ফোন নম্বর শেয়ার না করেও যোগাযোগের সুযোগ দিতে নতুন ইউজারনেম ব্যবস্থা আনছে হোয়াটসঅ্যাপ। ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা বাড়লেও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা দেখছেন নতুন কিছু উদ্বেগও।
ঢাকা | ২ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে হোয়াটসঅ্যাপে কারও সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বর ছিল প্রধান পরিচয়। কিন্তু সেই পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে মেটার মালিকানাধীন মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ। নতুন ব্যবস্থায় ব্যবহারকারীরা ফোন নম্বরের পরিবর্তে আলাদা একটি ইউনিক ইউজারনেম ব্যবহার করেই চ্যাট করতে পারবেন।
হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে, নতুন এই ফিচারের মূল লক্ষ্য ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা আরও শক্তিশালী করা। বিশেষ করে এমন পরিস্থিতিতে, যেখানে কেউ যোগাযোগ করতে চান কিন্তু ব্যক্তিগত ফোন নম্বর সরাসরি শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
পরিচয়ের নতুন ঠিকানা
নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ব্যবহারকারী একটি স্বতন্ত্র বা ইউনিক ইউজারনেম নির্বাচন করতে পারবেন। অন্য কেউ একই নাম ব্যবহার করতে পারবে না। এই ইউজারনেম ব্যবহার করেই অন্য ব্যবহারকারীরা তাদের খুঁজে পাবেন এবং যোগাযোগ শুরু করতে পারবেন।
ফোন নম্বর সাধারণভাবে দৃশ্যমান থাকবে না। তবে যদি কোনো ব্যক্তির নম্বর আগে থেকেই কারও কনট্যাক্ট লিস্টে সংরক্ষিত থাকে, তাহলে তা আগের মতোই দেখা যেতে পারে।
ব্যবহারকারীরা চাইলে ভবিষ্যতে ইউজারনেম পরিবর্তন বা মুছে ফেলতেও পারবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো, তবে একেবারে একই নয়
প্রথম দেখায় বিষয়টি Instagram, Telegram বা X-এর ইউজারনেম ব্যবস্থার মতো মনে হতে পারে। তবে হোয়াটসঅ্যাপ বলছে, তাদের ক্ষেত্রে ইউজারনেমকে কোনো পাবলিক প্রোফাইল পরিচয় হিসেবে তৈরি করা হয়নি।
এখানে উদ্দেশ্য অনুসরণকারী বাড়ানো নয়; বরং ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য আড়াল রাখা।
অ্যাপের সেটিংসের Account বিভাগে গিয়ে ব্যবহারকারীরা ইউজারনেম নির্বাচন করতে পারবেন। চাইলে QR কোড বা শেয়ারযোগ্য লিংকের মাধ্যমেও অন্যদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।

কেন প্রয়োজন হলো এই পরিবর্তন?
বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর অনেক ব্যবহারকারী অপরিচিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে ফোন কল বা বার্তা পাওয়ার অভিযোগ করেন।
ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে হোয়াটসঅ্যাপের প্রোডাক্ট টিম জানায়, অনেকেই যোগাযোগ করতে চান, কিন্তু নিজেদের ফোন নম্বর প্রকাশ করতে চান না।
বিশেষ করে—
- গ্রুপ চ্যাট
- অনলাইন কমিউনিটি
- ব্যবসায়িক যোগাযোগ
- ক্রেতা-বিক্রেতা প্ল্যাটফর্ম
- শিক্ষা বা পেশাগত নেটওয়ার্ক
—এসব ক্ষেত্রে নম্বর প্রকাশ না করেও যোগাযোগের সুযোগ অনেকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গোপনীয়তার পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও
প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি ব্যবহারকারীদের জন্য বড় পরিবর্তন হলেও, নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ নতুন উদ্বেগও প্রকাশ করছেন।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণা বৃদ্ধি পাওয়া।
যেহেতু সরাসরি ফোন নম্বর দৃশ্যমান থাকবে না, তাই প্রতারকরা জনপ্রিয় ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা পরিচিত নামের কাছাকাছি ইউজারনেম ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে।
যদিও হোয়াটসঅ্যাপ জানিয়েছে—
- গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম সংরক্ষিত রাখা হতে পারে
- ভুয়া অ্যাকাউন্ট শনাক্তের ব্যবস্থা থাকবে
- ব্লক ও রিপোর্ট সুবিধা আগের মতোই থাকবে
- অতিরিক্ত নিরাপত্তার জন্য ঐচ্ছিক চার সংখ্যার কোড ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে
তবুও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিচয় গোপন করার সঙ্গে জবাবদিহিতার ভারসাম্য বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
প্রতিযোগিতায় নতুন নয়, তবে সবচেয়ে বড় প্রয়োগ হতে পারে
হোয়াটসঅ্যাপ এই ধরনের ব্যবস্থা প্রথম আনছে না।
এর আগে ২০২৪ সালে মেসেজিং অ্যাপ Signal ফোন নম্বরের পরিবর্তে ইউজারনেম ব্যবহারের সুবিধা চালু করেছিল।
তবে Signal-এর তুলনায় হোয়াটসঅ্যাপের অবস্থান অনেক বড়। বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০০ কোটিরও বেশি ব্যবহারকারী থাকায় এই ফিচার প্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে ফোন নম্বরভিত্তিক ডিজিটাল পরিচয়ের ধারণাই বদলে যেতে পারে।
বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের জন্য কী বদলাবে?
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত নম্বর ব্যবহার করে অনাকাঙ্ক্ষিত কল, অপরিচিত বার্তা কিংবা প্রতারণার ঘটনা প্রায়ই দেখা যায়।
নতুন ইউজারনেম ব্যবস্থা চালু হলে—
- অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা সহজ হতে পারে
- কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের ব্যক্তিগত নম্বর গোপন রাখা সহজ হবে
- শিক্ষা ও কমিউনিটি গ্রুপে নিরাপদ যোগাযোগ বাড়তে পারে
- একই সঙ্গে ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণার নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে
ফলে শুধু প্রযুক্তি নয়, ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সচেতনতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সামনে বড় প্রশ্ন
হোয়াটসঅ্যাপের এই পদক্ষেপ শুধু একটি নতুন ফিচার নয়; এটি ব্যক্তিগত পরিচয়ের ধারণাকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—ফোন নম্বর লুকিয়ে রাখা কি সত্যিই ব্যবহারকারীদের আরও নিরাপদ করবে, নাকি এটি অনলাইন প্রতারণার নতুন পথও খুলে দেবে?
এর উত্তর মিলবে ফিচারটি বাস্তবে চালুর পর ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে।
তথ্যসূত্র
WhatsApp, Meta-এর প্রাথমিক তথ্য, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংবাদমাধ্যম এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ।



