জামালউদ্দীন-সুলতান গ্রুপের প্রকাশ্য বিরোধ এবং জেনারেল মঞ্জুরের প্রোটোকল ভাঙার নেপথ্য জট; উপেক্ষিত গোয়েন্দা বার্তার তত্ত্ব
Today TV BD-এর ৮ পর্বের বিশেষ অনুসন্ধানধর্মী ধারাবাহিক “রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাকাণ্ড”।
৩১ মে ২০২৬ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: পর্ব–২
১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আকস্মিক চট্টগ্রাম সফর এবং ৩০ মে তাঁর নির্মম হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়। আপাতদৃষ্টিতে এই সফরের একমাত্র দৃশ্যমান উদ্দেশ্য ছিল চট্টগ্রাম জেলা বিএনপির অভ্যন্তরীণ তীব্র কোন্দল নিরসন করা। তবে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর সমসাময়িক দলিল, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের স্মৃতিকথা এবং সামরিক বিশ্লেষকদের পর্যালোচনার আলোয় একটি গভীর প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে—জিয়া কি কেবল দলীয় কোন্দল মেটাতেই চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন, নাকি তাঁর এই সফরের নেপথ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও কোনো গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছিল?
চট্টগ্রাম: বিএনপির শক্ত ঘাঁটি, কিন্তু বিভক্ত নেতৃত্ব
আশির দশকের শুরুতে চট্টগ্রাম ছিল সদ্য গঠিত বিএনপির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘাঁটি। তবে সাংগঠনিক বিস্তৃতির পাশাপাশি সেখানে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল অভ্যন্তরীণ বিভাজন।
তৎকালীন স্থানীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুটি শক্তিশালী ধারা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। একদিকে ছিলেন তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি প্রভাবশালী বলয়। অন্যদিকে ছিলেন ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরীর অনুসারীরা। দুই পক্ষের এই দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে সাংগঠনিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রকাশ্য রূপ নিতে শুরু করে, যা বন্দরনগরীর সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছিল।
জিয়ার উদ্বেগ ও আকস্মিক সফরের সিদ্ধান্ত
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল কড়া সাংগঠনিক শৃঙ্খলা। বিএনপি তখনও একটি তুলনামূলক নতুন দল হওয়ায় চট্টগ্রামের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এমন প্রকাশ্য কোন্দল তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছিল।
তৎকালীন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর স্মৃতিকথা অনুযায়ী, এই সফরটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল না; বরং অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে দ্রুত এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। গবেষকদের মতে, সফরের এই চরম আকস্মিকতার কারণে স্থানীয় প্রশাসন বা কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পক্ষে রাষ্ট্রপতির জন্য প্রয়োজনীয় নিশ্ছিদ্র ত্রিস্তরী নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রোটোকল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, যা পরবর্তীতে খুনিদের জন্য পথ সুগম করেছিল।
সতর্ক সংকেত কি উপেক্ষা করা হয়েছিল?
জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম পৌঁছানোর মুহূর্ত থেকেই কিছু অস্বাভাবিক লক্ষণ প্রকাশ পেতে শুরু করেছিল, যা আজও ঐতিহাসিকদের ভাবিয়ে তোলে।
- জিওসির অনুপস্থিতি: ২৯ মে সকালে বিমানবন্দরে রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানাতে চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর উপস্থিত ছিলেন না। একজন রাষ্ট্রপতির সফরে স্থানীয় এরিয়া কমান্ডারের এই অনুপস্থিতি ছিল সামরিক প্রোটোকলের এক নজিরবিহীন লঙ্ঘন।
- সামরিক অসন্তোষ: তৎকালীন কিছু গোয়েন্দা সূত্র এবং পরবর্তী সামরিক বিশ্লেষণে জানা যায়, সেনাবাহিনীর একটি অংশের ভেতরে বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্যে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রামের জিওসি পদ থেকে ঢাকার স্টাফ কলেজে একটি নন-কমান্ড ডেস্কে বদলির আদেশ জারি করা হয়েছিল, যা নিয়ে গ্যারিসনে উত্তেজনা ছিল।
প্রশ্ন ওঠে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন ডিজিএফআই বা এনএসআই) কি এই সামরিক উত্তেজনার কোনো আগাম আভাস রাষ্ট্রপতিকে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল, নাকি জিয়া নিজে তাঁর অদম্য সাহসের কারণে সেই সতর্ক সংকেতগুলোকে গুরুত্ব দেননি?
শেষ বৈঠকের অন্তরালের গল্প
২৯ মে চট্টগ্রাম পৌঁছানোর পর সারাদিন বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজ শেষে রাতের দিকে সার্কিট হাউসে শুরু হয় স্থানীয় বিএনপির বিবদমান দুই পক্ষের সাথে রাষ্ট্রপতির সেই বহুল আলোচিত শেষ বৈঠক।
“বৈঠকটি রাত গভীর হওয়া পর্যন্ত চলেছিল। সেখানে স্থানীয় নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি করছিলেন। জিয়া দুই পক্ষের বক্তব্য শোনেন এবং অত্যন্ত কড়া ভাষায় তাদের সতর্ক করে একটি আপস-মীমাংসার সমাধান দেন।”
— তৎকালীন বৈঠকে উপস্থিত একজন নেতার পরবর্তী বিবরণ
উপস্থিত ব্যক্তিদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, বৈঠক শেষে জিয়াকে অত্যন্ত আশাবাদী ও আত্মবিশ্বাসী মনে হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করতেন তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সামনে এই কোন্দল দ্রুতই মিটে যাবে। কিন্তু এই বৈঠকের পর তিনি যখন দোতলার ৪ নম্বর কক্ষে বিশ্রামে যান, তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ঘটে সেই ইতিহাসের নির্মমতম সামরিক অভ্যুত্থান।
দলীয় কোন্দল নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক হিসাব?
বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিয়ার এই সফরের পেছনে কেবল দলীয় কোন্দল মেটানোর সরল অঙ্ক ছিল না, বরং এর পেছনে ছিল একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক মনোপলি। সেনাপ্রধানের পদ ছেড়ে পুরোদস্তুর রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠার পর সামরিক বাহিনীর একাংশের ওপর, বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শিথিল হচ্ছিল।
চট্টগ্রাম গ্যারিসন ছিল তৎকালীন সবচেয়ে সংবেদনশীল সামরিক অঞ্চল এবং জেনারেল মঞ্জুর ছিলেন অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তা। অনেক ইতিহাসবিদের মতে, জিয়া চট্টগ্রামের রাজনৈতিক কোন্দল মেটানোর ছদ্মাবরণে আসলে ব্যক্তিগতভাবে সেখানে গিয়ে জেনারেল মঞ্জুরের মনোভাব এবং ওই অঞ্চলের সামরিক নেতৃত্বের আনুগত্য সরাসরি পরখ করতে চেয়েছিলেন।
📦 সফরের নেপথ্য জট:
- প্রধান বিরোধ: উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দীন আহমেদ বনাম ডেপুটি স্পিকার সুলতান আহমেদ চৌধুরী।
- সফরের প্রকৃতি: রুটিন রাষ্ট্রীয় সফর নয়, সম্পূর্ণ আকস্মিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
- প্রধান প্রোটোকল ভঙ্গ: বিমানবন্দরে জিওসি জেনারেল এম এ মঞ্জুরের অনুপস্থিতি।
- সামরিক পটভূমি: জেনারেল মঞ্জুরকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার স্টাফ কলেজে বদলির সরকারি আদেশ কার্যকর হওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল।
✅ যা জানা গেছে
- জিয়াউর রহমানের চট্টগ্রাম সফরের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল জামালউদ্দীন ও সুলতান গ্রুপের মধ্যকার তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ মেটানো।
- সফরটি অত্যন্ত স্বল্প সময়ের নোটিশে হওয়ায় রাষ্ট্রপতির নিয়মিত কঠোর নিরাপত্তা প্রোটোকল যথাযথভাবে অনুসৃত হয়নি।
- বিমানবন্দরে জিওসি জেনারেল মঞ্জুরের অনুপস্থিতি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মাঝে তীব্র খটকা তৈরি করেছিল।
❓ যা জানা যায়নি
- গ্যারিসনের ভেতরে যে অভ্যুত্থানের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হচ্ছিল, সে বিষয়ে ঢাকার গোয়েন্দা সদর দপ্তরের কাছে নির্দিষ্ট কোনো ইনফরমেশন বা ‘থ্রেট ইন্টেলিজেন্স’ ছিল কি না।
- জিয়া কি কেবলই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন, নাকি তিনি জেনারেল মঞ্জুরের সম্ভাব্য সামরিক অবাধ্যতার আভাস পেয়ে নিজেই পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রামে হাজির হয়েছিলেন।
📌 তথ্যসূত্র:
- প্রশাসনিক বিবরণ: জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর ‘দুই জেনারেলের হত্যাকাণ্ড: ১৯৮১-র ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান’ (প্রথমা প্রকাশন)।
- ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক দলিল: অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’।
- মিডিয়া ও সাক্ষাৎকার আর্কাইভ: তৎকালীন জাতীয় সংবাদপত্রের বিশেষ সংখ্যা ও বিবিসি বাংলা-এর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
পরবর্তী পর্ব:
“জেনারেল মঞ্জুর: বিদ্রোহের মাস্টারমাইন্ড নাকি ইতিহাসের বলির পাঁঠা?”



