Homeটুডে টেকডিজিটাল সম্প্রচারে নতুন আইনি কাঠামো: বাংলাদেশের ওটিটি ও স্ট্রিমিং সেবায় কি শৃঙ্খলা...

ডিজিটাল সম্প্রচারে নতুন আইনি কাঠামো: বাংলাদেশের ওটিটি ও স্ট্রিমিং সেবায় কি শৃঙ্খলা ফিরবে?

বিশেষ প্রযুক্তি ও আইন বিশ্লেষণ | ২৯ এপ্রিল, ২০২৬
ঢাকা: দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাংলাদেশের ডিজিটাল বিনোদন ও সংবাদ প্রবাহের দৃশ্যপট বদলে দিতে যাচ্ছে ‘সম্প্রচার অধ্যাদেশ, ২০২৬’। ওটিটি (OTT), আইপিটিভি (IPTV) এবং আইপি রেডিওর মতো প্রযুক্তি-নির্ভর সেবাগুলোকে প্রথমবারের মতো প্রথাগত সম্প্রচার মাধ্যমের মতো নিবন্ধনের আওতায় আনছে সরকার। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতকৃত এই খসড়া নিয়ে বর্তমানে প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

১. ডিজিটাল সেন্সরশিপ নাকি শৃঙ্খলা?

নতুন অধ্যাদেশের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বিনোদন ও ইনফোটেইনমেন্ট সেবাগুলোকে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত করা।

  • লাইসেন্সিং: বর্তমানে পরিচালিত ওটিটি বা আইপিটিভিগুলো সয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ বলে গণ্য হলেও নতুনদের ফি পরিশোধ করে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে আসতে হবে।
  • বিটিআরসি ও কমিশনের সমন্বয়: কারিগরি বিষয়গুলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (BTRC) দেখলেও বিষয়বস্তু বা কন্টেন্ট তদারকির জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ‘সম্প্রচার কমিশন’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

২. কঠোর শাস্তির বিধান ও নীতিমালার ছক

এই অধ্যাদেশ কেবল লাইসেন্স নয়, বরং কন্টেন্টের মান ও বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ম আরোপ করেছে।

  • আর্থিক অপরাধ ও জুয়া: অবৈধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জুয়া (Betting), তামাক বা মদ্যজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করলে সর্বোচ্চ ৩০ লাখ টাকা জরিমানা এবং ২ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
  • নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা: সামরিক বা বেসামরিক গোপন তথ্য ফাঁস করলে শাস্তির মাত্রা আরও কঠোর—অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৩ বছরের কারাদণ্ড
  • বিজ্ঞাপনে বিধিনিষেধ: সংসদ ভবন, সচিবালয় বা সেনানিবাসের মতো কেপিআইভুক্ত এলাকায় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন চিত্রায়ন বা প্রদর্শনে জেল-জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।

৩. তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা ও সামাজিক মূল্যবোধ

খসড়া অনুযায়ী, সম্প্রচার মাধ্যমগুলো কোনো বিশেষ মতাদর্শ বা ব্যক্তিগত মতামত গ্রাহকের ওপর চাপিয়ে দিতে পারবে না।

  • ভারসাম্যপূর্ণ উপস্থাপন: সব ধরনের বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ভারসাম্যপূর্ণ প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।
  • সাংবিধানিক মূল্যবোধ: মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় আন্দোলনের সঠিক তথ্য প্রচার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

৪. আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও তুলনা

    বিশ্বের অনেক দেশেই ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য কঠোর নীতিমালা রয়েছে। ভারতের ‘IT Rules 2021’ বা ইউরোপের ‘Digital Services Act’ (DSA)-এর আদলে বাংলাদেশও তার ডিজিটাল স্পেসকে নিরাপদ করার চেষ্টা করছে। তবে সমালোচকদের মতে, কঠোর শাস্তির ভয় অনেক সময় সৃজনশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই তথ্যের সত্যনিষ্ঠতা নিশ্চিতের পাশাপাশি মত প্রকাশের স্বাধীনতার ভারসাম্য রক্ষাই হবে এই আইনের বড় চ্যালেঞ্জ।

    ​সরকার এই অধ্যাদেশটিকে চূড়ান্ত করার আগে জনমত যাচাইয়ের সুযোগ দিয়েছে।

    উপসংহার: বাংলাদেশের স্ট্রিমিং ইন্ডাস্ট্রি যখন বিলিয়ন ডলারের বাজারে পরিণত হওয়ার পথে, তখন এই ধরনের একটি সময়োপযোগী নীতিমালা অপরিহার্য ছিল। তবে এর প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দেশের ডিজিটাল মিডিয়ার ভবিষ্যৎ।

    তথ্যসূত্র: তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (খসড়া অধ্যাদেশ ২০২৬), বিটিআরসি

    RELATED ARTICLES

    LEAVE A REPLY

    Please enter your comment!
    Please enter your name here

    - Advertisment -
    Google search engine

    Most Popular

    Recent Comments