২ লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ, বিশেষ রোগীদের জন্য ছাড়; তবে পুরোনো মালিকদের ফেরার পথ বন্ধ করে দিয়ে ব্যাংক খাতে সুশাসনের প্রশ্ন আরও বড় হলো
ঢাকা | ৫ জুলাই ২০২৬
শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের আতঙ্ক কমাতে সরকার ২ লাখ টাকা পর্যন্ত তাৎক্ষণিক উত্তোলনের সুযোগ দিয়েছে এবং ব্যাংক রেজুলিউশন আইনের বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, ব্যক্তি আমানতকারীরা তাদের চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা তুলে নিতে পারবেন, আর বাকি অর্থ ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে। ডায়ালাইসিস, ক্যান্সার চিকিৎসা ও হজ সঞ্চয় হিসাবধারীদের জন্য বিশেষ ছাড়ও রাখা হয়েছে। (The Financial Express)
একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংক হলো ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো একীভূত করে গঠন করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত নতুন শরিয়াহভিত্তিক প্রতিষ্ঠান “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি”, যা প্রাথমিকভাবে সরকারি মালিকানায় পরিচালিত হলেও পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা পর্ষদের অধীনে চলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে এই পাঁচ ব্যাংকের আর্থিক সংকট দীর্ঘদিনের, আর পুনর্গঠন প্রক্রিয়াই এখন মূল বাস্তবতা। (The Daily Star)
💰 কী ঘটেছে
বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত সিদ্ধান্তে আমানতকারীদের জন্য একটি ধাপে ধাপে ফেরত কাঠামো কার্যকর করা হয়েছে। ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত পুরোপুরি সুরক্ষিত, আর এর বেশি জমা থাকলে অতিরিক্ত অর্থ ৩ মাস অন্তর ১ লাখ টাকা করে ছাড় করা হবে; পুরো অর্থ ফেরত পেতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস লাগতে পারে। একীভূত ব্যাংকের স্কিমে কিডনি ডায়ালাইসিস ও ক্যান্সার রোগীদের জন্য কোনো উত্তোলন সীমা থাকবে না, আর হজ সঞ্চয় হিসাবধারীরাও বিশেষ বিবেচনার আওতায় পড়বেন।
অন্যদিকে, ব্যাংক রেজুলিউশন আইনের ১৮(ক) / 18(A) ধারা বাতিলের মাধ্যমে সংকটগ্রস্ত ব্যাংকের পুরোনো মালিকদের আবারও নিয়ন্ত্রণে ফেরার সুযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, এ ধারা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল, আর বাংলাদেশ ব্যাংকও মূল খসড়ায় এমন বিধান রাখেনি; সেটি শেষ মুহূর্তে যুক্ত হয়েছিল।
📊 গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
- ২ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতকারীরা তাৎক্ষণিক উত্তোলন করতে পারবেন।
- ২ লাখ টাকার বেশি আমানত ৩ মাস অন্তর ১ লাখ টাকা করে ধাপে ধাপে ফেরত দেওয়া হবে।
- পূর্ণ অর্থ ফেরত পেতে সর্বোচ্চ ২৪ মাস লাগতে পারে।
- পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি” হয়েছে।
- নতুন ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
🏦 অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
এ সিদ্ধান্তের তাৎক্ষণিক সুফল হলো আমানতকারীদের বড় অংশের উদ্বেগ কমবে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের জন্য ২ লাখ টাকার সুরক্ষা এবং চিকিৎসাজনিত বিশেষ ছাড় আস্থা ফেরাতে সাহায্য করতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজল্যুশন স্কিমও দেখাচ্ছে যে কর্তৃপক্ষ ব্যাংকটিকে বন্ধ না করে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল করতে চায়।
তবে এই স্বস্তির পাশে একটি বড় জটিলতাও রয়ে গেছে। ২ লাখ টাকার বেশি আমানতকারীদের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত না পাওয়ায় অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন ব্যাংকের ওপর বিপুল দায়, এবং দুর্বল ব্যাংক ব্যবস্থাপনার উত্তরাধিকার, পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে কঠিন করে তুলবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংকের সম্পদের গুণগত মানও দুর্বল ছিল; ২০২৫ সালের মে নাগাদ এদের ঋণ ও খেলাপি ঋণের চাপ ছিল অত্যন্ত বেশি।
🏭 ব্যাংক ও শিল্পখাতের প্রভাব
ব্যাংক খাতের জন্য ১৮(ক) ধারা বাতিল একটি স্পষ্ট বার্তা—রাষ্ট্র আর পুরোনো মালিকানা কাঠামো ফিরিয়ে এনে সংকট সমাধান করতে চাইছে না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, এ ধারা ব্যাংকিং খাতে দায়মুক্তি ও লুটপাটের ঝুঁকি বাড়াতে পারত। সম্পাদক পরিষদও একইভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছিল।
কিন্তু আরেকটি বাস্তবতা হলো, একীভূতকরণ সফল না হলে বাজারে আস্থার সংকট আরও দীর্ঘায়িত হতে পারে। বড় আমানতকারীরা টাকা আটকে গেলে ব্যবসায়িক লেনদেন, এলসি, চলতি মূলধন এবং নগদ প্রবাহেও চাপ পড়তে পারে।
👨👩👧👦 সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব
ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য এটি পরিষ্কারভাবে স্বস্তির খবর। যাদের সঞ্চয় ২ লাখ টাকার মধ্যে, তারা এখন টাকার নিরাপত্তা নিয়ে অপেক্ষাকৃত নিশ্চিত হতে পারেন। তবে বড় সঞ্চয়কারীদের জন্য এই সিদ্ধান্ত মানে আরও ধৈর্য ধরা।
মুনাফা নিয়েও সিদ্ধান্ত বদলেছে। জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রথমে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানত মুনাফা না দেওয়ার কথা বলেছিল, পরে ২২ জানুয়ারি ব্যক্তিগত আমানতকারীদের জন্য ৪ শতাংশ হারে অস্থায়ী মুনাফার নির্দেশনা দেয়। অর্থাৎ এই ইস্যু এখন আর আগের অবস্থায় নেই।
🔎 দাবি বনাম বাস্তবতা
দাবি: ১৮(ক) ধারা থাকলে ব্যাংক দ্রুত উদ্ধার পেত।
বাস্তবতা: সমালোচকরা মনে করছেন, ওই ধারা ফিরলে পুরোনো মালিকদের নিয়ন্ত্রণে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো, যা সুশাসন ও জবাবদিহির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
দাবি: ২ লাখ টাকা সুরক্ষিত মানে আমানতকারীদের পুরো সমস্যা মিটে গেছে।
বাস্তবতা: ক্ষুদ্র আমানতকারীরা স্বস্তি পেলেও বড় আমানতকারীদের টাকা ধাপে ধাপে ফেরত আসবে; পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে ২৪ মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।
📌 এখন যে বিষয়গুলোর দিকে নজর থাকবে
নতুন ব্যাংকটি কত দ্রুত কার্যকরভাবে আমানত ফেরত দিতে পারে, বড় আমানতকারীদের বাকি টাকা কীভাবে নিষ্পত্তি হবে, এবং ১৮(ক) বাতিলের পর ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের নতুন কাঠামো কতটা শক্ত হয়—এগুলোই এখন মূল প্রশ্ন।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ঘোষণা, দ্য ডেইলি স্টার, প্রোথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, নিউ এজ, টিআইবি।



