Homeটুডে ওয়ার্ল্ড‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না’—শিক্ষার্থীদের ভিডিও দেখতে অস্বীকৃতি, ভারতের বিচারব্যবস্থাও কি মোদি...

‘আমাদের সময় নষ্ট করবেন না’—শিক্ষার্থীদের ভিডিও দেখতে অস্বীকৃতি, ভারতের বিচারব্যবস্থাও কি মোদি সরকারের পাশে?

নয়াদিল্লি | বিশেষ প্রতিবেদন

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও বলপ্রয়োগের অভিযোগ এখন শুধু রাজনৈতিক বিতর্কেই সীমাবদ্ধ নেই; তা পৌঁছে গেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতেও। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত বুধবার এই ঘটনায় জরুরি শুনানির আবেদন গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে মন্তব্য করেন, “আমাদের সময় নষ্ট করবেন না” এবং “ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই।” এই মন্তব্যের পর ভারতের বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।


যে আবেদন আদালতে পৌঁছেছিল

শিক্ষার্থীদের পক্ষে এক আইনজীবী সুপ্রিম কোর্টে জানান, দিল্লি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ভিডিও প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে এবং আদালত যেন সেগুলো দেখে জরুরি ভিত্তিতে হস্তক্ষেপ করে।

তিনি যুক্তি দেন, আন্দোলনকারীরা মূলত NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (NTA) সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছিলেন।

কিন্তু আবেদনকারীর বক্তব্য শেষ হওয়ার আগেই প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত শুনানি নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। ভিডিও দেখার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেন।


দিল্লি হাইকোর্টও একই অবস্থানে

এর আগের দিন দিল্লি হাইকোর্টেও একই ধরনের আবেদন করা হয়েছিল।

সেখানে আদালত জরুরি শুনানি করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে মন্তব্য করে—

“এই সব বিষয়ে আদালতকে টানবেন না।”

ফলে পরপর দুই আদালতের এই অবস্থান আন্দোলনকারীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করেছে।


কী ঘটেছিল দিল্লির রাজপথে?

সংসদ অভিমুখে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-এর ডাকা পদযাত্রায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন।

পুলিশ ব্যারিকেড বসায়।

পরে সংঘর্ষ শুরু হলে কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ও লাঠিচার্জ করা হয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে পুলিশকে বিক্ষোভকারীদের ধাওয়া করে পেটাতে দেখা যায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলোও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ তুলেছে।


‘ককরোচ’ থেকে জাতীয় আন্দোলন

মাত্র কয়েক মাস আগে গঠিত ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) আজ ভারতের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের নাম।

এর সূচনা হয় যখন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার ও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় তরুণদের “ককরোচ” (তেলাপোকা) বলে মন্তব্য করেন।

এই মন্তব্যকেই ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক পরিচয়ে রূপ দেন অভিজিৎ দীপকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে CJP এবং পরে সেটিই বাস্তব ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে আসে।


বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র আন্দোলন

এখন আন্দোলন আর কেবল শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে সীমাবদ্ধ নেই।

কংগ্রেস, ইন্ডিয়া জোটসহ প্রায় সব বিরোধী দল প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে।

রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গেসহ বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করেছেন।


সরকার কী বলছে?

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পরীক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হবে।

তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের প্রশ্নে সরকার অনড়।

বিজেপির বক্তব্য, আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে।


বিচারব্যবস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

প্রধান বিচারপতির মন্তব্য—“ভিডিও দেখার সময় আমাদের নেই”—ভারতের আইনজীবী মহল, বিরোধী রাজনীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

সমালোচকদের প্রশ্ন, যখন অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধে এবং প্রমাণ হিসেবে ভিডিও আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে চাওয়া হচ্ছে, তখন তা প্রাথমিকভাবে দেখতেও আদালতের অনীহা কি বিচারপ্রার্থীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?

অন্যদিকে আদালতের সমর্থকদের যুক্তি, কোনো মামলার জরুরি তালিকাভুক্তির পর্যায়ে ভিডিও প্রমাণ বিচার করা আদালতের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ নয়; তাই আদালতের সিদ্ধান্তকে বিচারিক পদ্ধতির অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।


ভারতের রাজনীতিতে নতুন মোড়?

পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আন্দোলন শুধু একটি পরীক্ষা বা একজন মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নেই।

এটি ক্রমশ তরুণদের ক্ষোভ, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা, পুলিশি বলপ্রয়োগ এবং বিচারব্যবস্থার ভূমিকা—সবকিছুকে ঘিরে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।

সরকার যদি দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দিতে না পারে, তাহলে এই ছাত্র আন্দোলন ভারতের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন।

তথ্যসূত্র: Reuters, LawBeat, LiveLaw, The New Indian Express, The Guardian, The Daily Star (Reuters syndication)।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments