বিশেষ ইনভেস্টিগেটিভ ডেস্ক | টুডে টিভি বিডি
২৯ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা/চট্টগ্রাম: বাংলাদেশের জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে গত এক দশকে হাজার হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের এক রোমহর্ষক চিত্র বেরিয়ে এসেছে। তদন্তে দেখা গেছে, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান এবং এনায়েতুল্লাহ খানের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘ত্রয়ী সিন্ডিকেট’ ইস্টার্ন রিফাইনারির দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল।
১. এসপিএম প্রকল্প: ৩০০ মিলিয়নের স্বপ্ন যেভাবে ৭০০ মিলিয়নের ‘শ্বেতহস্তী’ হলো
চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে গভীর সমুদ্র (Offshore) থেকে সরাসরি অপরিশোধিত তেল খালাসের জন্য গৃহীত ‘সিঙ্গেল পয়েন্ট মোরিং’ (SPM) প্রকল্পটি এখন রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল গলার কাঁটা।
দুর্নীতির ক্রমানুসার:
-
- প্রাথমিক প্রাক্কলন: ২০১০ সালে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (IDB) এই প্রকল্পের জন্য ২৩৭ মিলিয়ন ডলার ঋণের প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে জার্মান কনসালটেন্ট আইএলএফ (ILF)-এর পরামর্শে এটি ৩০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়।
-
- চীনা অনুপ্রবেশ ও ব্যয় বৃদ্ধি: নসরুল হামিদ দায়িত্ব নেওয়ার পর আইডিবি-কে পাশ কাটিয়ে চীনের ‘সিপিপি’ (CPPEC) কোম্পানিকে এই প্রকল্পে যুক্ত করেন। অপ্রয়োজনীয় দ্বিতীয় পাইপলাইন এবং সাম্প ট্যাঙ্ক যোগ করে ব্যয় কৃত্রিমভাবে ৯০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত তোলা হয়, যা পরবর্তীতে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলারে ‘স্থির’ করা হয়।
-
- যোগ্যতাহীন ঠিকাদার: সিপিপি-র সাব-সি পাইপলাইন স্থাপনের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি দলের নেতিবাচক রিপোর্টকে নসরুল হামিদ গায়ের জোরে পজিটিভ করতে বাধ্য করেন।
-
- বর্তমান অবস্থা: ৪ বার প্রাইস এসক্যালেশনের মাধ্যমে প্রকল্পের খরচ এখন প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার (৮,৩০০ কোটি টাকা)।
ভয়াবহ তথ্য: ২০১৯ সালে মালয়েশিয়া সরকার দুর্নীতির দায়ে এই সিপিপি-র ২৪৩ মিলিয়ন ডলার জব্দ করেছিল। অথচ বাংলাদেশে নসরুল সিন্ডিকেট তাদেরকেই কাজ দিয়েছে।
২. ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২: সালমান এফ রহমানের ‘বেক্সিমকো কানেকশন’
দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২’ স্থাপন ছিল অপরিহার্য। কিন্তু সালমান এফ রহমানের ব্যক্তিগত মুনাফার স্বার্থে এই প্রকল্পকে গত ১২ বছর ধরে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
-
-
- টেকনিপ ও ফিড কন্ট্রাক্ট: কোনো টেন্ডার ছাড়াই ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘টেকনিপ’কে ৪২ মিলিয়ন ইউরোতে ডিজাইনের কাজ দেওয়া হয়। টেকনিপের লোকাল এজেন্ট ছিলেন সালমান এফ রহমান।
-
-
-
- চীনা প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান: চীনের দুটি কোম্পানি ‘বিল্ড অন অপারেশন’ মডেলে অনেক কম খরচে এটি বানাতে চাইলেও নসরুল-সালমান সিন্ডিকেট তা নাকচ করে দেয়।
-
-
-
- নীতিমালার তোয়াক্কা: আইন অনুযায়ী উপদেষ্টা ও ঠিকাদার একই প্রতিষ্ঠান হতে পারে না, তবুও টেকনিপকেই ঠিকাদার করার চেষ্টা চলে। শেষ পর্যন্ত উচ্চ সুদের অজুহাতে প্রকল্পটি ভেস্তে যায়।
-
৩. এস আলম গ্রুপের প্রস্তাব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
২০২৩ সালে এস আলম গ্রুপ ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ এর ৬০ শতাংশ মালিকানা দাবি করে প্রস্তাব দিলে শেখ হাসিনা তাতে সায় দেন। কিন্তু নসরুল-সালমান সিন্ডিকেট তাদের ‘চেয়ারম্যান শামসুর রহমান’কে ব্যবহার করে সেই প্রস্তাব আটকে দেয়, যাতে তারা নিজেরা একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে।
৪. বর্তমান সংকট: মরিচা ধরছে হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The Financial Express এবং The Business Standard-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, এসপিএম প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত করুণ:
-
-
- গ্যারান্টি পিরিয়ড শেষ: গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে সিপিপি-র দেওয়া ১৮ মাসের গ্যারান্টি পিরিয়ড শেষ হয়েছে। অথচ প্রকল্পটি এখনো চালু হয়নি।
-
-
-
- যান্ত্রিক ক্ষতি: সমুদ্রের লোনা পানিতে মূল্যবান বিয়ারিং, সুইভেল এবং সাব-সি হোসগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ এম তামিম সতর্ক করেছেন যে, এটি চালু করতে এখন সরকারকে পুনরায় বিশাল অংকের টাকা খরচ করতে হবে।
-
-
-
- অপারেটর নিয়োগে ব্যর্থতা: অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুইবার আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও ত্রুটিপূর্ণ শর্তের কারণে যোগ্য অপারেটর পাওয়া যায়নি।
-
৫. সিন্ডিকেটের বর্তমান অবস্থা
নসরুল হামিদ বিপু ফ্রান্সে পলাতক এবং সালমান এফ রহমান কারাগারে থাকলেও সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য এনায়েতুল্লাহ খান এখনো সক্রিয়। অভিযোগ উঠেছে, তিনি নতুন সরকারের আমলেও জ্বালানি খাতে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে পর্দার আড়ালে লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন।
উপসংহার: জ্বালানি খাতের এই মেগা-লুন্ঠন কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার ওপর এক বড় আঘাত। এসপিএম এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি ইউনিট-২ এর এই স্থবিরতা দূর করতে দ্রুত একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন গঠন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি।



