গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ১৩ শিশুর প্রাণহানি; আক্রান্তদের বেশিরভাগই ৫ বছরের কম বয়সী; ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী অস্থিতিশীলতায় টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতিই মূল কারণ বলছে ইউনিসেফ
ঢাকা | ২৬ মে ২০২৬
বাংলাদেশে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ রূপ নিয়েছে সংক্রামক ব্যাধি হামের (Measles) প্রাদুর্ভাব। গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক এইsurge বা প্রকোপে দেশে এ পর্যন্ত ৫১২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত শনিবার (২৩ মে) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সবশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানেই আরও ১৩টি শিশু এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। গত ১৫ মার্চ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মৃত্যুর হিসাব রাখা শুরু করে অধিদপ্তর।
রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলো হামে আক্রান্ত আশঙ্কাজনক শিশুদের ভিড়ে সম্পূর্ণ উপচে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মহাখালীস্থ ডেডিকেটেড হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে বিশেষায়িত ওয়ার্ড খোলা হলেও, তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (ICU) বেডের।
🕒 হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাদান কর্মসূচির বর্তমান চিত্র (Quick Status Panel)
- মোট মৃত্যুর সংখ্যা: ৫১২ জন (১৫ মার্চ ২০২৬ থেকে ২৩ মে ২০২৬ পর্যন্ত)।
- সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়সসীমা: ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী অপুষ্টির শিকার ও টিকাহীন শিশুরা।
- টিকা অভিযানের লক্ষ্য: পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইউনিসেফের সহায়তায় দেশজুড়ে ১ কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) শিশুকে জরুরি ভিত্তিতে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
- মূল সংকট: তীব্র শ্বাসকষ্ট (Respiratory Distress), চোখ, গলা ও ফুসফুসে মারাত্মক সেকেন্ডারি ইনফেকশন নিয়ে হাসপাতালে আসছে শিশুরা।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রশাসনিক শূন্যতা ও ভ্যাকসিনের ঘাটতি
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল (UNICEF)-এর বাংলাদেশ প্রধান রানা ফ্লাওয়ার্স চলতি সপ্তাহে জানান, মহামারী রুখতে ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে ভ্যাকসিনেট করা হলেও এর পূর্ণ সুফল পেতে আরও কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে।
ইউনিসেফের গত বুধবারের প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে:
“২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে যে দীর্ঘস্থায়ী প্রশাসনিক অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছিল, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI)। মাঠপর্যায়ে দীর্ঘ গ্যাপ বা টিকাদানের ঘাটতি তৈরি হওয়ার কারণে দেশের একটি বিশাল অংশের শিশু পুরোপুরি অরক্ষিত থেকে যায়, যা এই ২০২৬ সালে এসে মহামারীর রূপ নিয়েছে।”
এদিকে গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (GARP) সতর্ক করেছে যে, টিকাদানের এই ঘাটতি বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যাওয়া) পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
📊 সাধারণ হাম বনাম বর্তমান প্রাদুর্ভাবের চিকিৎসাগত পার্থক্য
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আইনুল ইসলাম খান আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি (AFP)-কে মাঠপর্যায়ের জটিলতা সম্পর্কে জানান:
| লক্ষণ ও সূচক | 🟢 সাধারণ বা মৃদু হামের লক্ষণ | 🔴 বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জটিলতা (ক্রিটিক্যাল কেস) |
| শারীরিক অবস্থা | পুষ্টি সদ্ব্যবহারকারী ও টিকাপ্রাপ্ত সুস্থ শিশু ন্যূনতম ওষুধেই সুস্থ হয়ে ওঠে। | বেশিরভাগ শিশুই প্রচণ্ড অপুষ্টির শিকার এবং পূর্বে কোনো টিকা পায়নি। |
| সেকেন্ডারি ইনফেকশন | হালকা জ্বর, সর্দি ও শরীরে ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। | তীব্র নিউমোনিয়া, ফুসফুসে ইনফেকশন, মারাত্মক শ্বাসকষ্ট ও কর্নিয়ার ক্ষতি। |
| চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা | ঘরে রেখে আইসোলেশন ও সাধারণ প্যারাসিটামল/তরল খাবার। | আইসিইউ (ICU) বেড ও হাই-ফ্লো অক্সিজেন সাপোর্ট বাধ্যতামূলক হচ্ছে। |
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি বনাম বর্তমান বাস্তবতা
যদিও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দাবি করেছে যে কয়েকটি পূর্বে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে শুরু করায় পরিস্থিতি এখন তাদের ‘নিয়ন্ত্রণে’ রয়েছে, কিন্তু প্রতিদিনের মৃত্যুর গ্রাফ এবং হাসপাতালগুলোর আইসিইউ-র হাহাকার সেই দাবির সাথে মিলছে না। চিকিৎসকদের মতে, অভিভাবকেরা অনেক দেরিতে—অর্থাৎ শিশুর অবস্থা একদম সংকটাপন্ন হওয়ার পর হাসপাতালে নিয়ে আসছেন, যার ফলে মৃত্যুর হার কমানো যাচ্ছে না। ইউনিসেফ জরুরি ভিত্তিতে এই মহামারী মোকাবিলায় স্বাস্থ্যখাতে বড় অঙ্কের তহবিল বৃদ্ধি এবং ডেটা নজরদারি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর জোর দিয়েছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) বাংলাদেশ হেলথ বুলেটিন
- আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা এএফপি (AFP) এবং আনাদোলু এজেন্সি (Anadolu Agency) অন-সাইট রিপোর্ট
- জাতিসংঘের শিশু তহবিল (UNICEF) বাংলাদেশ মিশন পলিসি ব্রিফ (২৩ মে ২০২৬)
- গ্লোবাল অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স পার্টনারশিপ (GARP) থার্সডে পলিসি পেপার



