশ নিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেছেন, সরকারের কাছে এই আন্দোলন যেন ‘আউট অব সিলেবাস’।
আন্দোলন এখন আন্তর্জাতিক
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলো, এই আন্দোলনের প্রভাব এখন আর ভারতের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। সোনম ওয়াংচুকের সমর্থনে বিক্ষোভ হয়েছে নিউ ইয়র্ক ও লন্ডনেও — যা এই আন্দোলনকে একটি আন্তর্জাতিক মাত্রা দিয়েছে।
🧭 এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নেওয়া নিয়ে এখনো নতুন কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি। তবে যন্তর মন্তরে আন্দোলনকারীদের অবস্থান অব্যাহত রয়েছে এবং প্রতিদিনই নতুন করে মানুষ যোগ দিচ্ছেন সেখানে। বাংলাদেশেও ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে জুলাই মাসজুড়ে — শাহবাগের শহীদ ওসমান হাদি চত্বরকেন্দ্রিক একাধিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আয়োজনের অংশ হিসেবে।
সূত্র: দৈনিক যুগান্তর, প্রথম আলো, দৈনিক ইনকিলাব, itvbd.com, bd24report.com, সংবাদ পরিক্রমা




