ইতালি ভিসা জালিয়াতির ভয়ংকর চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার; জব্দ ৫৬ পাসপোর্ট, ১৫৩টি সিল, কম্পিউটার ও নগদ টাকা
টুডে টিভি বিডি ডেস্ক
বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ভিসা জালিয়াতি ও মানব পাচারের এক চাঞ্চল্যকর কৌশলের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ইতালিপ্রবাসী স্বামীর কাছে চার সন্তানকে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এক নারী জানতে পারেন, তাঁর পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে এরই মধ্যে অন্য একজন নারী ইতালি চলে গেছেন।
এই ঘটনায় রাজধানীর গুলশান-১ এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার ও ভিসা জালিয়াতি চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ভিসা জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠিয়ে আসছিল। (BSS)
যেভাবে ধরা পড়ল ভয়ংকর প্রতারণা
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ভুক্তভোগী নারীর স্বামী দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য তিনি ইতালির দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও পাসপোর্ট জমা দেন। পরে পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় নবায়নের প্রয়োজন হয়।
দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে গেলে নাজমুল হাসান নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। নাজমুল নিজেকে দ্রুত পাসপোর্ট নবায়ন ও ইতালির ভিসা করে দেওয়ার সক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে তাঁকে গুলশানের একটি ট্রাভেল এজেন্সিতে নিয়ে যান। সেখানে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বেলায়েত হোসেনসহ অন্যদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। (Ajkerpatrika)
৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়েও থামেনি প্রতারণা
ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অভিযুক্তরা ভুক্তভোগীর সঙ্গে আর্থিক চুক্তি করে। পরে ভিসা হয়ে গেলে তাঁরা পাসপোর্ট নিজেদের কাছে রেখে টাকা দাবি করেন।
পাসপোর্ট ফেরত পেতে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল ও ১১ মে দুই দফায় অভিযুক্তদের ব্যাংক হিসাবে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা দেন ওই নারী। এরপর তাঁকে পাসপোর্ট ফিরিয়ে দেওয়া হয়। (BSS)
বিমানবন্দরে গিয়ে বেরিয়ে আসে আসল সত্য
সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে নির্ধারিত দিনে চার সন্তানকে নিয়ে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান ওই নারী।
কিন্তু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাঁকে জানান, তাঁর পাসপোর্টে থাকা ইতালির ভিসা ব্যবহার করে ২৪ এপ্রিলই অন্য এক নারী ইতালিতে প্রবেশ করেছেন।
এ ঘটনায় হতবাক হয়ে তিনি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে সিআইডির মানব পাচার শাখায় অভিযোগ করেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে চক্রটির সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়। (Jagonews24)
যা যা উদ্ধার করেছে সিআইডি
অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে—
- ৫৬টি বিভিন্ন ব্যক্তির পাসপোর্ট
- সরকারি, বেসরকারি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবহৃত ১৫৩টি সিল
- ১টি এম্বোস সিল
- ৩টি সিপিইউ
- ১টি ল্যাপটপ
- নগদ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা
এসব আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। পাশাপাশি কম্পিউটার ও ডিজিটাল ডিভাইস বিশ্লেষণ করে আরও তথ্য সংগ্রহ করছে তদন্তকারীরা। (BSS)
দীর্ঘদিন ধরেই সক্রিয় ছিল চক্র
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, অভিযুক্তরা বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো মানুষদের টার্গেট করত।
তারা ভিসা করে দেওয়ার নামে বিপুল অর্থ আদায় করে পাসপোর্ট নিজেদের হেফাজতে রাখত। এরপর জালিয়াতির মাধ্যমে প্রকৃত পাসপোর্টধারীর পরিবর্তে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো হতো।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, চক্রটির মূলহোতা বেলায়েত হোসেন ২০১৬ সাল থেকে একই ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে প্রায় ৩০ জনকে ইতালিতে পাঠানোর সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। একই ধরনের অভিযোগে ২০২৪ সালে দায়ের হওয়া আরেকটি মামলায় তিনি জামিনেও রয়েছেন। (BSS)
কারা গ্রেপ্তার হয়েছেন
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—
- বেলায়েত হোসেন
- নাজমুল হাসান
- মেহেদী হাসান
- সোলাইমান সুমন
- ফজলে রাব্বী
- তৌহিদুর রহমান
- কাওসার হোসেন
তাদের বিরুদ্ধে মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা হয়েছে। (BSS)
তদন্তের পরবর্তী ধাপ
সিআইডি জানিয়েছে, উদ্ধার করা পাসপোর্ট, সিল ও ডিজিটাল আলামতের ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। একই সঙ্গে চক্রটির দেশি-বিদেশি সহযোগী, অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক এবং আরও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। (BSS)
বিশ্লেষণ | কেন উদ্বেগজনক এই ঘটনা?
এই ঘটনা শুধু একটি ভিসা জালিয়াতির মামলা নয়; এটি বাংলাদেশের অভিবাসন ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আস্থার জন্যও বড় ধরনের সতর্কবার্তা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো আবেদনকারীর বৈধ ভিসা ও পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিকে বিদেশে পাঠানো সম্ভব হলে তা শুধু প্রতারণাই নয়, আন্তর্জাতিক মানব পাচার, পরিচয় জালিয়াতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর হুমকি।
ইতালির দূতাবাসও আবেদনকারীদের বারবার সতর্ক করে জানিয়েছে, ভিসা আবেদন বা পাসপোর্ট সংক্রান্ত কাজে কোনো তৃতীয় পক্ষের ওপর নির্ভর না করে অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে এবং নথি জালিয়াতি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। (Embassy of Italy Dhaka)
সংবাদ সূত্র: সিআইডি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), আদালতসংশ্লিষ্ট তথ্য ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। (BSS)



