Homeনাগরিক দর্পণএকজন মোবাইল মেকানিক, এক বাবার দীর্ঘশ্বাস আর আমাদের সমাজের আয়না

একজন মোবাইল মেকানিক, এক বাবার দীর্ঘশ্বাস আর আমাদের সমাজের আয়না

বসুন্ধরা সিটিতে মোবাইল মেরামতের একটি সাধারণ সকাল। কিন্তু সেই সাধারণতার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক বাবার অসহায়ত্ব, এক সন্তানের দূরত্ব আর এক অপরিচিত মানুষের নিঃশব্দ মানবিকতার গল্প।

ঢাকা | নাগরিক দর্পণ ডেস্ক

বসুন্ধরা সিটিতে মানুষ প্রতিদিন যায়। কেউ নতুন ফোন কিনতে, কেউ পুরোনো ফোন সারাতে, কেউ দাম জিজ্ঞেস করতে, কেউ সময় কাটাতে। হাজারো মানুষের ভিড়ে অধিকাংশ মুখই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু দৃশ্য থাকে, যা চোখে নয়—সরাসরি বুকের ভেতর গিয়ে বসে।

আজকের ঘটনাটাও তেমনই।

টাঙ্গাইল থেকে আসা একজন বয়স্ক মানুষ। পায়ে সাধারণ দুই ফিতার প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। পুরোনো প্যান্ট, বহুদিনের ব্যবহারে বিবর্ণ হয়ে যাওয়া শার্ট। মুখভর্তি সাদা দাড়ি। হাতে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন।

মুখের দিকে তাকালেই বোঝা যায়—মানুষটি কোনো স্বস্তি নিয়ে আসেননি, দুশ্চিন্তা নিয়েই এসেছেন।

এক দোকান থেকে আরেক দোকান ঘুরে অবশেষে এসে দাঁড়িয়েছেন একটি মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারে। তাঁর সিরিয়ালও ছিল অপেক্ষমাণ।

দুই মিনিট পরপরই তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন—

“আমার মোবাইলটা ঠিক হবেতো?”

মেকানিক আশ্বস্ত করছিলেন—

“অবশ্যই হবে চাচা। ডিসপ্লে ঠিক করতে হবে, ব্যাটারি পাল্টাতে হবে।”

কিন্তু প্রশ্নটা মোবাইল নিয়ে ছিল না। প্রশ্নটা ছিল অন্য কিছু নিয়ে। হয়তো একজন বাবার উদ্বেগ নিয়ে।

এক পর্যায়ে বৃদ্ধ নিজেই বললেন—

“মোবাইলটা যদি ঠিক না হয় খুব ঝামেলা হবে। আমার ছেলের ফোন। দুইদিন ধরে রাগ করে আছে। নতুন ফোন চায়। অনেক কষ্টে টাঙ্গাইল থেকে আসছি। একটু ভালো করে দেখে দিয়েন।”

কথাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু সেই সাধারণ কথার ভেতরে হয়তো একটা সংসারের ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।

এরপর আরও নিচু গলায় বললেন—

“একটু কমে-সমে করে দিয়েন বাবাজি। নিজের লোক মনে করে। এইটা ঠিক না করলে আরেকটা কেনা লাগবে। আমার পক্ষে আর সম্ভব না…”

একজন বাবা যখন নিজের প্রয়োজনের জন্য নয়, সন্তানের অভিমান ভাঙানোর জন্য অপরিচিত মানুষের কাছে এভাবে অনুরোধ করেন—তখন বোঝা যায় বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের শক্তি কমে যায় না, বরং অসহায়ত্ব বেড়ে যায়।

আরও কিছুক্ষণ পর তাঁর বাটন ফোনে কল আসে। সম্ভবত বাড়ি থেকে।

দূরে গিয়ে স্ত্রীকে বলছিলেন—

"পোলাটারে একটু বুঝাও। এত রাগ ভালো না। আমাগো কি এতো সামর্থ্য আছে? বাড়ি থেকে বাসে দাঁড়ায় আসছি ঢাকা পর্যন্ত। শরীরে কুলায় না..."

এই কথাগুলো হয়তো ফোনের ওপাশে স্ত্রী শুনছিলেন। কিন্তু দোকানের ভেতরে থাকা মানুষগুলোর বুকেও গিয়ে লেগেছিল।

যে মেকানিককে প্রথমে কঠিন স্বভাবের মানুষ মনে হচ্ছিল, তিনিও সম্ভবত নরম হয়ে গিয়েছিলেন।

তিনি বৃদ্ধকে বললেন—

“চাচা বসেন। একটা কফি খান। আমি আপনার ছেলের বয়সী। টেনশন করেন না।”

এরপর মোবাইল ঠিক হয়ে গেল।

কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল শেষে।

বৃদ্ধ টাকা দিতে গেলেন।

মেকানিক বললেন—

“চাচা, লাগবে না। আপনি বাড়ি যান।”

বৃদ্ধ অবাক হয়ে বললেন—

“না না বাপজান, বিল নেন…”

কিন্তু মেকানিক নেননি।

পরে জানতে চাইলে তিনি নাকি শুধু বলেছিলেন—

“আমার বাবা নাই। আমি বুঝি বাপ থাকার কী মর্ম। আমার কয়েকশ টাকা গেছে যাক। তার মনে একটু আনন্দ দিতে পারছি—এটাই শান্তি।”

আজকের দিনে মানুষকে নিয়ে আমরা প্রায়ই হতাশ হই। মনে হয় সব জায়গায় হিসাব, স্বার্থ আর নিষ্ঠুরতা।

কিন্তু হয়তো পৃথিবী এখনও পুরোপুরি খারাপ হয়ে যায়নি।

কারণ কিছু মানুষ এখনও আছে, যারা শুধু মোবাইলের ভাঙা হার্ডওয়্যার জোড়া লাগায় না—একজন বাবার ভেঙে যাওয়া মনও একটু জোড়া লাগিয়ে দেয়।

হয়তো এই কারণেই পৃথিবী এখনও টিকে আছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments