Homeজাতীয়পরমাণু যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোড শুরু, আগস্টেই মিলতে পারে বিদ্যুৎ

পরমাণু যুগে বাংলাদেশ: রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম লোড শুরু, আগস্টেই মিলতে পারে বিদ্যুৎ

রূপপুর, পাবনা: বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ইতিহাসে রচিত হলো এক অনন্য মহাকাব্য। সকল বৈশ্বিক সংকট ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের চুল্লিপাত্রে (Reactor Vessel) জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম প্রবেশ করানোর কাজ শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেলে এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সুইচ টিপে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এর মাধ্যমে বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী অভিজাত ক্লাবে নিজের অবস্থান সুসংহত করল বাংলাদেশ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্যালেন্ডার: কখন কী ঘটবে?

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিং থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ আসা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হবে:

  • প্রথম ৩০ দিন: প্রথম ইউনিটে মোট ১৬৩টি জ্বালানি রড বা বান্ডিল অত্যন্ত নিখুঁতভাবে রিঅ্যাক্টর ভেসেলে সাজানো হবে। এটি একটি স্বয়ংক্রিয়া এবং রোবটিক প্রক্রিয়া।
  • পরবর্তী ৩৪ দিন: এই সময়ে ‘ক্রিটিক্যালিটি’ টেস্ট করা হবে। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রিতভাবে পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরু করা হবে এবং দেখা হবে তেজস্ক্রিয়তা ও তাপ উৎপাদন সঠিক মাত্রায় আছে কি না।
  • গ্রিড সিঙ্ক্রোনাইজেশন: চুল্লির উৎপাদন ক্ষমতা যখন মোট সক্ষমতার ৩০ শতাংশে পৌঁছাবে (প্রায় ৩৫০-৪০০ মেগাওয়াট), তখন প্রথমবার একে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, এটি আগস্ট ২০২৬-এর শেষ দিকে হতে পারে।
  • পূর্ণ সক্ষমতা: গ্রিডে যুক্ত হওয়ার পরবর্তী ১০ মাস ধরে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা ১০০ শতাংশে (১২০০ মেগাওয়াট) নেওয়া হবে। বাণিজ্যিক উৎপাদন পূর্ণমাত্রায় শুরু হতে ২০২৭ সালের মার্চ/এপ্রিল পর্যন্ত সময় লাগবে।

ইউরেনিয়াম আসলে কী এবং কীভাবে কাজ করে?

অনেকের মনে কৌতূহল থাকে এই জ্বালানি নিয়ে। ইউরেনিয়াম অক্সাইড দিয়ে তৈরি ছোট ছোট ‘প্যালেট’ সাজিয়ে তৈরি হয় রড। আর ৩১২টি রড মিলে তৈরি হয় একটি ‘ফুয়েল অ্যাসেম্বলি’ বা বান্ডিল।

  • স্থায়িত্ব: একবার জ্বালানি লোড করলে তা টানা ১৮ মাস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম। এরপর এক-তৃতীয়াংশ জ্বালানি পরিবর্তন করতে হয়।
  • বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ব্যবহৃত জ্বালানি বা তেজস্ক্রিয় বর্জ্য রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী তারা নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যাবে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বস্তির বিষয়।

ব্যয়ের খতিয়ান ও অর্থনৈতিক সাশ্রয়

প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। যদিও ডলারের দাম বাড়ায় খরচ কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি বিশাল সাশ্রয় আনবে:

  • জ্বালানি খরচ: বছরে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকার ইউরেনিয়াম দিয়ে যে বিদ্যুৎ মিলবে, একই পরিমাণ বিদ্যুৎ কয়লা দিয়ে উৎপাদন করতে খরচ হতো কয়েক গুণ বেশি (প্রায় ১ কোটি টন কয়লা লাগত)।
  • আয়ুষ্কাল: একটি কয়লা বা গ্যাসচালিত কেন্দ্র ২৫-৩০ বছর চললেও রূপপুর চলবে কমপক্ষে ৬০ থেকে ৯০ বছর

নিরাপত্তা ব্যবস্থা: ৩+ প্রজন্মের প্রযুক্তি

ফুকুশিমা বা চেরনোবিল দুর্ঘটনার কথা মাথায় রেখে রূপপুরে রাশিয়ার সর্বাধুনিক VVER-1200 প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।

  • এটি ‘প্যাসিভ সেফটি সিস্টেম’ সমৃদ্ধ, যা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও বা বড় কোনো মানবিক ভুল হলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিঅ্যাক্টর বন্ধ করে দিতে সক্ষম।
  • যেকোনো ধরনের বড় ভূমিকম্প বা বিমান আছড়ে পড়লেও এর মূল কাঠামো বা ‘কন্টেইনমেন্ট’ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব

রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের মোট চাহিদার ১০ থেকে ১২ শতাংশ পূরণ করবে। সচিব মো. আনোয়ার হোসেনের মতে, এটি জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় এটি বছরে দুই কোটি টন কার্বন নিঃসরণ কমাবে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের এই বিশাল প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ৬০ বছর মেয়াদী এই কেন্দ্রটি হবে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎস।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও সহযোগিতা

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ এবং ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে আইএইএ (IAEA) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি বাংলাদেশের এই অর্জনকে অভিনন্দন জানান। রোসাটম নিশ্চিত করেছে যে, এখানে ৩+ প্রজন্মের সর্বাধুনিক ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ

করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে প্রকল্পের মেয়াদ ও ডলারের দাম বাড়ায় খরচ কিছুটা বাড়লেও, এটি চালু হলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় হবে। নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি লোডিং একটি বড় মাইলফলক, তবে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ জনবলের মাধ্যমে এই শক্তিকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতে রূপান্তর করা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments