১ জুলাই থেকে কার্যকর নতুন বেতন কাঠামো; নিম্ন গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫% পর্যন্ত বৃদ্ধির পরিকল্পনা, তবে প্রজ্ঞাপন ও কারিগরি প্রস্তুতি শেষ না হওয়ায় বাড়তি অর্থ পেতে লাগতে পারে কয়েক মাস
ঢাকা | ২ জুলাই ২০২৬
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডে সর্বোচ্চ ১৩৫ শতাংশ পর্যন্ত এবং ১ থেকে ১০ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে পে-স্কেল কার্যকর হলেও সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি বেতন হাতে পেতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। কারণ, নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং কারিগরি প্রস্তুতির কাজ এখনো শেষ হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ বিষয়ে সচিব কমিটির সুপারিশ শিগগিরই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
দুই ধাপ না তিন ধাপ—কোন পথে বাস্তবায়ন?
অর্থ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের রোডম্যাপ নির্ধারণে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত সচিব কমিটি ইতোমধ্যে চার দফা বৈঠক করেছে।
বেসামরিক প্রশাসন, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক তিনটি পে-কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত মতামত প্রস্তুত করা হচ্ছে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে দুটি বিষয়ে—উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা।
এ কারণে দুই ধাপের বাস্তবায়ন মডেল আলোচনায় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী—
• প্রথম ধাপে পুরো মূল বেতন কার্যকর করা হবে
• দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হবে
তবে বিকল্প হিসেবে তিন ধাপের পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। সেখানে—
• প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ
• দ্বিতীয় বছরে বাকি ৫০ শতাংশ
• তৃতীয় বছরে ভাতা কার্যকর
অর্থ বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় দুই ধাপের প্রস্তাবেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
আইবিএএস সফটওয়্যারেও তৈরি হতে পারে জটিলতা
অর্থ বিভাগের কারিগরি কর্মকর্তারা মনে করছেন, মূল বেতনকে দুই ভাগে ভাগ করে কার্যকর করলে সরকারের সমন্বিত বাজেট ও হিসাব ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (আইবিএএস)-এ জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তাদের মতে, একবারে পুরো মূল বেতন কার্যকর করা তুলনামূলক সহজ হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন ভাতা সমন্বয় করলে বাস্তবায়নও দ্রুত সম্ভব হবে।
পরিবর্তন আসছে বিভিন্ন ভাতায়ও
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলে বিদ্যমান বিভিন্ন ভাতার কাঠামোও পুনর্বিন্যাস করা হবে। কিছু ভাতা কমানো, আবার কিছু একীভূত করার বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে।
ফলে শুধু মূল বেতন বাড়ানো নয়, পুরো সুবিধা কাঠামোতেও পরিবর্তন আসতে পারে।
বেতন বাড়লে কি দুর্নীতি কমবে?
নতুন পে-স্কেল নিয়ে মত দিয়েছেন নীতি বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরাও।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধি সময়োপযোগী ও যৌক্তিক।
তার ভাষায়, “দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বেতন না থাকলে সরকারি কর্মচারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পেশাগত উৎকর্ষ ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রত্যাশা করা কঠিন।”
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শুধু বেতন বাড়ানো দুর্নীতি কমানোর নিশ্চয়তা নয়।
তার মতে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের আয়-সম্পদের তথ্যও প্রতিবছর হালনাগাদ করা প্রয়োজন।
নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য বড় স্বস্তি?
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, নবম পে-স্কেল সময়ের দাবি ছিল।
তিনি বলেন, “উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিশেষ করে নিম্ন গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্ধিত বেতন তাদের জীবনমান কিছুটা উন্নত করতে সহায়তা করবে।”
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি ব্যবস্থায় অনিয়ম ও জবাবদিহির প্রশ্নও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বাজেটে বরাদ্দ ৪৪ হাজার কোটি টাকা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়নের জন্য ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের ঘোষণা দেন।
বিশ্লেষণ: স্বস্তি মিলবে, তবে পুরো চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়
নবম পে-স্কেল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য অবশ্যই বড় স্বস্তির খবর। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারেন। তবে বেতন বৃদ্ধির প্রকৃত সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতি, ভাতা পুনর্বিন্যাস এবং বাস্তবায়নের সময়সূচির ওপর।
কারণ কাগজে পে-স্কেল কার্যকর হওয়া আর বাস্তবে বাড়তি অর্থ হাতে পাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে এখনো কয়েক মাসের দূরত্ব রয়ে গেছে।



