৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট, ৩৩ গোল-অবদান, ১৯ গোলের টুর্নামেন্ট—২০২৬ বিশ্বকাপে আবারও মেসি আর আর্জেন্টিনার নামেই জ্বলছে রেকর্ডবই
স্পোর্টস ডেস্ক | TODAY SPORTS
যে ম্যাচ বদলে গেল মাত্র সাত মিনিটে
একসময় ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল পুরোপুরি ইংল্যান্ডের হাতে। ৫৫তম মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যায় থ্রি লায়ন্সরা। কিন্তু বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনাকে শেষ বলে কিছু নেই—এই সত্য আরেকবার প্রমাণিত হলো আটলান্টার রাতে।
শেষ পাঁচ মিনিটে ম্যাচের চিত্রই পাল্টে দেন লিওনেল মেসি। ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজ এবং যোগ করা সময়ে লাউতারো মার্তিনেজের গোলে দুটি অ্যাসিস্ট করেন অধিনায়ক। ২–১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে যায় বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।
গোল নয়, ম্যাচটাই লিখলেন মেসি
স্কোরশিটে নিজের নাম তুলতে পারেননি মেসি। কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিলেন তিনিই।
৩৯ বছর বয়সেও তিনি খেলেছেন একজন প্লেমেকারের মতো। কখন গতি কমাতে হবে, কখন আক্রমণের ছন্দ বদলাতে হবে, আর কখন শেষ পাসটি দিতে হবে—সবকিছুই যেন তাঁর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
এই দুই অ্যাসিস্টের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল-অবদান দাঁড়িয়েছে ৩৩টি (২১ গোল, ১২ অ্যাসিস্ট)—যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ।
গোল্ডেন বুটের দৌড়েও এখন সবার সামনে মেসি
চলতি বিশ্বকাপে মেসির পরিসংখ্যান অবিশ্বাস্য।
- ৮ গোল
- ৪ অ্যাসিস্ট
- মোট ১২টি সরাসরি গোল অবদান
এ মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও তিনি শীর্ষে। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে ফাইনালের আগে তাঁকে ছুঁতে না পারলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিততে পারেন মেসি।
টানা দ্বিতীয় ফাইনাল, ইতিহাসের সামনে আর্জেন্টিনা
এই জয় শুধু আরেকটি ফাইনালে ওঠা নয়।
এটি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সপ্তম বিশ্বকাপ ফাইনাল, যা বিশ্ব ফুটবলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কেবল জার্মানিই (৮) তাদের চেয়ে এগিয়ে।
একই সঙ্গে ১৯৮৬ ও ১৯৯০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো টানা দুই বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল আলবিসেলেস্তেরা।
আর যদি স্পেনকে হারিয়ে শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তবে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও গড়বে আর্জেন্টিনা।
১৯ গোলের বিস্ফোরণ—এটাই স্কালোনির সবচেয়ে ভয়ংকর দল
এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ইতোমধ্যে করেছে ১৯ গোল।
এটি—
- ২০২৬ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলসংখ্যা।
- একবিংশ শতকে কোনো একটি বিশ্বকাপে একটি দলের সর্বোচ্চ গোল।
- আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ইতিহাসেও এক আসরে সর্বোচ্চ গোল।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, ১৯ গোলের মধ্যে ১২টিই এসেছে ৭৫ মিনিটের পর, যা প্রমাণ করে এই দল শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত ম্যাচ ছাড়ে না।
মেসির বিশ্বকাপ সাম্রাজ্য আরও বড় হলো
ইংল্যান্ড ম্যাচের পর আরও কয়েকটি বিশ্বরেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন মেসি।
- বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৩৩টি গোল-অবদান।
- টানা ১১টি বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট।
- বিশ্বকাপ ইতিহাসে রেকর্ড ১৬টি প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ।
- ২০২৬ বিশ্বকাপে পঞ্চম ম্যাচসেরা পুরস্কার।
এই পরিসংখ্যানগুলো শুধু একজন ফুটবলারের নয়; এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ধারাবাহিক পারফর্মারের গল্প।
ইংল্যান্ডের জন্য আবারও সেমিফাইনালের অভিশাপ
১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ড আর কোনো বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলতে পারেনি।
বরং—
- ১৯৯০
- ২০১৮
- ২০২৬
এই তিনটি সেমিফাইনালেই হারতে হয়েছে তাদের।
এবারও প্রথমে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হারল গ্যারেথ সাউথগেটের দল।
ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা: ইতিহাসে যোগ হলো আরেকটি অধ্যায়
এই দুই দলের লড়াই কখনোই শুধু ফুটবল নয়।
১৯৮৬ সালের “হ্যান্ড অব গড”, একই ম্যাচে “গোল অব দ্য সেঞ্চুরি”, ১৯৯৮ সালের বেকহ্যামের লাল কার্ড, ২০২৬ সালের এই নাটকীয় সেমিফাইনাল—সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও সমৃদ্ধ হলো।
আর এবারের অধ্যায়ের কেন্দ্রেও ছিলেন একজন—লিওনেল মেসি।
এবার অপেক্ষা স্পেনের
ফাইনালে প্রতিপক্ষ বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
একদিকে ইউরোপের সবচেয়ে ধারাবাহিক দল।
অন্যদিকে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
এটি হবে বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন বনাম বর্তমান কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়নের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনাল—যা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম আকর্ষণীয় লড়াই হওয়ার অপেক্ষায়।
রেকর্ডবক্স | এক নজরে
► বিশ্বকাপ ফাইনাল: আর্জেন্টিনা – ৭মবার
► টানা ফাইনাল: দ্বিতীয়বার (১৯৮৬–৯০-এর পর)
► ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল: ১৯ (সর্বোচ্চ)
► মেসি: ৮ গোল, ৪ অ্যাসিস্ট
► বিশ্বকাপে মোট অবদান: ২১ গোল + ১২ অ্যাসিস্ট = ৩৩
► প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: ১৬ (বিশ্বরেকর্ড)
► টানা ১১ বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল বা অ্যাসিস্ট: নতুন রেকর্ড
► ইংল্যান্ড: ১৯৯০, ২০১৮ ও ২০২৬—তিন সেমিফাইনালেই বিদায়
শেষকথা | এটি কি মেসির শেষ মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়?
ফাইনালে এখন অপেক্ষা স্পেনের। কিন্তু আর্জেন্টিনার জন্য এটি শুধু শিরোপা রক্ষার ম্যাচ নয়; এটি লিওনেল মেসির কিংবদন্তিকে আরও এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ।
যদি ট্রফিটি আবারও তাঁর হাতেই ওঠে, তবে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু আর্জেন্টিনার শিরোপা রক্ষার গল্প হবে না—এটি হয়ে থাকবে এমন এক ফুটবলারের শেষ মহাকাব্য, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছেন।



