মিসরীয় দূতাবাসের একটি চিঠি কীভাবে ফাঁস করে দিল একটি প্রকল্পের আড়ালে থাকা প্রতারণার কাঠামো — অনুসন্ধানে উঠে এলো ব্যক্তি, ফোরাম আর প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহারের বিস্তারিত চিত্র
চট্টগ্রাম | ৪ জুলাই | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
চট্টগ্রাম নগরের যানজট নিরসনে যে মনোরেল প্রকল্প নিয়ে মাসখানেক ধরে জল্পনা চলছিল, সেটির পেছনের বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত প্রকাশ্যে এসেছে একটি কূটনৈতিক চিঠির মাধ্যমে। ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প ঘিরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও কার্যকরী চুক্তি (এমওএ) সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে দিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। কারণ, যাকে বিদেশি নির্মাণ কনসোর্টিয়ামের প্রতিনিধি ধরে নিয়ে চুক্তি করা হয়েছিল, তিনি আদতে সেই কনসোর্টিয়ামের কেউই নন — এমনটাই জানিয়েছে খোদ মিসরীয় দূতাবাস।
এই ঘটনা কেবল একটি চুক্তি বাতিলের খবর নয়। এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, একটি পরিচিত কর্পোরেট নাম আর কিছু আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দরজা পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া সম্ভব — যদি না যাচাই-বাছাইয়ের ধাপগুলো ঠিকমতো অনুসরণ করা হয়।
🔎 শুরুটা হয়েছিল যেভাবে
২০২৫ সালের ১ জুন। চট্টগ্রাম মহানগরে মনোরেল নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে চসিক একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে কাউসার আলম চৌধুরী নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন মিসরের দুই শীর্ষস্থানীয় নির্মাণ প্রতিষ্ঠান — ওরাসকম কনস্ট্রাকশন ও দ্য আরব কন্ট্রাক্টরস — এর যৌথ নাম নিয়ে গঠিত ‘আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে।
সমঝোতা স্মারকে দেখানো নথিপত্রে ছিল একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, একটি মেমোরেন্ডাম অব এগ্রিমেন্ট, প্রতিষ্ঠানের সিলমোহর ও স্বাক্ষরসহ কাগজপত্র। এরপর প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা চেয়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর কাছেও আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি জনপরিসরে এমনভাবে উপস্থাপিত হয়, যেন এটি একটি চূড়ান্ত, বৈধ ও সরকারি পর্যায়ে অনুমোদিত আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তি।
💬 প্রশ্ন যেভাবে উঠতে শুরু করে
সম্প্রতি প্রচারিত একটি টেলিভিশন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই সমঝোতাকে ঘিরেই প্রশ্ন তোলা হয় — পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মতো একটি নথি কি সত্যিই প্রকল্পের চূড়ান্ত বৈধতা প্রমাণ করে, নাকি এটি কেবল সীমিত প্রতিনিধিত্বের কাগজ? প্রতিবেদনে দেখানো নথিতে থাকা প্রতিষ্ঠানের নাম, স্বাক্ষর ও সিলমোহর প্রকৃতপক্ষে কতটা যাচাইযোগ্য, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করা হয়।
সাংবাদিকতার সাধারণ নীতি অনুযায়ী, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি কাউকে নির্দিষ্ট কাজে প্রতিনিধিত্বের অনুমতি দিতে পারে, কিন্তু তা নিজে থেকেই মালিকানা বা চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন হয়ে যায় না। ঠিক এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই পরবর্তীতে পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
📊 দূতাবাসের চিঠি: যা বদলে দিল সবকিছু
গত ২২ জুন ঢাকাস্থ মিসরীয় দূতাবাস বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানায় — কাউসার আলম চৌধুরীর সঙ্গে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন বা দ্য আরব কন্ট্রাক্টরসের কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক বা চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক নেই। তিনি এই দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আলোচনা, চুক্তি স্বাক্ষর কিংবা যেকোনো প্রকল্প প্রচারের জন্যও অনুমোদনপ্রাপ্ত নন।
পরদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চসিককে অবহিত করে। এরপরই শুরু হয় পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া।
| যা দাবি করা হয়েছিল | দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য |
|---|---|
| ওরাসকম ও আরব কন্ট্রাক্টরসের অনুমোদিত প্রতিনিধি | কোনো অনুমোদিত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি |
| প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরের ক্ষমতা | অনুমোদনপ্রাপ্ত নন |
| প্রকল্প প্রচার ও আলোচনার অধিকার | অনুমোদনপ্রাপ্ত নন |
| পাওয়ার অব অ্যাটর্নি ও এমওএ-এর বৈধতা | স্বতন্ত্রভাবে যাচাই হয়নি |
📌 চসিকের সিদ্ধান্ত: সম্পূর্ণ চুক্তি বাতিল
তথ্য যাচাইয়ের পর গত ২৪ জুন, বুধবার, চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে মনোরেল প্রকল্প-সংক্রান্ত সব সমঝোতা ও চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা হয়। আদেশ কার্যকর হয় একই দিন থেকে, চসিকের সচিবালয় বিভাগের সাধারণ শাখার মাধ্যমে।
অফিস আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় ও ক্ষমতা সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আগের এমওইউ ও সংশ্লিষ্ট চুক্তিপত্র বাতিল করা হলো। সিদ্ধান্তের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে বিডা, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, নগরীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সম্ভাবনা বিবেচনা করেই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য সমঝোতা স্মারকটি করা হয়েছিল। তিনি জানান, এই প্রক্রিয়ায় সিটি করপোরেশনের কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি এবং নতুন তথ্য পাওয়ার পরই চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
🔎 শুধু চট্টগ্রাম নয় — আরও কয়েকটি প্রকল্পের নাম আলোচনায়
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, স্বঘোষিত ‘আরব কন্ট্রাক্টরস-ওরাসকম পেনিনসুলা কনসোর্টিয়াম’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কেবল চট্টগ্রামের মনোরেল প্রকল্প নিয়েই নয়, যোগাযোগ করেছিলেন আরও দুটি বড় উদ্যোগ নিয়েও —
- খুলনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প
- মোংলা বন্দরে বিনিয়োগ প্রস্তাব
এই দুটি ক্ষেত্রেই তারা বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছিলেন বলে সূত্রে জানা গেছে। এ থেকে বোঝা যায়, এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা ছিল না, বরং একটি বৃহত্তর প্যাটার্নের অংশ — যেখানে পরিচিত আন্তর্জাতিক নাম ব্যবহার করে একাধিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির চেষ্টা হয়েছে।
এই প্রকল্পকে ঘিরে গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরাম নামের একটি সংগঠনের নামও আলোচনায় এসেছে। সংগঠনটির সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী এবং সদস্য সচিব আলী নাজির শাহীন বিভিন্ন সময় প্রকল্প-সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত ছিলেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তবে এই সংগঠন বা এর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ বা প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশিত হয়নি, ফলে তাদের ভূমিকা সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করা এই মুহূর্তে সমীচীন নয়।
💬 অভিযুক্তের প্রতিক্রিয়া
চসিক কার্যালয়ে গিয়ে কাউসার আলম চৌধুরী নিজে সাংবাদিকদের বলেন, কেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এর পেছনের কারণ জানতেই তিনি চসিকে এসেছেন। তিনি জানান, মেয়রের সঙ্গে কথা বলার পর বিস্তারিত জানতে পারবেন এবং পরবর্তীতে সে বিষয়ে বক্তব্য দেবেন। এখন পর্যন্ত তার পক্ষ থেকে আর কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
📊 আসল প্রকল্প বনাম ছায়া-চুক্তি: পার্থক্যটা কোথায়
বিভ্রান্তি এড়াতে এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট করা দরকার। চট্টগ্রাম মহানগরে মনোরেল নির্মাণের একটি প্রকৃত সরকারি উদ্যোগও পাশাপাশি চলমান, যেখানে ওরাসকম কনস্ট্রাকশন ও আরব কন্ট্রাক্টরস গ্রুপ যৌথভাবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার জন্য একটি পৃথক সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। সেখানে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এবং প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে প্রায় ৫৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তিনটি রুটে ৩২ থেকে ৩৩টি স্টেশন থাকার কথা।
অর্থাৎ, একদিকে ছিল প্রতিষ্ঠান দুটির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বৃহত্তর, প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার কাঠামো — আর অন্যদিকে ছিল একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক, অস্বীকৃত প্রতিনিধিত্বের দাবিতে গড়ে ওঠা পৃথক সমঝোতা, যেটি এখন বাতিল হয়েছে। দুটি প্রক্রিয়া একই প্রতিষ্ঠানের নাম বহন করলেও, বৈধতার প্রশ্নে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে দাঁড়িয়ে ছিল — আর সাধারণ মানুষের কাছে এই পার্থক্য বোঝা সহজ ছিল না।
📌 শিক্ষা: প্রতিনিধিত্বের কাগজ আর চূড়ান্ত চুক্তি এক জিনিস নয়
এই ঘটনা থেকে বড় প্রশাসনিক শিক্ষা হলো — কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কেউ প্রতিনিধিত্বের দাবি করলে তা সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরের মাধ্যমে সরাসরি যাচাই করা প্রয়োজন, স্রেফ উপস্থাপিত কাগজপত্রের ভিত্তিতে নয়। পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, সিলমোহর বা প্রতিষ্ঠানের লোগো সংবলিত নথি দেখেই কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করার আগে প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কতটা কঠোর হওয়া উচিত, এই ঘটনা তা নতুন করে সামনে এনেছে।
এখনো যেসব প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত
- কাউসার আলম চৌধুরী বা তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে প্রতারণা বা জালিয়াতির অভিযোগে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না
- প্রাথমিক যাচাই ছাড়াই সমঝোতা স্মারকে সই করার সিদ্ধান্তে জড়িত আগের কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণ হবে কি না
- খুলনার সৌরবিদ্যুৎ ও মোংলা বন্দরের বিনিয়োগ প্রস্তাব দুটির বর্তমান অবস্থা কী
- গ্রেটার চিটাগাং ইকোনমিক ফোরামের সঙ্গে এই সমঝোতার প্রকৃত সম্পর্ক ঠিক কতটা গভীর ছিল
এসব প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনো অপেক্ষমাণ। Today TV BD বিষয়টির অগ্রগতি নিয়মিত অনুসরণ করছে এবং নতুন তথ্য পাওয়া মাত্র হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
সূত্র: চসিক অফিস আদেশ, মিসরীয় দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পত্র যোগাযোগ, স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও সরকারি সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন



