বিলাসবহুল জীবনযাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝলমলে উপস্থিতি আর অভিযোগ—হোয়াটসঅ্যাপ কলেই কোটি টাকার চাঁদা আদায় ও সন্ত্রাসী হামলার নেপথ্যে তিনি
চট্টগ্রাম | বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চট্টগ্রামের সামাজিক ও অপরাধজগতে নতুন করে যে নামটি ঘুরছে, তা হলো মোবারক হোসেন ইমন, যিনি অনলাইনে বেশি পরিচিত ডেভিড ইমন নামে। বিলাসবহুল ভবনের ছাদ, পাঁচতারকা হোটেলের লবি, দামি বার, হিন্দি গানের ব্যাকগ্রাউন্ড আর ফেসবুকে কয়েক লাখ অনুসারী—বাইরে থেকে দেখলে তাকে একেবারে স্টাইলিশ, সেলিব্রেটি-সুলভ এক যুবক বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু পুলিশের ভাষ্যে, ব্যবসায়ীদের কাছে ভয়ংকর এক নাম তিনি; এমনকি শুধু একটি হোয়াটসঅ্যাপ কলেই নাকি কোটি টাকার চাঁদা আদায় করা হয়েছে তাঁর নির্দেশে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের চন্দনপুরায় একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলার পরই আবারও আলোচনায় উঠে আসে এই নাম। অভিযোগ, চাঁদা না দেওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিতে হামলা চালানো হয়, লুট হয় নগদ অর্থ, ভাঙচুর করা হয় অফিস। এরপরই স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আইএসপি মালিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সামাজিক মাধ্যমে ঝলমলে, বাস্তবে ভয়ের নাম
ফেসবুকে ডেভিড ইমনের অ্যাকাউন্টে চোখ রাখলে প্রথমে তাকে কোনো সাধারণ অপরাধী মনে হয় না। বিলাসী জীবনযাপনের নানা মুহূর্ত, দামী পোশাক, বিদেশি সুরে ভিডিও, লাক্সারি লাইফস্টাইল—সব মিলিয়ে তার অনলাইন উপস্থিতি প্রায় সিনেমার নায়কসুলভ। কিন্তু অভিযোগ বলছে, এই ঝলমলে পর্দার পেছনে আছে চাঁদাবাজি, হুমকি আর সশস্ত্র তৎপরতার নেটওয়ার্ক।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের অপরাধজগতে দ্রুত প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। তার নাম প্রথমে বড় সাজ্জাদ গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত হয়। পরে তিনি ওই চক্রের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে পরিচিতি পান বলেও অভিযোগ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী, পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, রাউজান ও হাটহাজারী এলাকায় এই চক্রের প্রভাব বিস্তৃত। এসব এলাকায় ভয়ভীতি দেখানো, চাঁদা দাবি, হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় তাঁর নাম বারবার উঠে এসেছে।
কী অভিযোগ ইমনের বিরুদ্ধে
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দু চাঁদাবাজি। চন্দনপুরার ডিডিএন নামে একটি ইন্টারনেট সেবাপ্রতিষ্ঠানে হামলার আগে প্রতিষ্ঠানটির মালিকের কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। দুই দিনের সময়সীমা দিয়ে টাকা না পেলে “অবস্থা খারাপ হবে”—এমন হুমকিও দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পাওয়ায় সশস্ত্র হামলা চালানো হয়।
প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের ভাষ্য, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত। এতে ২০ থেকে ৩০ জন যুবক অংশ নেয়, যাদের মুখোশ পরা ছিল। হামলার পর লুটপাটও হয় বলে অভিযোগ।
এর পাশাপাশি একই দিন সন্ধ্যায় জিইসির মোড়ে আরেকটি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারের কাছে ফোন যায়। ওই মালিকের দাবি, কলদাতা নিজেকে ডেভিড ইমন হিসেবে পরিচয় দেন এবং বলেন, “ডিডিএনকে কী অবস্থা করেছি দেখছেন তো, টাকা না দিলে আপনারও একই অবস্থা হবে।” এরপর থেকেই তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আরও অভিযোগ, গত এক মাসে অন্তত তিনটি প্রতিষ্ঠানে ফোন করে চাঁদা আদায় করা হয়েছে। মোট আদায়কৃত অঙ্ক প্রায় দেড় কোটি টাকা বলেও অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশের নজরে আসার পরই আতঙ্ক বাড়ে
স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন ডেভিড ইমনকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানা গেছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক কয়েকটি খুন, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসানের ব্রাশফায়ার হত্যাকাণ্ড, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ার জোড়া খুন এবং পতেঙ্গার ঢাকাইয়া আকবর হত্যাকাণ্ডেও তাঁর নাম জড়িয়েছে।
তবে এসব ঘটনায় ডেভিড ইমনের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলো পুলিশি তদন্তাধীন।
অপরাধচক্রের নতুন ধরন: ভয় ও ইমেজ একসঙ্গে
চট্টগ্রামের অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেভিড ইমনের মতো চরিত্ররা শুধু অস্ত্র বা সহিংসতার জোরে নয়, সামাজিক মাধ্যমের ইমেজ-ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করে। অনলাইনে এক ধরনের নায়কোচিত উপস্থিতি তৈরি করে তারা নিজেদের “স্টাইলিশ” বা “অপ্রতিরোধ্য” হিসেবে তুলে ধরে, যাতে ভয়ভীতি আরও কার্যকর হয়।
এই কৌশলে দু’টি লাভ হয়। একদিকে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তাকে চিনে ভয় পায়, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি একধরনের “গ্যাংসটার ইমেজ” তৈরি করতে সক্ষম হন।
আইএসপি খাতেও ভয়াবহ প্রভাব
ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রভাব এখন শুধু ব্যবসায়ী মহলে নয়, আইএসপি খাতেও পড়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগের ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের নেতারা সম্প্রতি সংবাদ সম্মেলনে এসব হামলার নিন্দা জানিয়ে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
তাদের ভাষ্য, এটি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইএসপি মালিকদের কাছে চাঁদা দাবি, টেলিফোনে হুমকি, চাপ এবং দাবি পূরণ না হলে হামলার মতো ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। এই পরিস্থিতি পুরো শিল্পের জন্যই গভীর নিরাপত্তা সংকেত।
কে এই মোবারক হোসেন ইমন
জানা গেছে, মোবারক হোসেন ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগরের বাসিন্দা। পিতার নাম মো. মুসা। কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা ইমন খুব বেশি পড়াশোনা করেননি। অল্প বয়সে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একসময় তাকে খুব বেশি কেউ চিনত না। কিন্তু পরে বড় সাজ্জাদ গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পরই তিনি অপরাধজগতে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এখন তিনি ওই গ্রুপের অন্যতম নেতা হিসেবে কাজ করছেন বলেই চট্টগ্রামজুড়ে ধারণা।
শেষ প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে
ডেভিড ইমন কি সত্যিই চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের নতুন আতঙ্ক, নাকি অভিযোগের ভারে তৈরি হওয়া এক ভয়ংকর প্রতিচ্ছবি—সেটি এখনো তদন্তের বিষয়। কিন্তু ব্যবসায়ী, আইএসপি মালিক আর সাধারণ মানুষের কাছে একটাই বাস্তবতা স্পষ্ট: ফোন এলে, পরিচয় শোনালেই, নাকি নতুন চাঁদা দাবি শুরু হয়।
চট্টগ্রামে এখন প্রশ্ন একটাই—এই ঝলমলে মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নেটওয়ার্ককে পুলিশ কত দ্রুত ভাঙতে পারে?
সংক্ষেপে
- ডেভিড ইমন ওরফে মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সশস্ত্র হামলা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে।
- সামাজিক মাধ্যমে বিলাসবহুল জীবনযাপনের ছবি-ভিডিও দিয়ে তিনি বিশেষ পরিচিতি তৈরি করেছেন।
- অভিযোগ, হোয়াটসঅ্যাপ কলেই তিনি ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি টাকার চাঁদা দাবি করেন।
- চট্টগ্রামের আইএসপি খাত ও ব্যবসায়ী মহলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
- পুলিশ বলছে, তাঁকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।



