- ২০০৯ সালের এক রক্তক্ষয়ী রাতে স্বামীহারা হওয়া এক সেনা কর্মকর্তা কীভাবে ১৭ বছর পর নিজেই মামলার আসামি হলেন— অনুসন্ধানে তথ্য ও ভাষ্যের ফারাক
পঞ্চগড় | ৪ জুলাই | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনের অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় মেজর (অব.) কাজী মৌসুমীকে গত সপ্তাহে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। কাজী মৌসুমী পঞ্চগড়-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নাঈমুজ্জামান ভূঁইয়া মুক্তার স্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় যুব মহিলা লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য। ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে একটি তথ্যে— একাধিক সূত্র বলছে, তিনি ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ডে শহীদ এক সেনা কর্মকর্তার বিধবা স্ত্রী।
দুটি সময়— ২০০৯ ও ২০২৬— এবং দুটি ভিন্ন পরিচয়ে একই মানুষের নাম উঠে আসার এই ঘটনা এখন আইনি প্রশ্নের পাশাপাশি জড়িয়ে পড়েছে ইতিহাস, রাজনীতি ও যাচাইযোগ্যতার প্রশ্নেও।
🔎 আদালতের নথি অনুযায়ী যা ঘটেছিল
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ২৩ জুন রাতে পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের কাজীপাড়া এলাকায় নাঈমুজ্জামান মুক্তার খামারবাড়িতে কাজী মৌসুমীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ৭৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হয়। প্রায় ১২০ জন অংশ নেওয়া ওই অনুষ্ঠানে কেক কাটা, ‘জয় বাংলা’ ও ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেওয়া এবং স্থানীয়দের মধ্যে নগদ অর্থ ও খাবার বিতরণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অনুষ্ঠানের ভিডিও ও ছবি পরে ‘আওয়ামী লীগ নিউজ’ নামের একটি ফেসবুক আইডিতে আপলোড করা হয় বলেও এজাহারে উল্লেখ আছে।
এই ঘটনার ভিত্তিতে ২০ জুলাই ২০২৫ পঞ্চগড় সদর থানার উপপরিদর্শক মানিক মিয়া বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর অধীনে ৪৭ জনের নাম উল্লেখসহ মোট ১১০ থেকে ১২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় নাঈমুজ্জামান মুক্তা এক নম্বর এবং কাজী মৌসুমী দুই নম্বর আসামি। অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রের জননিরাপত্তা বিপন্ন করা, সরকার উৎখাতের উদ্দেশ্যে সম্পদ ধ্বংস ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে— অর্থাৎ প্রসিকিউশনের অভিযোগ কেবল কেক কাটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম আয়োজন, নেতৃত্বদান ও উসকানির অভিযোগও এতে যুক্ত।
📊 জামিন নাকচ, কারাগারে প্রেরণ
কাজী মৌসুমী ও একই মামলার আসামি পঞ্চগড় জেলা যুব মহিলা লীগের সভাপতি নীলুফা ইয়াসমিন এর আগে হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন। জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ২৮ জুন সোমবার তারা পঞ্চগড় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণ করে নতুন করে জামিনের আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মির্জা নাজমুল ইসলাম কাজল আদালতে যুক্তি দেন, নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগ কোনো কার্যক্রম চালাতে পারে না, অথচ অভিযুক্তরা প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে হুমকি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ আনা হয়।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মির্জা সারোয়ার হোসেন আদালতকে জানান, কাজী মৌসুমী একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা এবং তার একটি ছোট সন্তান প্রতিবন্ধী ও অসুস্থ; নীলুফা ইয়াসমিন দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং তার একটি পা প্রায় অচল হওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। এসব মানবিক দিক তুলে ধরে জামিনের অনুরোধ করা হলেও পঞ্চগড়ের ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মাহবুব আলী মুয়াদ জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আশা প্রকাশ করেছেন, মামলার সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।

📌 পিলখানা সংযোগ: ১৭ বছর আগের এক রাত
এই মামলার বাইরেও কাজী মৌসুমীর নাম জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বেদনাদায়ক অধ্যায়ের সঙ্গে। ২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দপ্তর পিলখানায় সংঘটিত বিদ্রোহে সেনাবাহিনীর ৫৭ জন কর্মকর্তা নিহত হন— যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সামরিক ট্র্যাজেডিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত।
নিহত ৫৭ জনের একজন ছিলেন মেজর আবু সাঈদ গাজ্জালী দস্তগীর, সেনাবাহিনীর আর্মার্ড কোরের কর্মকর্তা। হত্যাকাণ্ডের পর ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি সেন্ট্রাল মসজিদে জানাজা শেষে তাঁকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বনানী সামরিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
একাধিক স্বতন্ত্র সূত্রে “পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শিকার মেজর গাজ্জালীর স্ত্রী মেজর (অব.) কাজী মৌসুমী” শীর্ষক তথ্য পাওয়া গেছে, যা মেজর গাজ্জালী দস্তগীরের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্কের দাবিকে সমর্থন করে। পাশাপাশি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকাশিত সরকারি নোটিশ অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর সার্ভিস নম্বর বিএ ৬৫৯২-এর অধিকারী মেজর কাজী মৌসুমীকে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় (অকালীন) অবসর প্রদান করা হয়— যা তাঁর সামরিক ক্যারিয়ার ও অবসরের বিষয়টি সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করে।
তবে বৈবাহিক সংযোগের বিষয়টি এখনো মূলধারার সংবাদমাধ্যমে— যারা তাঁর সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার নিয়ে প্রতিবেদন করেছে— সরাসরি নিশ্চিত হয়নি। ফলে এটিকে একাধিক সূত্রে সমর্থিত ও সঙ্গতিপূর্ণ তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠিত সরকারি নথিভুক্ত সত্য হিসেবে নয়।
💬 দুই বয়ান, দুই প্রশ্ন
| বিষয় | আদালতের নথি ও প্রসিকিউশনের ভাষ্য | সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত ভাষ্য |
|---|---|---|
| ঘটনার প্রকৃতি | নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন, নেতৃত্বদান, স্লোগান, প্রচার, হুমকি | নিছক একটি কেক কাটার অনুষ্ঠান |
| অভিযোগের গুরুত্ব | সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জননিরাপত্তা বিপন্নের অভিযোগ | সামান্য অভিযোগে অতিরঞ্জিত গ্রেপ্তার বলে দাবি |
| ব্যক্তিগত পরিচয় | আদালতে শুধু সন্তানের প্রতিবন্ধিতার কথা উল্লেখ | পিলখানার শহীদ-পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচিতি |
এই পার্থক্য থেকে স্পষ্ট, ঘটনাটি নিয়ে জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার একটি বড় কারণ— প্রকৃত আইনি অভিযোগ এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত সরলীকৃত বিবরণের মধ্যে ফারাক। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম আয়োজন ও নেতৃত্বদানকে কেন্দ্র করে গঠিত, আর সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টিকে একটি নিরীহ পারিবারিক অনুষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, একজন শহীদ-পরিবারের সদস্যের বিরুদ্ধে এত বড় আইনি পদক্ষেপ যৌক্তিক কি না।
📌 এখনো যা স্পষ্ট নয়
- কাজী মৌসুমী পিলখানা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন কি না— এ বিষয়ে কোনো স্বাধীন, যাচাইযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি
- ২০১১ সালে তাঁর অবসরের প্রকৃত কারণ পারিবারিক পরিস্থিতি নাকি অন্য কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, তা নিশ্চিত নয়
- মামলার পরবর্তী ধাপে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপক্ষ কী কী সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করবে
- জামিন নামঞ্জুরের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে নতুন কোনো আবেদন হবে কি না
এই প্রতিবেদন প্রস্তুতির সময় পর্যন্ত কাজী মৌসুমীর বিরুদ্ধে অন্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা আর্থিক অভিযোগের যাচাইযোগ্য সংবাদ সূত্র পাওয়া যায়নি।
সূত্র: আদালতের এজাহার ও শুনানি সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরকারি নোটিশ, রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য, পিলখানা হত্যাকাণ্ডের শহীদ তালিকা-সংক্রান্ত প্রকাশিত প্রতিবেদন, সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য



