বিশেষ ঐতিহাসিক প্রতিবেদন | টুডে টিভি বিডি
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত এক রুক্ষ, পাথুরে কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদে ঠাসা ভূখণ্ডের নাম বেলুচিস্তান। এটি কেবল একটি মানচিত্রের নাম নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস ও বঞ্চনার এক জীবন্ত সাক্ষী। আজ এই বিশাল অঞ্চলটি পাকিস্তান, ইরান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে বিভক্ত। কেন এই বিভাজন? কীভাবেই বা একসময়ের স্বাধীন ‘কালাত’ আজ তিনটি দেশের সীমান্তে খণ্ডিত হলো?
১. ভৌগোলিক সীমানা: আয়তনে ফ্রান্সের চেয়েও বড়
ঐতিহাসিক ‘গ্রেটার বেলুচিস্তান’ বা বৃহত্তর বেলুচিস্তানের মোট আয়তন প্রায় ৬,৪৭,০০০ বর্গ কিলোমিটার। এটি বর্তমানে তিনটি দেশে বিভক্ত:
| অঞ্চল | আয়তন (বর্গ কিমি) | বর্তমান অবস্থান | প্রধান শহর |
|---|---|---|---|
| পূর্ব বেলুচিস্তান | ৩,৪৭,১৯০ | পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশ | কোয়েটা, গাওয়াদর |
| পশ্চিম বেলুচিস্তান | ১,৮১,৭৮৫ | ইরানের সিস্তান-ও-বেলুচিস্তান প্রদেশ | জাহেদান, চাবাহার |
| উত্তর বেলুচিস্তান | ১,১৮,০২৫ | আফগানিস্তানের নিমরোজ, হেলমান্দ ও কান্দাহার | নিমরোজ |
২. ইতিহাসের শুরু: মেহেরগড় থেকে কালাত সালতানাত
বেলুচিস্তানের ইতিহাস পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার অন্যতম। এখানকার মেহেরগড় সভ্যতা (খ্রিস্টপূর্ব ৭০০০ অব্দ) প্রমাণ করে যে, সিন্ধু সভ্যতারও আগে এখানে উন্নত জনপদ ছিল।
- খানাত অব কালাত (১৬৬৬ – ১৯৪৮): আধুনিক বেলুচিস্তানের রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৬৬৬ সালে মীর আহমেদ খানের হাত ধরে। ‘কালাত’-কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশরা আসার আগ পর্যন্ত কালাতের খানরা এই অঞ্চলের ভাগ্যবিধাতা ছিলেন।
৩. যেভাবে বিভক্ত হলো বেলুচিস্তান (গ্রেট গেম ও কৃত্রিম সীমান্ত)
বেলুচিস্তানের বর্তমান বিভাজন মূলত ১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘গ্রেট গেম’ বা রুশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইয়ের ফল। ব্রিটিশরা তাদের ভারতের সীমান্ত সুরক্ষার জন্য বেলুচিস্তানকে তিন ভাগে কেটে ফেলে।
- গোল্ডস্মিড লাইন (১৮৭১): ব্রিটিশ জেনারেল ফ্রেডরিক গোল্ডস্মিড পারস্য (ইরান) এবং ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে একটি সীমান্ত রেখা টানেন। এর ফলে পশ্চিম বেলুচিস্তান ইরানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
- ডুরান্ড লাইন (১৮৯৩): স্যার মর্টিমার ডুরান্ড আফগান আমিরের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে বেলুচিস্তানের উত্তর অংশকে আফগানিস্তানের মানচিত্রে যুক্ত করেন।
- ১৯৪৭-৪৮ এর ট্র্যাজেডি: ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময় কালাতকে ‘স্বাধীন’ ঘোষণা করা হলেও ১৯৪৮ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী কালাত দখল করে নেয়। বেলুচ জাতীয়তাবাদীরা আজও একে তাদের ইতিহাসের কালো দিন মনে করে।
৪. বর্তমান অবস্থান: তিন দেশে বেলুচদের জীবন
অর্থনৈতিক চিত্র: ‘সোনার খনি কিন্তু ভিক্ষুকের ঝুলি’
বেলুচিস্তান প্রাকৃতিক সম্পদে বিশ্বের অন্যতম ধনী অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও এর বাসিন্দারা চরম দারিদ্র্যের শিকার।
- পাকিস্তান অংশ: এখানে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বড় তামা ও সোনার খনি (রেকর্ডিক) এবং বিপুল প্রাকৃতিক গ্যাস। বর্তমানে চীনের সহায়তায় নির্মিত গাওয়াদর বন্দর একে ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
- ইরান অংশ: এখানকার চাবাহার বন্দর কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে শিয়া প্রধান ইরানে সুন্নি বেলুচরা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান
- পাকিস্তান: এখানে স্বাধীনতার দাবিতে ১৯৪৮ সাল থেকে দফায় দফায় বিদ্রোহ চলছে। বর্তমানে বেলুচ লিবারেশন আর্মি (BLA) সহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয়। মানবাধিকার কর্মীদের নিখোঁজ হওয়া এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এখানে একটি নিয়মিত সংবাদ।
- ইরান: এখানে জাতিগত ও ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে বেলুচরা দীর্ঘকাল ধরে লড়াই করছে। ‘জৈশ আল-আদল’ নামক গোষ্ঠী সেখানে সক্রিয়।
- আফগানিস্তান: তালেবান শাসনামলে বেলুচরা মূলত সীমান্ত বাণিজ্য এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দারিদ্র্য সবচেয়ে বেশি।
সাংস্কৃতিক ঐক্য
তিনটি দেশে বিভক্ত থাকলেও বেলুচদের ভাষা ও সংস্কৃতি আজও অভিন্ন। তারা মূলত বেলুচি ও ব্রাহুই ভাষায় কথা বলে। তাদের আতিথেয়তা, উপজাতীয় প্রথা এবং বীরত্বের লোকগাথা আজও তাদের মানসিকভাবে এক করে রেখেছে।
৫. উপসংহার: এক অমীমাংসিত ক্ষত
বেলুচিস্তান বর্তমানে বৈশ্বিক শক্তির দাবার গুটিতে পরিণত হয়েছে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) এবং ভারতের চাবাহার বন্দর কেন্দ্রিক কৌশল একে বিশ্ব রাজনীতির নাভিমূলে স্থাপন করেছে। তবে এই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ বেলুচ জনগণের অধিকার। ইতিহাসের এই ক্ষত কবে শুকাবে—তা আজও এক বড় প্রশ্ন।



