দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অন্ধকার গলিতে পড়ে থাকা তনু হত্যার ফাইলটি অবশেষে আলোর মুখ দেখেছে। ২০১৬ সালে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী জাহান তনুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর যে হাহাকার তৈরি হয়েছিল, আজ বিচার প্রক্রিয়া শুরুর মধ্য দিয়ে সেই ক্ষতে কিছুটা প্রলেপ পড়ার আশা জেগেছে। কিন্তু তনুর বিচারের এই সূচনা নতুন করে একটি বড় প্রশ্নকে জনমনে গেঁথে দিয়েছে— তবে কি সাগর-রুনি হত্যার বিচারও আলোর মুখ দেখবে?
তনু হত্যা: ১২ বছরের দীর্ঘ লড়াই
২০১৬ সালের ২০ মার্চ। কুমিল্লার ময়নামতি সেনানিবাস এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ। এরপর পার হয়েছে দীর্ঘ ১২টি বছর। দুই দফা ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা এবং দফায় দফায় তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন ছাড়া দৃশ্যত কিছুই হয়নি এতদিন। বিচারের আশায় তনুর বাবার মৃত্যু এবং মায়ের চোখের জলের কোনো দাম কি নেই?— এমন আক্ষেপ যখন জনমনে তুঙ্গে, তখনই আদালতের এই পদক্ষেপে স্বস্তি ফিরছে। ১২ বছর পর বিচার শুরু হওয়া প্রমাণ করে যে, অপরাধী যত শক্তিশালীই হোক, ন্যায়ের পথ রুদ্ধ করা কঠিন।
সাগর-রুনি: ৯৫ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
তনু হত্যার বিচার শুরু হলেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচার যেন এক গভীর গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে আছে। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন এই দম্পতি। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ পিছিয়েছে ৯৫ বারেরও বেশি।
তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী থেকে শুরু করে তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সেই আলোচিত ‘৪৮ ঘণ্টা’ যেন এক অনন্তকালের প্রতীক্ষায় রূপ নিয়েছে। উচ্চ আদালত বারবার অসন্তোষ প্রকাশ করলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না থাকাটা নাগরিক দর্পণে একটি বড় ব্যর্থতা হিসেবেই প্রতিফলিত হয়।
বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও নাগরিক সংশয়
তনু হত্যার বিচার শুরু হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন— সাগর-রুনি হত্যার রহস্য কি তবে চিরকাল অমীমাংসিতই থেকে যাবে? বিচারের বাণী কি নিভৃতে এভাবেই কাঁদবে? যখন তনুর মতো আলোচিত হত্যাকাণ্ডের জট এক যুগ পর খুলতে পারে, তখন সাগর-রুনির বিচার প্রক্রিয়া থমকে থাকাটা বিচার ব্যবস্থার ওপর এক ধরনের অনাস্থা তৈরি করে।
নাগরিক প্রত্যাশা: বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্তি
একটি সভ্য সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি কখনোই কাম্য নয়। তনুর বিচারের পথ চলা যেমন ন্যায়বিচারের নতুন আশা দেখাচ্ছে, তেমনি সাগর-রুনি হত্যার তদন্ত দ্রুত শেষ করে দোষীদের কাঠগড়ায় তোলা এখন সময়ের দাবি।
নাগরিক দর্পণ মনে করে, তনু হত্যার বিচার কেবল একটি মামলার রায় নয়, বরং এটি প্রমাণ করবে যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়বদ্ধতা রাষ্ট্রের আছে। একই ধারাবাহিকতায় সাগর-রুনি হত্যার বিচারের জট খুলে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে— আইনের কাছে সবাই সমান এবং অপরাধীর কোনো অদৃশ্য হাত নেই।
আমরা অপেক্ষায় রইলাম, কবে সেই দিন আসবে যেদিন সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের বিচারের খবরটিও আমাদের ‘নাগরিক দর্পণ’-এ প্রধান খবর হিসেবে স্থান পাবে।




বিচার চাই