আন্তর্জাতিক ডেস্ক | টুডে টিভি বিডি
২৭ এপ্রিল, ২০২৬
টাম্পা, ফ্লোরিডা: যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির সন্ধানে তল্লাশির মধ্যেই একটি জলাশয় থেকে অজ্ঞাত মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও উদ্ধারকৃত অবশিষ্টাংশটি বৃষ্টির কিনা, তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি স্থানীয় পুলিশ, তবে তদন্তের প্রেক্ষাপট এবং ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় আশঙ্কা করা হচ্ছে, এটি নিখোঁজ এই মেধাবী ছাত্রীরই মরদেহ। পরিচয় নির্ধারণে বর্তমানে পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনারের দফতরে ময়নাতদন্ত চলছে।
উদ্ধার অভিযানের বিবরণ ও তাৎপর্য
২৬ এপ্রিল, রবিবার রাত ৮টা ৪৩ মিনিটে হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, পিনেলাস কাউন্টির ইন্টারস্টেট ২৭৫ ও ফোর্থ স্ট্রিট নর্থের কাছের জলাধার থেকে মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করা হয়েছে। হিলসবোরো ও পিনেলাস কাউন্টি শেরিফের কার্যালয় যৌথভাবে এই অভিযান পরিচালনা করে।
আজকের এই উদ্ধার স্থানটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ইন্টারস্টেট ২৭৫ হলো সেই মূল সেতু করিডোর যা টাম্পা থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ ও পিনেলাস কাউন্টিকে সংযুক্ত করে এবং এটি হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুর নিকটবর্তী। গত সপ্তাহে এই সেতু থেকেই অপর বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তদন্তকারীরা আগেই জানিয়েছিলেন, জামিলের ফোনের লোকেশন এবং ঘাতক আবুগারবিয়েহর গাড়ির গতিবিধির সঙ্গে এই এলাকার গভীর সংযোগ রয়েছে।
জামিল লিমনের হত্যা এবং বৃষ্টির নিখোঁজ রহস্য
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ডক্টরাল শিক্ষার্থী জামিল লিমন ও নাহিদা বৃষ্টি গত ১৬ এপ্রিল থেকে নিখোঁজ ছিলেন। গত সপ্তাহে হাওয়ার্ড ফ্র্যাংকল্যান্ড সেতুতে কালো ট্র্যাশ ব্যাগের ভেতর থেকে জামিলের পচনশীল মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়, ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতেই জামিলের মৃত্যু হয়েছে। এই ডাবল মার্ডার কেসে গত শনিবার তাদের রুমমেট হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহকে (২৬) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত খুনের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
বৃষ্টির দেহ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া না গেলেও, তদন্তের নথিপত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে তিনি আর বেঁচে নেই। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ১৬ এপ্রিল বৃষ্টি তার অফিস থেকে বের হয়ে ছাতা মাথায় দিয়ে জামিলের অ্যাপার্টমেন্টের দিকে যাচ্ছেন। পরে তদন্তকারীরা জামিলের ঘরে বৃষ্টির জুতা ও ছাতা খুঁজে পান, যা নিশ্চিত করে তিনি সেদিন ওই অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন।
চ্যাটজিপিটিতে লাশ গুমের ব্লু-প্রিন্ট: ভয়াবহ তদন্তের নথিপত্র
আদালতের নথিতে ঘাতক আবুগারবিয়েহর ফোন থেকে পাওয়া তথ্যগুলো শিউরে ওঠার মতো। তদন্তকারীরা দেখেছেন, হত্যার কয়েক দিন আগে থেকেই আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটির কাছে লাশ গুম করার উপায় এবং অপরাধ সংগঠনের বিষয়ে পরামর্শ চাইছিলেন।
নথি অনুযায়ী:
- ১৩ এপ্রিল: আবুগারবিয়েহ চ্যাটজিপিটিকে প্রশ্ন করেন, “একজন মানুষকে কালো ট্র্যাশ ব্যাগে ভরে ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হয়?” চ্যাটজিপিটি উত্তর দেয় এটি বিপজ্জনক। তখন আবুগারবিয়েহ পাল্টা প্রশ্ন করে, “তারা কীভাবে জানবে?”
- পরবর্তী দিনগুলোতে: সে আরও জিজ্ঞেস করেছিল, গাড়ির ভিআইএন নম্বর বদলানো যায় কিনা, লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে বন্দুক রাখা যায় কিনা এবং স্নাইপারের গুলিতে মাথায় লাগলে কেউ বাঁচে কিনা।
- ১৫ এপ্রিল (হত্যার একদিন আগে): সে একটি নকল দাড়ি অর্ডার করে। এর আগেই ডাক্টটেপ, ট্র্যাশ ব্যাগ, চারকোল এবং লাইটার ফুয়েল অর্ডার করা হয়েছিল।
এছাড়া, জামিল ও আবুগারবিয়েহর শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে বিশেষ রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রক্তের ছাপ পাওয়া গেছে। শোবার ঘরের মেঝেতে থাকা রক্তের দাগগুলো ‘মোটামুটি মানুষের আকারের মতো’ ছিল এবং ড্র্যাগিং বা টেনে নিয়ে যাওয়ার প্যাটার্ন স্পষ্ট।
বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের উদ্বেগ ও উত্তরের অপেক্ষা
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ দূতাবাস, উভয় শিক্ষার্থীর পরিবার এবং নিউইয়র্ক থেকে ফ্লোরিডা পর্যন্ত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের ছায়া নেমে এসেছে। জামিল ও বৃষ্টির পরিবার দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন। সবাই এখন পিনেলাস কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারের দফতরের ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, যাতে নাহিদা বৃষ্টির নিয়তি সম্পর্কে চূড়ান্ত সত্যটি জানা যায়।
টুডে টিভি বিডি’র পক্ষ থেকে আমরা এই মেধাবী শিক্ষার্থীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। এই জঘন্য অপরাধের দ্রুত এবং দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে আমরা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।



