Homeনাগরিক দর্পণজিয়া হত্যার ৪৫ বছর: সেই রক্তাক্ত ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কী ঘটেছিল?

জিয়া হত্যার ৪৫ বছর: সেই রক্তাক্ত ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে কী ঘটেছিল?

১৯৮১ সালের ৩০ মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও বহু প্রশ্ন আজও উত্তরহীন। প্রকাশিত নথি, গবেষণা, সাক্ষাৎকার ও ঐতিহাসিক সূত্রের ভিত্তিতে Today TV BD-এর ৮ পর্বের এই বিশেষ ধারাবাহিকে সেই রক্তাক্ত ঘটনার পরিচিত ও অপ্রকাশিত দিকগুলো তুলে ধরা হবে।

৩০ মে ২০২৬ | অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: পর্ব–১

১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে কয়েক মিনিটের গোলাগুলিতে নিহত হন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান; নিরাপত্তা ব্যর্থতা এবং হামলার প্রকৃত চিত্র নিয়ে আজও কাটেনি কুয়াশা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে একটি বিভাজনরেখার মতো। ওই দিনের আগে ছিল এক বাস্তবতা, আর পরে আরেকটি। ভোরের অন্ধকার তখনও কাটেনি। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের চারপাশে ছিল স্বাভাবিক নীরবতা। ভেতরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্রামে ছিলেন। আগের দিন গভীর রাত পর্যন্ত তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন।
কিন্তু ভোর চারটার কিছু আগে সেই নীরবতা ভেঙে যায়। সশস্ত্র সেনাসদস্যদের একটি দল সার্কিট হাউসে প্রবেশ করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে শুরু হয় প্রবল গুলিবর্ষণ। মাত্র কয়েক মিনিট, আর তার পরই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধানের জীবনপ্রদীপ নিভে যায়। আজ, দীর্ঘ ৪৫ বছর পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে—সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ঘটনা?

রাষ্ট্রপতির এই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন ব্যক্তির মৃত্যু ছিল না; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ভারসাম্যে এক দীর্ঘমেয়াদি ও আমূল পরিবর্তন আসে। ঘটনার এক বছরেরও কম সময় পরে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। ফলে ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া একটি অবিকল্প সন্ধিক্ষণ।

চট্টগ্রামে শেষ দিন ও রাজনৈতিক সংকট

১৯৮১ সালের ২৯ মে সকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামে পৌঁছান। বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শী বিবরণ, স্মৃতিকথা এবং তৎকালীন প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী, তাঁর এই সফরের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয় বিএনপির তীব্র অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসন করা।
সারাদিন ধরে তিনি দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেন। সন্ধ্যার পরও আলোচনা চলতে থাকে এবং রাত গভীর হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি সার্কিট হাউসের রুমে বিশ্রামে যান। সেই রাতই ছিল তাঁর জীবনের শেষ রাত।

ভোর ৪টা: হামলার শুরু ও সময়কাল

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, ৩০ মে ভোররাত চারটার দিকে সেনাবাহিনীর কয়েকটি যানবাহন আকস্মিকভাবে সার্কিট হাউস এলাকায় প্রবেশ করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরো এলাকা ভারী অস্ত্রের গোলাগুলির শব্দে কেঁপে ওঠে।
তৎকালীন সহকারী প্রটোকল কর্মকর্তা মোশতাক আহমেদের বর্ণনায় জানা যায়, গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর তিনি প্রাণভয়ে ডাইনিং রুমের একটি টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন।

“আমি ভারী সামরিক বুটের শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। এর কিছুক্ষণ পর ওপরতলা থেকে আরও প্রচণ্ড গুলির শব্দ আসে। চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছিল।”
মোশতাক আহমেদ, তৎকালীন সহকারী প্রটোকল কর্মকর্তা

তবে এখানেই শুরু হয় প্রথম বিতর্ক। বিভিন্ন সূত্রে এই হামলার স্থায়িত্ব বা সময়কাল নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। কিছু বিবরণে বলা হয়েছে পুরো সামরিক অভিযানটি মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়েছিল, আবার অন্য কিছু বর্ণনায় সময়কাল কিছুটা বেশি উল্লেখ করা হয়েছে। তবে প্রায় সব সূত্রই একটি বিষয়ে একমত যে—হামলাটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত, লক্ষ্যভিত্তিক এবং সুপরিকল্পিত।

নিরাপত্তা বলয়ের রহস্যময় ব্যর্থতা

এই ঘটনার সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি লুকিয়ে আছে এর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে। দেশের একজন রাষ্ট্রপতি যেখানে অবস্থান করছেন, সেখানকার নিরাপত্তা বলয় বহুস্তরবিশিষ্ট ও অত্যন্ত কঠোর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে পৌঁছানো প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বিবরণী থেকে জানা যায়, সার্কিট হাউসের প্রধান ফটক তখন কার্যত অরক্ষিত ছিল।

  • কেন রাষ্ট্রপতির ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ল?
  • ওই রাতে থ্রি-স্টার সিকিউরিটি প্রোটোকল ডিউটিতে থাকা সদস্যরা তখন কোথায় ছিলেন?
  • তারা কি হামলাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মোটেও পারেননি, নাকি অন্য কোনো অলিখিত নির্দেশ কার্যকর ছিল?
    এই অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক উত্তর দীর্ঘ সাড়ে চার দশকেও জনসমক্ষে আসেনি।

নিহতদের তালিকা ও মরদেহ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা

সার্কিট হাউসে হামলার সময় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছাড়াও আরও কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা নিহত হন। তাদের মধ্যে রাষ্ট্রপতির এডিসি কর্নেল এহসানক্যাপ্টেন হাফিজের নাম বিভিন্ন সমসাময়িক নথি ও গবেষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট সময় ও ভেতরের ঘটনার ক্রমবিন্যাস নিয়ে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় কিছুটা পার্থক্য রয়ে গেছে।
হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিবরণ অনুযায়ী, প্রথমে রাঙ্গুনিয়া এলাকার একটি দুর্গম পাহাড়ি স্থানে মরদেহ অত্যন্ত গোপনে দাফন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ ও প্রশাসন মরদেহ উদ্ধার করে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। কেন এত তড়িঘড়ি করে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মরদেহ গুম বা দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা ইতিহাস আজ পর্যন্ত পায়নি।

ঢাকায় ক্ষমতার পালাবদল

চট্টগ্রামে যখন এই রক্তাক্ত পরিস্থিতি ও চরম অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তখন রাজধানী ঢাকায় শুরু হয়ে যায় তীব্র রাজনৈতিক ও সামরিক তৎপরতা। রাষ্ট্রপতির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তার দ্রুত দেশের সাংবিধানিক দায়িত্ব (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে) গ্রহণ করেন। দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয় এবং একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে শুরু হয় বিদ্রোহ দমনের এক কঠোর অভিযান।

📦 Quick Facts: সার্কিট হাউসের সেই ভোর

  • হামলার সময়: ৩০ মে ১৯৮১, ভোর আনুমানিক ৩:৪৫ থেকে ৪:১৫ মিনিট।
  • মূল অকুস্থল: চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের দোতলা।
  • নিহত ভিআইপি: রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, কর্নেল এহসান (এডিসি), এবং ক্যাপ্টেন হাফিজ।
  • নিরাপত্তা ঘাটতি: হামলার সময় সার্কিট হাউসের প্রধান তোরণে কোনো কার্যকর সামরিক বা পুলিশি প্রতিরোধ ছিল না।
  • মরদেহ উদ্ধার: রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকা থেকে ২ জুন জিয়ার মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার করা হয়।

যা জানা গেছে

  • ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোর চারটার দিকে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হামলা চালিয়ে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়।
  • এই হামলায় রাষ্ট্রপতির সাথে কর্নেল এহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজও ঘটনাস্থলে নিহত হন।
  • ঘটনার পর রাষ্ট্রপতির মরদেহ রাঙ্গুনিয়ার পাহাড়ি এলাকায় গোপনে দাফন করা হয়েছিল, যা পরে পুলিশ উদ্ধার করে।

যা জানা যায়নি

  • রাষ্ট্রপতির সফরের রাতে সার্কিট হাউসের বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বলয় কেন এবং কার নির্দেশে নিষ্ক্রিয় ছিল।
  • হামলার পেছনে কেবল চট্টগ্রামের কিছু অফিসারদের ক্ষোভ ছিল, নাকি এর নেপথ্যে ঢাকা বা আন্তর্জাতিক কোনো মহলের প্রচ্ছন্ন সবুজ সংকেত ছিল।
  • হামলার আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (Directorate General of Forces Intelligence) কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট থ্রেট অ্যালার্ট বা সতর্কতা ছিল কি না।

পরবর্তী পর্ব:

“কেন চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন জিয়া? বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শেষ বৈঠক এবং রাজনৈতিক সংকট”

📌 তথ্যসূত্র:

  • Government Data & Archives: তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল প্রেস নোট (১৯৮১)।
  • Verified Local Media & Research: তৎকালীন জেলা প্রশাসক জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর স্মৃতিকথা এবং অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর ‘বাংলাদেশ: আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’।
  • মিডিয়া আর্কাইভ: তৎকালীন সংবাদপত্র ও বিবিসি বাংলা আর্কাইভ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular