উৎপাদন খরচ বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি, দুর্বল বিপণন ও সীমিত সরবরাহব্যবস্থায় দুই দশকেও লাভের মুখ দেখেনি সরকারি বোতলজাত পানি প্রকল্প৳
কারখানা আছে, পানি শোধনের আধুনিক ব্যবস্থা আছে, বোতল তৈরির সক্ষমতাও রয়েছে। প্রতি মাসে উৎপাদিত হচ্ছে লাখ লাখ লিটার বোতলজাত পানি। কিন্তু রাজধানীর দোকানপাট, হোটেল কিংবা সুপারশপে খুঁজলে খুব কমই দেখা যায় ঢাকা ওয়াসার ‘শান্তি’ পানি। দুই দশক আগে সাধারণ মানুষের জন্য কম দামে নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করা প্রকল্পটি এখন উল্টো ধারাবাহিক লোকসানের ভার বহন করছে।
ওয়াসার নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, আধা লিটারের একটি বোতল উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১১ টাকা, অথচ সেটি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে ৯ টাকায়। অর্থাৎ কারখানা থেকে বের হওয়ার আগেই প্রতিটি বোতলে দুই টাকা করে লোকসান হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, মিরপুর–১০ নম্বরে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই প্ল্যান্ট প্রায় দুই দশকে ১৫ কোটি টাকার কাছাকাছি লোকসান গুনেছে। বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাদ দিয়েই বছরে দুই থেকে তিন কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে।
উৎপাদনের আগেই কেন ক্ষতি?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কোনো পণ্যের উৎপাদন ব্যয় যদি বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়বে। শান্তি পানির ক্ষেত্রেও মূল সংকট শুরু হচ্ছে সেখানেই।
ওয়াসার লক্ষ্য ছিল বেসরকারি কোম্পানিগুলো যাতে ইচ্ছেমতো বোতলজাত পানির দাম বাড়াতে না পারে এবং সাধারণ মানুষ কম দামে নিরাপদ পানি পায়। কিন্তু বাস্তবে সেই সামাজিক লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে ব্যবসায়িক বাস্তবতা উপেক্ষিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
একজন সাবেক করপোরেট বিপণন কর্মকর্তা বলেন,
“সামাজিক উদ্দেশ্যে কম দামে পণ্য বিক্রি করা যেতে পারে, কিন্তু তখন সরকারকে ভর্তুকি কাঠামোও তৈরি করতে হয়। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন খরচের নিচে বিক্রি করা কোনো প্রকল্প টেকসই হতে পারে না।”
সক্ষমতা আছে, ব্যবহার হচ্ছে না
ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যান্টটির প্রতি ঘণ্টায় ৬ হাজার লিটার বোতলজাত করার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে মাসে উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় আট লাখ লিটার।
হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান উৎপাদন করতে প্ল্যান্টকে মাসে মাত্র ১৩৩ ঘণ্টা, অর্থাৎ দিনে গড়ে সাড়ে চার ঘণ্টারও কম চালাতে হচ্ছে।
অর্থনীতিতে একে বলা হয় Underutilized Capacity বা সক্ষমতার অপূর্ণ ব্যবহার।
কারণ, একটি কারখানার স্থায়ী খরচ—যেমন যন্ত্রপাতি, বিদ্যুৎ, ভবন, জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ—উৎপাদন কম হলেও বহন করতে হয়। ফলে উৎপাদন যত কম হবে, প্রতি বোতলে খরচ তত বেড়ে যাবে।

বেসরকারি কোম্পানি লাভ করছে কীভাবে?
প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কম দামে পানি বিক্রি করেও লাভ করছে, সেখানে ওয়াসার খরচ বেশি হচ্ছে কেন?
বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে।
প্রথমত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক বড় পরিসরে উৎপাদন করে। উৎপাদন বাড়লে প্রতি ইউনিটে ব্যয় কমে আসে।
দ্বিতীয়ত, তাদের রয়েছে শক্তিশালী পরিবেশক নেটওয়ার্ক। প্রতিদিন নির্ধারিত রুটে দোকানে দোকানে পণ্য পৌঁছে দেওয়া হয়। দোকানে মজুত শেষ হলে দ্রুত নতুন সরবরাহ দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, দোকানিদের জন্য লাভের অংশও বেশি রাখা হয়।
তথ্য অনুযায়ী, একটি বেসরকারি কোম্পানির আধা লিটারের বোতল বিক্রি করে দোকানি ৯ টাকা পর্যন্ত লাভ করতে পারেন। বিপরীতে শান্তি পানি বিক্রি করে লাভ হয় প্রায় ৪ টাকা।
ফলে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই বেসরকারি ব্র্যান্ড বিক্রিতে বেশি আগ্রহী হন।
মিরপুরের এক মুদিদোকানি বলেন,
“একই জায়গায় দুইটা বোতল রাখব। একটা বিক্রি করে ৯ টাকা লাভ, আরেকটা বিক্রি করে ৪ টাকা লাভ—তাহলে দোকানি কোনটা রাখবে?”
উৎপাদন আছে, দোকানে নেই
শান্তি পানির সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে বাজারজাতকরণ দুর্বলতা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন, দোকানের সাইনবোর্ড, ফ্রিজ, প্রচারসামগ্রী ও নিয়মিত সরবরাহের মাধ্যমে বাজার ধরে রেখেছে। কিন্তু শান্তি পানি এখনো সেই পর্যায়ের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারেনি।
ফলে উৎপাদন থাকলেও সাধারণ ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছাচ্ছে না।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা—মোহাম্মদপুর, গুলশান, বনানী, শাহবাগ, মালিবাগ ও যাত্রাবাড়ীর দোকান ঘুরেও শান্তি পানি খুব কম পাওয়া গেছে।
পুরোনো যন্ত্রও বাড়াচ্ছে ব্যয়
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্ল্যান্টের কিছু যন্ত্রপাতি প্রায় ২০ বছর পুরোনো।
পুরোনো যন্ত্র ব্যবহারে সাধারণত—
- বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়ে
- রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাড়ে
- উৎপাদন দক্ষতা কমে যায়
- উৎপাদন বন্ধ থাকার ঝুঁকি বাড়ে
ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়।
শুধু উৎপাদন বাড়ালেই কি লোকসান কমবে?
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনার কথা বলেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, একটি বোতলেই যদি দুই টাকা লোকসান হয়, তাহলে বেশি উৎপাদনের অর্থ হতে পারে বেশি পরিমাণে লোকসানও।
তাদের মতে, একই সঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন—
✓ প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়ের নিরীক্ষা
✓ বিক্রয়মূল্যের যৌক্তিক পুনর্নির্ধারণ
✓ দোকানিদের কমিশন বৃদ্ধি
✓ শক্তিশালী পরিবেশক নেটওয়ার্ক তৈরি
✓ আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন
✓ পৃথক বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা ইউনিট গঠন
বিশ্লেষণ: সমস্যা কি পানিতে, নাকি ব্যবস্থাপনায়?
বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি পানির মূল সংকট উৎপাদনে নয়, বরং পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায়।
নগর–পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের ভাষায়,
“জনগণের টাকায় গড়া একটি প্ল্যান্ট যদি উৎপাদন করেও মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারে এবং বছরের পর বছর লোকসান দেয়, তাহলে সেটি স্পষ্টতই ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।”
দুই দশকের অভিজ্ঞতা বলছে, শুধু নিরাপদ পানি উৎপাদন করলেই হয় না; সেটি মানুষের হাতে পৌঁছানোর জন্য কার্যকর বাজারব্যবস্থা, পেশাদার বিপণন এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন।
নচেৎ “শান্তি” নামের এই প্রকল্পটি মানুষের কাছে স্বস্তি নয়, বরং ওয়াসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বোঝা হিসেবেই থেকে যাবে।



