লন্ডন প্রবাসী বাবার পাতা গোপন ক্যামেরায় ফাঁস হলো মায়ের ভয়ঙ্কর রূপ; আদালত পাঠালেন কারাগারে, আড়াই বছরের তাইয়্যেবা এখন দাদাদের জিম্মায়
স্টাফ রিপোর্টার | ১৮ মে ২০২৬
রাজধানীতে জন্মদাত্রী মায়ের হাতে আড়াই বছরের এক শিশুকন্যাকে হাত-পা বেঁধে অমানবিক নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আদালতপাড়ায় তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘সন্তানকে মোটাতাজা করার’ অদ্ভুত যুক্তি দেখিয়ে দিনের পর দিন নিজের শিশু কন্যা মেহেরিমা খান তাইয়্যেবার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠেছে মা সোমিয়া আক্তারের বিরুদ্ধে।
লন্ডন প্রবাসী বাবার সন্দেহ, গোপনে ঘরে স্থাপন করা ক্যামেরা, আদালতে উপস্থাপিত নৃশংস ভিডিও ফুটেজ এবং বিচারকের তীব্র ক্ষোভ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
লন্ডন প্রবাসী বাবার সন্দেহ থেকেই ফাঁস ভয়ঙ্কর সত্য
মামলা সূত্রে জানা যায়, শিশুটির বাবা দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনে বসবাস করছেন। প্রবাসে থাকলেও তিনি নিয়মিত মেয়ের খোঁজখবর নিতেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে ভিডিও কলে মেয়ের শরীরে আঘাতের চিহ্ন এবং অস্বাভাবিক আচরণ দেখে তাঁর মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
এছাড়া স্ত্রী সোমিয়া আক্তার প্রায় সময়ই ফোন ধরতেন না বা বিভিন্ন অজুহাতে শিশুকে সামনে আনতেন না। এরপর কৌশলে বাসার দেয়ালে একটি বিশেষ ডিজিটাল ঘড়ি স্থাপন করেন তিনি। সেই ঘড়ির ভেতরেই লুকানো ছিল একটি হিডেন ক্যামেরা।
কয়েক মাসের ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করতেই বেরিয়ে আসে ভয়াবহ সব দৃশ্য।
ভিডিওতে দেখা যায়, আড়াই বছরের শিশু তাইয়্যেবার হাত-পা কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এরপর তাকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা, চড়-থাপ্পড়, ধাক্কা এবং শারীরিক নির্যাতন চালাতে দেখা যায় অভিযুক্ত মা সোমিয়া আক্তারকে। আতঙ্কে ও ব্যথায় শিশুটি চিৎকার করে কাঁদলেও নির্যাতন থামেনি।
আদালতে উপস্থাপন করা হয় ভয়ঙ্কর ভিডিও ফুটেজ
শিশুটির দাদা ওই ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। পরে পুলিশ সোমিয়া আক্তারকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করে।
শুনানির সময় আদালতে ভিডিও ফুটেজ চালানো হলে পুরো এজলাসে নেমে আসে ভারী নীরবতা। উপস্থিত অনেকেই বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ডিবিসি নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে দাবি করেন—
“বাচ্চার ওজন কম ছিল। তাকে খাওয়ানোর জন্য মা সামান্য শাসন করেছেন।”
তবে ভিডিও ফুটেজ দেখার পর বিচারক ওই যুক্তি সরাসরি নাকচ করে দেন।
“বাচ্চা কি জংলি পশু?” — বিচারকের তীব্র ক্ষোভ
ভিডিও দেখার পর বিচারক ক্ষোভ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন—
“এভাবে কোনো শিশু সন্তানকে বেঁধে রাখা যায় না। বাচ্চা কি জংলি পশু?”
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত নারীর আচরণ কোনো সুস্থ মানুষের মতো নয় এবং তাঁর মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।
বিচারকের পর্যবেক্ষণ ছিল, শিশুটির নিরাপত্তার স্বার্থে মায়ের কাছে তাকে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ।
আদালত কক্ষে আবেগঘন দৃশ্য
শুনানি শেষে আদালতে ঘটে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
বিচারকের নির্দেশে যখন শিশু তাইয়্যেবাকে দাদীর কোলে দেওয়ার কথা বলা হয়, তখন শিশুটি কোনো দ্বিধা ছাড়াই মায়ের কোল ছেড়ে দাদীর দিকে ছুটে যায় এবং শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
আদালত কক্ষে উপস্থিত অনেকেই তখন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। শিশুটির আচরণ থেকেই বোঝা যায়, মায়ের প্রতি তার ভয় কতটা গভীরভাবে গেঁড়ে বসেছিল।
কারাগারে নেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন মা
প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় অভিযুক্ত সোমিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
“আমি ছাড়া আমার বাচ্চা বাঁচবে না… আমাকে মাফ করে দেন…”
তবে আদালত শিশুর সার্বিক নিরাপত্তা বিবেচনায় তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
শিশু এখন দাদাদের জিম্মায়
আদালত আদেশ দিয়েছেন, আপাতত শিশু মেহেরিমা খান তাইয়্যেবাকে তার দাদা-দাদীর জিম্মায় রাখা হবে।
আগামী বুধবার (২০ মে ২০২৬) মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। সেদিন শিশুটিকে আদালতে হাজির করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা মূল্যায়ন করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
📌 ঘটনার মূল তথ্য এক নজরে
- অভিযুক্ত: সোমিয়া আক্তার
- ভুক্তভোগী: মেহেরিমা খান তাইয়্যেবা (২.৫ বছর)
- অভিযোগ: হাত-পা বেঁধে নির্যাতন
- ঘটনা ফাঁস হয়: লন্ডন প্রবাসী বাবার গোপন ক্যামেরার ফুটেজে
- আদালতের সিদ্ধান্ত: জামিন নামঞ্জুর, কারাগারে প্রেরণ
- বর্তমান অবস্থা: শিশু দাদা-দাদীর জিম্মায়
- পরবর্তী শুনানি: ২০ মে ২০২৬



