যখন একজন বিপ্লবী ওয়াশিংটনের দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠলেন
১৯৫৯ সালের জানুয়ারি। কিউবার আকাশে নতুন পতাকা উঠেছে। ফুলহেনসিও বাতিস্তার সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় এসেছেন তরুণ বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রো। প্রথমদিকে ওয়াশিংটন তাঁর দিকে সতর্ক দৃষ্টিতে তাকালেও খুব দ্রুত সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়।
ফিদেল কিউবায় মার্কিন কোম্পানির সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করেন। ভূমি সংস্কার করেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ান। শীতল যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ সময়ের আমেরিকার কাছে এটি শুধু একটি আদর্শিক চ্যালেঞ্জ ছিল না; এটি ছিল নিজেদের আঙিনায় সোভিয়েত প্রভাব প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা।
ওয়াশিংটনে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—ফিদেলকে সরাতে হবে।
এরপর শুরু হয় এমন এক ছায়াযুদ্ধ, যা সিনেমাকেও হার মানাতে পারে।
ব্যর্থতার প্রথম অধ্যায়: বে অব পিগস
১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে কিউবান নির্বাসিতদের ব্যবহার করে “বে অব পিগস” অভিযান চালানো হয়। লক্ষ্য ছিল কাস্ত্রো সরকারকে উৎখাত করা।
অভিযানটি ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়।
এর ফলে কাস্ত্রোর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার বদলে আরও শক্তিশালী হয়। তিনি কিউবাকে প্রকাশ্যে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
বে অব পিগস ব্যর্থ হওয়ার পর সিআইএ আরও গোপন ও আক্রমণাত্মক কৌশল নেয়।
অপারেশন মঙ্গুজ: রাষ্ট্রীয় গোপন যুদ্ধ
১৯৬১ সালে শুরু হয় “অপারেশন মঙ্গুজ”।
এর উদ্দেশ্য ছিল—
• কিউবায় অন্তর্ঘাত
• অর্থনীতি অস্থিতিশীল করা
• বিদ্রোহ সৃষ্টি
• এবং শেষ পর্যন্ত ফিদেলকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া
এই অপারেশন ছিল এত বড় যে এতে শত শত কর্মকর্তা, গোয়েন্দা এবং সহযোগী যুক্ত ছিলেন। বছরে কোটি কোটি ডলার ব্যয় হয়েছিল।
হত্যা পরিকল্পনা: বাস্তব আর অবিশ্বাস্যতার সীমারেখা
ফিদেলের বিরুদ্ধে তৈরি হওয়া পরিকল্পনাগুলোর কিছু ছিল ভয়ংকর, কিছু ছিল প্রায় অবিশ্বাস্য।
বিস্ফোরক সিগার
ফিদেল ছিলেন সিগারপ্রেমী।
সিআইএ পরিকল্পনা করেছিল এমন সিগার বানানোর, যার মধ্যে বিস্ফোরক এবং বিষ থাকবে।
পরিকল্পনা ছিল—তিনি আগুন ধরানোর সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হবে।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগেই তা ব্যর্থ হয়।
বিষমাখা সিগার
আরেকটি পরিকল্পনায় সিগারে প্রাণঘাতী বটুলিনাম টক্সিন ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়।
কিন্তু সেটিও কখনো লক্ষ্যবস্তু পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
বিস্ফোরক ঝিনুক
ফিদেল স্কুবা ডাইভিং পছন্দ করতেন।
সিআইএ তাঁর প্রিয় ডাইভিং এলাকায় রঙিন ও আকর্ষণীয় একটি ঝিনুক রেখে সেটিকে বিস্ফোরকে রূপান্তরের পরিকল্পনা করে।
শুনতে চলচ্চিত্রের কাহিনি মনে হলেও পরিকল্পনাটি বাস্তবে আলোচনায় ছিল। তবে কখনো কার্যকর হয়নি।
বিষাক্ত ডাইভিং স্যুট
আরেকটি পরিকল্পনায় ডাইভিং স্যুটে সংক্রামক উপাদান ব্যবহার করে ধীরে ধীরে তাঁকে অসুস্থ করার চিন্তা করা হয়।
কিন্তু ফাঁস হয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
প্রেমিকা হয়ে উঠলেন হত্যাকারী?
ফিদেলের সাবেক প্রেমিকা মারিতা লরেঞ্জকে ব্যবহার করার চেষ্টা হয়েছিল।
তাঁকে বিষাক্ত ক্যাপসুল দেওয়া হয়েছিল, যা ঠান্ডা ক্রিমের বোতলে লুকানো ছিল।
কিন্তু নাটকীয়ভাবে সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরবর্তী বর্ণনায় দাবি করা হয়, ফিদেল তাঁর উদ্দেশ্য বুঝে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে অস্ত্রও দিয়েছিলেন। কিন্তু গুলি চালানোর সাহস হয়নি।
দাড়ি নষ্ট করার ষড়যন্ত্র
ফিদেলের দাড়ি ছিল তাঁর বিপ্লবী পরিচয়ের প্রতীক।
একটি পরিকল্পনায় এমন রাসায়নিক ব্যবহার করার কথা ভাবা হয়, যা তাঁর দাড়ি ঝরিয়ে দেবে এবং জনসম্মুখে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এটি ছিল হত্যা নয়; চরিত্র ধ্বংসের পরিকল্পনা।
তাহলে আসলে কতবার হত্যাচেষ্টা হয়েছিল?
এখানে ইতিহাসে বড় বিতর্ক আছে।
কিউবার সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফাবিয়ান এসকালান্তে দাবি করেছিলেন—মোট ৬৩৪–৬৩৮টি পরিকল্পনা বা চেষ্টা হয়েছিল।
কিন্তু মার্কিন সিনেটের চার্চ কমিটি ১৯৭৫ সালে তদন্ত করে ১৯৬০–৬৫ সময়কালে অন্তত আটটি নিশ্চিত সিআইএ-সমর্থিত পরিকল্পনার প্রমাণ পায়।
অর্থাৎ “৬৩৮টি হত্যাচেষ্টা” সংখ্যাটি জনপ্রিয় হলেও এর মধ্যে অনেকগুলো ছিল পরিকল্পনা, প্রস্তাব বা প্রাথমিক ধারণা; সবগুলো বাস্তব অভিযানে রূপ নেয়নি।
কেন বারবার ব্যর্থ হলো সিআইএ?
ফিদেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল অসাধারণ শক্তিশালী।
কিউবার গোয়েন্দা সংস্থা বহু নির্বাসী নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশ করেছিল। সম্ভাব্য হামলাকারীদের অনেককে নজরদারিতে রাখা হয়েছিল।
এ ছাড়া ফিদেলের নিজের জীবনযাপনও ছিল অনিশ্চিত—তিনি প্রায়ই শেষ মুহূর্তে কর্মসূচি বদলাতেন।
অনেক গবেষকের মতে, অতিরিক্ত জটিল পরিকল্পনাই সিআইএর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত কে জিতেছিল?
ফিদেল কাস্ত্রো ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে স্বাভাবিক কারণে মারা যান।
তিনি গুলিতে, বিষে, বিস্ফোরণে কিংবা গুপ্তচরবৃত্তির ফাঁদে নয়—সময়কে হারিয়ে বেঁচে ছিলেন।
পরিহাস হলো, যাকে থামাতে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা কয়েক দশক ব্যয় করেছিল, তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের বিছানাতেই মৃত্যুবরণ করেন।
ফিদেল একবার বলেছিলেন—
“হত্যাচেষ্টা থেকে বেঁচে থাকা যদি অলিম্পিক খেলা হতো, তাহলে আমি স্বর্ণপদক জিততাম।”
ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, কথাটি পুরোপুরি রসিকতা ছিল না।




