আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১ মে, ২০২৬
ওয়াশিংটন/তেহরান: মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত মরু-রাজনীতিতে যুদ্ধের দামামা এখন আরও জোরালো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ-এর এক বিস্ফোরক রিপোর্টে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অতীব শক্তিশালী হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েন করেছে। সমর বিশেষজ্ঞদের মতে, এর আগে রণক্ষেত্রে ওয়াশিংটন এত বিধ্বংসী অস্ত্র কখনো ব্যবহার করেনি।
এই মোতায়েনের পরপরই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইরানে পরবর্তী হামলার কৌশল নিয়ে ব্রিফ করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্কাই নিউজ দাবি করেছে, ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে এই উইকএন্ডেই দেশটিতে একটি ‘স্বল্পমেয়াদী কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন।
১. ‘নতুন অধ্যায়’—মুজতাবা খামেনির বার্তা
ইরানে হামলার গুঞ্জনের মধ্যেই দেশটির নেতা মুজতাবা খামেনি তাঁর টেলিগ্রাম চ্যানেলে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেছেন। তিনি সরাসরি ঘোষণা করেছেন:
“পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার পরিকল্পনায় ব্যর্থ হয়েছে এবং বর্তমান পরিবর্তনগুলো সেই পরাজয়েরই ফসল।”
খামেনি স্পষ্ট করেছেন যে, ইরান এই অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত করবে এবং জলপথের ওপর বাইরের শক্তির খবরদারি বন্ধ করবে। সামরিক বিশ্লেষক শন বেলের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মাঝে একটি নতুন ঐক্যের নেতৃত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা মার্কিন বলয় থেকে বেরিয়ে আসার এক নীরব বিপ্লব।
২. জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধাক্কা
যুদ্ধের এই নতুন সমীকরণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। গত সাড়ে চার বছরের রেকর্ড ভেঙে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে ইউরোপ ও আমেরিকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩. বদলে যাওয়া মিত্র ও আঞ্চলিক মেরুকরণ
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ-এর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এই সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব (Hegemony) বড় আকারে হারিয়েছে। এর স্বপক্ষে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে:
- আঞ্চলিক ঐক্য: ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই এক সপ্তাহে পাকিস্তান, ওমান, রাশিয়া, সৌদি আরব এবং কাতারের সাথে নিবিড় আলোচনা করেছেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উপস্থিতি ছিল না।
- পাকিস্তান-ইরান সড়ক পথ: আল-জাজিরার রিপোর্ট অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলেও ইরানের রপ্তানি সচল রাখতে পাকিস্তান-ইরান সড়ক পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।
- জার্মানির অবস্থান: মার্কিন মিত্র জার্মানির চ্যান্সেলর সরাসরি বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি নেতৃত্বের কাছে অপমানিত হচ্ছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প জার্মানি থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
৪. যুদ্ধের ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
মার্কিন কংগ্রেসে ডিফেন্স সেক্রেটারি হেগসেথের শুনানি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৪০ দিনের এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের খরচ হয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা)। বিশ্লেষকরা বলছেন, ধ্বংস হওয়া ঘাঁটিগুলোর পুনঃনির্মাণ হিসাব করলে এই অঙ্ক ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে—যা বাংলাদেশের এক বছরের জাতীয় বাজেটের চেয়েও বেশি।
“আমেরিকার মিত্র দেশগুলোও এখন ওয়াশিংটনকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কূটনৈতিক দূরদর্শিতার অভাবে ট্রাম্প প্রশাসন এখন পুরোপুরি একা হয়ে পড়ছে।” — অধ্যাপক জেফ্রি সাক্স
🔍 বিশ্লেষণ: কেন ট্রাম্প প্রশাসন কোণঠাসা?
প্রখ্যাত কলামিস্ট অধ্যাপক রবার্ট পেপ মনে করেন, “একটি পারমাণবিক ইরান এখন অনিবার্য।” যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক অবরোধ এবং সামরিক হুমকি সত্ত্বেও ইরান কূটনৈতিক চাল দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বড় দেশগুলোকে নিজেদের বলয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ‘Strait of Trump’ বা ‘ট্রাম্পের প্রণালী’র মতো মন্তব্যগুলোকে সাম্রাজ্যবাদী আস্ফালন হিসেবে দেখছে বিশ্ব সম্প্রদায়। এমনকি ব্রিটিশ রাজা চার্লসের সাথে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বাদানুবাদ প্রমাণ করে যে, মিত্র দেশগুলোও এখন আর ওয়াশিংটনের বাজে মন্তব্য প্রশ্রয় দিতে রাজি নয়।
📌 বিশেষ নোট: কী হতে যাচ্ছে সামনে?
আজকের সেন্টকম ব্রিফিংয়ের পর ট্রাম্প যদি আবারও ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে মার্কিন প্রভাবের চূড়ান্ত পতন ঘটাতে পারে। ২০২৬ সালের এই সংকট সম্ভবত নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার (New World Order) ইঙ্গিত দিচ্ছে, যেখানে ইরান একটি বড় সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পথে।



