বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনার ওপর গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র; শিশুদের ব্যবহৃত পণ্যেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, জাতীয় মানদণ্ড না থাকায় নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন জোরালো
ঢাকা | টুডে টিভি বিডি ইনভেস্টিগেশন ডেস্ক
বাংলাদেশের টুথপেস্ট বাজারে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর এক বছরব্যাপী গবেষণায় ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্ট নমুনা পরীক্ষা করে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে — যা মোট নমুনার ৭৬.৫ শতাংশ। বাকি ৮টি নমুনায় কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি।

যেসব পণ্যে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫টি বাংলাদেশে উৎপাদিত টুথপেস্টের মধ্যে ২২টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা দুইটি নমুনার দুটিতেই, থাইল্যান্ডের দুইটির মধ্যে একটিতে এবং ভারতের পাঁচটির মধ্যে একটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, শিশুদের জন্য বাজারজাত ছয়টি টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। সবচেয়ে বেশি কণা মিলেছে Mediplus Fluoride Gel-এ — প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ৩২০টি কণা।
মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী
মাইক্রোপ্লাস্টিক সাধারণত ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। এগুলো ভাঙা প্লাস্টিক, শিল্পজাত কণা, অথবা কিছু পণ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক উপাদান থেকেও আসতে পারে। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP)-এর তথ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাস, পানি, খাদ্যশৃঙ্খল ও সামুদ্রিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের শরীরে শ্বাস, খাদ্য ও পানির মাধ্যমে প্রবেশ করতে পারে।
টুথপেস্টে প্লাস্টিক আসে কোথা থেকে
টুথপেস্টে প্লাস্টিক কণা প্রবেশের একটি পথ হলো ফর্মুলেশন। কিছু টুথপেস্টে পলিইথিলিন, পলিপ্রোপিলিন বা পলিঅ্যামাইডের মতো পলিমার শনাক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন পর্যালোচিত গবেষণায় পাওয়া গেছে। আবার কিছু গবেষণায় এসব কণাকে প্রস্তুতকারকদের ইচ্ছাকৃতভাবে যোগ করা উপাদান হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশের এই গবেষণায় প্রতিটি কণার সুনির্দিষ্ট উৎস আলাদা করে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন, প্যাকেজিং লেবেলে এ বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ না থাকাটাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।
গবেষণাটি যেভাবে পরিচালিত হয়েছে
ইএসডিও জানিয়েছে, গবেষণাটি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত চালানো হয়েছে। সারা দেশের সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়, পাশাপাশি ২,৭৬০ জন ভোক্তার ওপর একটি জরিপও পরিচালিত হয়।
নমুনাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের Environmental Health and Ecotoxicology Laboratory-তে, স্টেরিওমাইক্রোস্কোপি ও FTIR স্পেকট্রোস্কোপি পদ্ধতি ব্যবহার করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সাধারণত মাইক্রোস্কোপ দিয়ে সন্দেহভাজন কণা শনাক্ত করা হয়, আর FTIR স্পেকট্রোস্কোপি দিয়ে সেই কণার পলিমার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। অর্থাৎ এটি নিছক পর্যবেক্ষণ নয়, বরং পরীক্ষাগার-নিশ্চিত ফলাফল।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে
এই প্রশ্নে সবচেয়ে সতর্ক ভাষা ব্যবহার করা প্রয়োজন। বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে জমা হতে পারে এবং প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা, অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ভারসাম্যহীনতা, প্রজনন-সংক্রান্ত প্রভাব এবং শ্বাসতন্ত্রে সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হতে পারে। তবে মানবস্বাস্থ্যে সরাসরি কারণ-ফলাফল সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত নয় — প্রমাণ ক্রমবর্ধমান, কিন্তু এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে এবং পদ্ধতিগতভাবে ভিন্নধর্মী।
UNEP বলছে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষাক্ত ও যান্ত্রিক প্রভাব থাকতে পারে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর পানি-সংক্রান্ত মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের সরাসরি মানবস্বাস্থ্য ঝুঁকি এখনো প্রমাণিত নয়। অর্থাৎ ঝুঁকির সম্ভাবনা আছে, কিন্তু প্রমাণ এখনো চূড়ান্ত নয়।
ইএসডিও-র গবেষকরা এ প্রসঙ্গে বলেছেন, “টুথপেস্টে কোনো ধরনের মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকা উচিত নয়।” তবে এই তথ্যকে “সরাসরি বিষ” হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করার আগে আরও স্বাধীন, ব্যাচ-ভিত্তিক ও আন্তঃপরীক্ষাগার যাচাই প্রয়োজন।
🔎 সবচেয়ে উদ্বেগজনক জায়গা: শিশুদের টুথপেস্ট
গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিশুদের জন্য বাজারজাত পণ্যের ফলাফল। ছয়টি শিশু-টুথপেস্টের মধ্যে চারটিতেই শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। শিশুদের প্রতিদিনের ব্যবহারের পণ্যে এ ধরনের কণা থাকার তথ্য ভোক্তাদের আস্থাকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
সরকারের এখন কী করা উচিত
ইএসডিও স্পষ্ট করে বলেছে, বাংলাদেশে টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে কোনো জাতীয় মানদণ্ড নেই। এই শূন্যতা পূরণে জরুরি পদক্ষেপগুলো হলো—
জাতীয় মানদণ্ড নির্ধারণ, পরীক্ষাগার পরীক্ষার নিয়ম চালু করা, উপাদান প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, শিশুদের পণ্যে আলাদা নজরদারি ব্যবস্থা এবং বাজারে নিয়মিত তদারকি। সংগঠনটি আরও বলেছে, নিরাপদ খাদ্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক মানদণ্ড প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর উচিত শুধু একটি গবেষণার ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব ল্যাবে স্বাধীনভাবে নমুনা পরীক্ষা করে ফলাফল প্রকাশ করা। কারণ পণ্যের লেবেলে তথ্য না থাকলে এবং ভোক্তা যদি বুঝতেই না পারেন কী কিনছেন, তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণের মূল শর্ত — স্বচ্ছতা — অধরাই থেকে যায়।
ভোক্তাদের করণীয়
ভোক্তাদের জন্য প্রথম করণীয় হলো আতঙ্কিত না হয়ে তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেসব পণ্যে উপাদান প্রকাশ নেই, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত। শিশুদের টুথপেস্ট কেনার আগে প্যাকেজিং, উৎপাদন সংক্রান্ত তথ্য এবং নির্ভরযোগ্য সনদ যাচাই করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো দাবিকেই “পরিমিত মাত্রা” বা “নিরাপদ” বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়, যতক্ষণ না সরকার বা স্বাধীন পরীক্ষাগার তা যাচাই করছে।
🔎 দাবি বনাম বাস্তবতা
| দাবি | প্রকৃত বাস্তবতা |
|---|---|
| ২৬টি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, ৮টিতে ‘মাত্রার মধ্যে’ ছিল | ২৬টিতে শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, ৮টিতে পাওয়া যায়নি; তবে বাংলাদেশে এ বিষয়ে কোনো জাতীয় অনুমোদনযোগ্য সীমা নেই |
| এই গবেষণাই টুথপেস্টের স্বাস্থ্যঝুঁকি চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে | গবেষণাটি উপস্থিতি প্রমাণ করেছে, তবে সরাসরি স্বাস্থ্য-ফলাফল পরিমাপ করেনি; ঝুঁকির প্রমাণ ক্রমবর্ধমান কিন্তু এখনো চূড়ান্ত নয় |
📊 সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
| সূচক | তথ্য |
|---|---|
| মোট পরীক্ষিত ব্র্যান্ড | ১৯টি |
| মোট পরীক্ষিত নমুনা | ৩৪টি |
| মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত | ২৬টি (৭৬.৫%) |
| শনাক্ত হয়নি | ৮টি |
| বাংলাদেশি উৎপাদিত নমুনায় শনাক্ত | ২৫টির মধ্যে ২২টি |
| শিশু-টুথপেস্টে শনাক্ত | ৬টির মধ্যে ৪টি |
| সর্বোচ্চ কণা (Mediplus Fluoride Gel) | প্রতি ১০০ গ্রামে ৩২০টি কণা |
| জরিপে অংশগ্রহণকারী ভোক্তা | ২,৭৬০ জন |
| গবেষণার সময়কাল | জুলাই ২০২৫ – জুন ২০২৬ |
শেষ কথা
টুথপেস্ট দৈনন্দিন জীবনের সবচেয়ে নিরীহ পণ্যগুলোর একটি বলে মনে হলেও, নতুন এই গবেষণা দেখাচ্ছে যে এই পরিচিত জিনিসের ভেতরেও লুকিয়ে থাকতে পারে অদৃশ্য প্রশ্ন। ২৬টি নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাওয়া এবং ৮টিতে না পাওয়া—দুটি তথ্যই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এ বিষয়ে বাংলাদেশে এখনো স্পষ্ট মানদণ্ড, স্পষ্ট লেবেলিং ও স্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অভাব রয়েছে।
এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি। প্রয়োজন লেবেলের বাইরে গিয়ে প্রকৃত পরীক্ষাগার প্রতিবেদন। প্রয়োজন বাজারের ওপর দৃশ্যমান জবাবদিহি। এবং প্রয়োজন এমন একটি খাদ্য ও ভোক্তা-নিরাপত্তা কাঠামো, যেখানে প্রশ্ন উঠলেই সরকার, গবেষক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা একযোগে উত্তর দেবে।
তথ্যসূত্র: পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় Environmental Health and Ecotoxicology Laboratory, UNEP, WHO




