ফ্লোরিডা, যুক্তরাষ্ট্র: যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় পিএইচডি গবেষক জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির অন্তর্ধান এবং পরবর্তী নৃশংস হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর পেশ করা বিস্তারিত টাইমলাইন এবং আদালতে জমা দেওয়া নথিপত্র অনুযায়ী, এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে রয়েছে ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনা। সন্দেহভাজন ঘাতক হিশাম আবুঘরবেহর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট এবং ডোরড্যাশ অর্ডারের সূত্র ধরে উঠে এসেছে কীভাবে দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর জীবনপ্রদীপ নিভে গেল।
১৬ এপ্রিল: নিখোঁজের শুরু ও আবুঘরবেহর রহস্যময় তৎপরতা
১৬ এপ্রিল বিকেলের পর থেকেই লিমন ও বৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুবান্ধবদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। লিমনের মুঠোফোনের অবস্থান অনুযায়ী, সেদিন রাত ৭টা ৪৩ মিনিটে তিনি তার বাসা থেকে ৩২ মাইল দূরে ক্লিয়ারওয়াটার এলাকায় গিয়েছিলেন। লিমনের অবস্থানের ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ওই একই এলাকায় আবুঘরবেহর সাদা হুন্দাই জেনেসিস গাড়িটিকে দেখা যায়।
তদন্তকারীরা বলছেন, সেদিন রাত সাড়ে ১০টায় আবুঘরবেহ ‘ডোরড্যাশ’-এর মাধ্যমে ক্লিনিং লিকুইড (লাইজল), দুর্গন্ধনাশক (ফেব্রিজ) এবং বড় আবর্জনা ফেলার ব্যাগ অর্ডার করেন। লিমনের অন্য এক রুমমেট জানান, সে রাতে আবুঘরবেহকে একটি চাকাওয়ালা ট্রলিতে করে বড় কার্ডবোর্ডের বাক্স ময়লার স্তূপের দিকে নিয়ে যেতে দেখা গিয়েছিল।
১৭ এপ্রিল: চ্যাটজিপিটির কাছে অপরাধ গোপনের পরামর্শ
মামলার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মোড় আসে ঘাতকের ‘চ্যাটজিপিটি’ হিস্ট্রি থেকে। ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ৪টার মধ্যে আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটির কাছে জানতে চেয়েছিলেন— ‘হিলসবরো রিভার স্টেট পার্কে কি গাড়ি তল্লাশি করা হয়?’ এছাড়া ২৩ এপ্রিল তিনি আবারও সার্চ করেন— ‘নিখোঁজ বিপন্ন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ বলতে কী বোঝায়?’
প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে অপরাধ গোপনের এই চেষ্টা তদন্তকারীদের স্তম্ভিত করেছে। ওই রাতেই তাকে দুবার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুতে যাতায়াত করতে দেখা যায়।
তদন্তে উঠে আসা প্রমাণ ও লিমনের মরদেহের হদিস
২৩ এপ্রিল পুলিশ ময়লা ফেলার স্থানে তল্লাশি চালিয়ে রক্তমাখা ফ্লোর ম্যাট, বৃষ্টির ফোনের কভার এবং লিমনের মানিব্যাগ ও রক্তমাখা পোশাক উদ্ধার করে। ২৪ এপ্রিল হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড সেতুর কাছে একটি কালো আবর্জনার ব্যাগ থেকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, লিমনের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক গভীর আঘাত ছিল, যার মধ্যে একটি তার যকৃৎ ফুটো করে দেয়। তবে বৃষ্টির মরদেহ এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, যদিও তদন্তকারীরা নিশ্চিত তিনিও এই নৃশংসতার শিকার।
ঘাতকের অতীত ও উগ্র মেজাজ
তদন্তে জানা গেছে, আবুঘরবেহর মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী—তার ছেলে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন না। ২০২৩ সালেও তিনি দুবার লাঞ্ছনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এবং নিজের ভাইয়ের ওপর হামলার কারণে তার বিরুদ্ধে আইনি নিষেধাজ্ঞা ছিল।
আদালতে বিচার প্রক্রিয়া
গতকাল মঙ্গলবার হিশাম আবুঘরবেহকে আদালতে তোলা হয়। তার বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, মৃতদেহ গোপন করা, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট এবং অবৈধভাবে আটকে রাখার মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। মার্কিন আইনজীবীরা তাকে বিনা জামিনে কারাবন্দি রাখার আবেদন করেছেন।
দুই মেধাবী শিক্ষার্থীর এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।



