Homeটুডে ওয়ার্ল্ডনারদার ঘুষের ভিডিও থেকে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী: শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রে বদলে গেল কি...

নারদার ঘুষের ভিডিও থেকে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী: শুভেন্দু অধিকারীর ক্ষেত্রে বদলে গেল কি তদন্তের ভাষা?

২০১৬-তে নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠে নারদা ছিল তৃণমূলের দুর্নীতির প্রতীক, বিজেপির প্রচারণায় ছিল শুভেন্দুর ভিডিও; ২০২০-তে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই ভিডিও সরিয়ে ফেলা হয়, ২০২১-এ একই মামলায় তৃণমূল নেতারা গ্রেপ্তার হলেও শুভেন্দুকে চার্জশিটে রাখা হয়নি—এই ঘটনাপ্রবাহই এখন ‘ওয়াশিং মেশিন’ বিতর্কের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন

টুডে টিভি বিডি | বিশেষ বিশ্লেষণ

ভারতের রাজনীতিতে ‘বিজেপির ওয়াশিং মেশিন’ কথাটি বিরোধীদের রাজনৈতিক কটাক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এই অভিযোগের পেছনে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, কিছু ক্ষেত্রে এমন একটি দৃশ্যমান ঘটনাপ্রবাহও রয়েছে, যেখানে কোনো নেতা বিরোধী দলে থাকাকালে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে পড়েছেন, পরে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন এবং এরপর সেই মামলার গতিপথ বদলে গেছে বা দৃশ্যমানভাবে ধীর হয়েছে। এই প্রবণতা নিয়ে ২০২৪ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৫ জন গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতার মামলা বিশ্লেষণ করে দেখেছিল, তাঁদের মধ্যে ২৩ জন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তদন্তে স্থবিরতা বা ছাড়ের চিত্র পাওয়া যায়।

এই বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কারণ তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু কোনো মামলার কাগজে সীমাবদ্ধ নয়। ২০১৬ সালের নারদা স্টিংয়ের ভিডিও আছে, সেই ভিডিওকে বিজেপি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজে নারদা নিয়ে মঞ্চে আক্রমণ করেছিলেন, ২০১৭ সালে সিবিআই এফআইআরে শুভেন্দুর নাম আসে, ২০২০ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন এবং তার পরদিনই বিজেপির ইউটিউব চ্যানেল থেকে নারদার সেই ভিডিও সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ২০২১ সালে নারদা মামলায় চার তৃণমূল নেতাকে গ্রেপ্তার করে সিবিআই চার্জশিট দেয়, কিন্তু একই মামলার এফআইআরে থাকা শুভেন্দু অধিকারী ও মুকুল রায়ের নাম চার্জশিটে রাখা হয়নি।

প্রশ্নটি তাই সরল—একই কাণ্ড, একই স্টিং, একই তদন্ত—কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় বদলানোর পর কেন আইনি দৃশ্যপটও বদলে গেল?

নারদা স্টিংয়ে ক্যামেরার সামনে যে নগদ লেনদেন ধরা পড়েছিল

২০১৪ সালে সাংবাদিক ম্যাথিউ স্যামুয়েল একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠান ‘ইমপেক্স কনসালট্যান্সি সলিউশন্স’-এর প্রতিনিধি সেজে তৎকালীন তৃণমূল নেতা, মন্ত্রী ও সাংসদদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর হাতে ধারণ করা প্রায় ৫২ ঘণ্টার ভিডিওতে একাধিক নেতাকে নগদ অর্থ গ্রহণ করতে দেখা যায়। তালিকায় ছিলেন শুভেন্দু অধিকারীসহ তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা।

সুতরাং এখানে “ভিডিও আছে কি নেই”—সেটি কোনো বিতর্ক নয়। ভিডিওচিত্রে নগদ অর্থ গ্রহণের দৃশ্য আছে। পরবর্তীতে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্ত শুরু করে। সিবিআইয়ের প্রাথমিক অনুসন্ধানেও বলা হয়েছিল, অভিযুক্তদের কেউ নগদ অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছেন অথবা তাঁদের পক্ষে তা গ্রহণে সম্মতি জানিয়েছিলেন।

অবশ্য ভিডিওতে নগদ নেওয়ার দৃশ্য থাকা এবং আদালতে ফৌজদারি অপরাধের চূড়ান্ত দণ্ড—আইনের দৃষ্টিতে দুটি ভিন্ন স্তর। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে নারদা স্টিং যে তৎকালীন তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রতীকে পরিণত হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

নারদা নিয়ে নরেন্দ্র মোদী নিজেই কী বলেছিলেন?

২০১৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে নারদা ছিল বিজেপির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও একাধিক সভায় নারদা ও সারদাকে সামনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে আক্রমণ করেছিলেন। একটি জনসভায় তিনি বলেন, সারদায় দেখা মুখগুলোই নারদা টেপে দেখা যাচ্ছে এবং নারদায় দেখা মুখগুলোই কলকাতার বিবেকানন্দ রোড উড়ালপুল ধসের ঘটনাতেও দেখা যাচ্ছে। একই বক্তব্যে তিনি নারদাকে তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন।

অর্থাৎ নারদা তখন বিজেপির কাছে কোনো ছোটখাটো রাজনৈতিক অভিযোগ ছিল না। সেটি ছিল তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির একটি কেন্দ্রীয় নির্বাচনী অস্ত্র।

আর সেই প্রচারের কেন্দ্রে থাকা নেতাদের একজন ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী।

তারপর এল ২০২০—শুভেন্দুর দলবদল

শুভেন্দু অধিকারী ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। এর আগেই নারদা মামলায় তাঁর নাম সিবিআইয়ের এফআইআরে ছিল। ২০১৭ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পর সিবিআই তদন্ত শুরু করলে শুভেন্দু সেই তদন্তের আওতায় আসেন।

কিন্তু তাঁর বিজেপিতে যোগদানের পর ঘটে এমন একটি ঘটনা, যার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ আছে।

শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিজেপির অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল থেকে নারদা স্টিংয়ের সেই ভিডিও সরিয়ে দেওয়া হয়, যে ভিডিও দিয়ে বিজেপি একসময় তৃণমূল নেতাদের দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরেছিল। টেলিগ্রাফ জানায়, ভিডিওটি শুভেন্দুর বিজেপিতে যোগদানের পরপরই সরানো হয়েছিল। কেন সরানো হয়েছে, সেই সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে—তা স্পষ্ট করা হয়নি। এমনকি এক বিজেপি সূত্র সংবাদপত্রটিকে বলেছিল, ভিডিও রাখার আর কী প্রয়োজন, শুভেন্দুই তো দলের ‘বড় ক্যাচ’।

এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।

একদিকে পুরোনো ভিডিওতে শুভেন্দুকে ঘুষ নেওয়ার দৃশ্যে দেখানো হচ্ছে, অন্যদিকে তিনি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর সেই ভিডিওই বিজেপির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।

দুই ঘটনার মাঝখানে সময়ের ব্যবধান—মাত্র এক দিন।

২০২১: চারজন গ্রেপ্তার, শুভেন্দু কেন বাইরে?

২০২১ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল আবার ক্ষমতায় ফেরার পরপরই সিবিআই নারদা মামলায় ফিরহাদ হাকিম, সুব্রত মুখোপাধ্যায়, মদন মিত্র ও শোভন চট্টোপাধ্যায়কে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হয়।

কিন্তু একই মামলায় ২০১৭ সালের সিবিআই এফআইআরে নাম থাকা দুই বিজেপি নেতা—শুভেন্দু অধিকারী ও মুকুল রায়—চার্জশিটে ছিলেন না। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, সিবিআই চার্জশিটে বলেছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে আরও তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়া যায়নি এবং বাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছিল।

এখানে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ।

সিবিআই তাঁদের ‘ক্লিন চিট’ দিয়েছে—এমন কথাও চার্জশিটে বলা হয়নি।

বরং সংস্থাটি অবশিষ্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও তদন্তের জন্য অনুমতি চেয়েছিল। অন্য কথায়, নাম বাদ পড়ার কারণ হিসেবে আইনি অনুমোদনের বিষয়টি সামনে এসেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন তখনও থেকে যায়—

তাহলে একই মামলায় তৃণমূলের নেতাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও চার্জশিট হলো, আর বিজেপিতে যাওয়া শুভেন্দু ও মুকুলের ক্ষেত্রে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ দৃশ্যমানভাবে আটকে গেল কেন?

এই প্রশ্ন তখন তৃণমূলই শুধু করেনি। নারদা স্টিংয়ের সাংবাদিক ম্যাথিউ স্যামুয়েলও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছিলেন—শুভেন্দুকে কেন গ্রেপ্তার করা হলো না।

আইনি অনুমোদন—নাকি রাজনৈতিক সুবিধা?

এখানেই ‘ওয়াশিং মেশিন’ বিতর্কের মূল জায়গা।

সিবিআইয়ের বক্তব্য ছিল, শুভেন্দু ও মুকুল রায় স্টিংয়ের সময় সাংসদ ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে বিচার চালাতে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রশ্ন ছিল। এই বক্তব্য আইনগতভাবে একটি বাস্তব বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের সংসদীয় ও তদন্ত কাঠামোর একটি অস্বস্তিকর দিকও এতে সামনে আসে—একজন রাজনৈতিক নেতা পদ ও দল বদলানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের আইনি পথও যদি ভিন্ন হয়ে যায়, তাহলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই দ্বৈত মানদণ্ডের প্রশ্ন তুলবে।

২০২২ সালে ভারতের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে নারদা মামলার প্রসঙ্গে বলা হয়, শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়নি কারণ তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় অনুমোদন তখনো পাওয়া যায়নি; একই লেখায় কেন্দ্রীয় তদন্তে রাজনৈতিক পক্ষপাত নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগও আলোচিত হয়।

অর্থাৎ এখানে প্রশ্নটি নিছক রাজনৈতিক স্লোগান নয়; আইনি অনুমোদনের কাঠামো কীভাবে রাজনৈতিক মামলার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে, সেটিও বাস্তব আলোচনার বিষয়।

বিজেপির পুরোনো ভিডিওই যখন নিজের হাতে মুছে যায়

এই ঘটনাটি পুরো বিতর্ককে আরও তীব্র করে।

২০২০ সালে শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দেওয়ার আগে বিজেপির নিজস্ব প্রচারে নারদা ছিল তৃণমূলের দুর্নীতির অন্যতম বড় প্রতীক। দলটি ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগে নারদা ভিডিও প্রকাশ্যে সামনে এনেছিল। কিন্তু শুভেন্দু বিজেপিতে যোগদানের পর বিজেপির নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেল থেকে সেই ভিডিও সরিয়ে দেওয়া হয়।

অর্থাৎ রাজনৈতিক সমীকরণ বদলেছে এবং একই ভিডিওর রাজনৈতিক ব্যবহারও বদলে গেছে।

একসময় যে ভিডিও ছিল “তৃণমূলের দুর্নীতির প্রমাণ”, দলবদলের পরে সেই ভিডিও আর বিজেপির জন্য প্রচারের উপযোগী থাকল না—এমনটাই অন্তত ঘটনাপ্রবাহ থেকে দেখা যায়।

এখানেই ‘ওয়াশিং মেশিন’ শব্দটির রাজনৈতিক শক্তি।

‘সাত খুন মাফ’—আইনের ভাষা নয়, কিন্তু প্রশ্নটি বাস্তব

রাজনৈতিক ভাষায় বলা হয়—“বিজেপিতে যোগ দিলেই সাত খুন মাফ।”

আইনের ভাষায় এ ধরনের কোনো বিধান নেই। বিজেপিতে যোগ দিলেই মামলা বাতিল হয় না, আদালত কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্দোষ ঘোষণা করে না।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।

একজন নেতার দলবদলের আগে তদন্ত যতটা দৃশ্যমান ও সক্রিয় ছিল, দলবদলের পর সেটি কি একইভাবে চলেছে?

শুভেন্দুর ঘটনায় সময়ের ধারাবাহিকতা নিজেই প্রশ্ন তৈরি করে—

২০১৬ — নারদা ভিডিওতে নগদ গ্রহণের দৃশ্য।

২০১৭ — সিবিআই এফআইআরে নাম।

২০২০ — বিজেপিতে যোগদান।

তার পরদিন — বিজেপির ইউটিউব চ্যানেল থেকে নারদা ভিডিও অপসারণ।

২০২১ — একই মামলায় তৃণমূলের চার নেতাকে গ্রেপ্তার ও চার্জশিট।

২০২১ — এফআইআরে নাম থাকা শুভেন্দু ও মুকুল চার্জশিটের বাইরে।

এই ধারাবাহিকতা রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার যথেষ্ট উপাদান তৈরি করে। তবে কোন সিদ্ধান্তটি প্রশাসনিক, কোনটি আইনি বাধ্যবাধকতা এবং কোনটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—সেটি নির্দিষ্ট নথি দিয়ে আলাদা করা প্রয়োজন।

হিমন্ত বিশ্ব শর্মা: ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্বের আরেক আলোচিত নাম, কিন্তু ঘটনাটি আলাদা

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নামও এই বিতর্কে বারবার আসে। কংগ্রেসে থাকার সময় সারদা চিটফান্ড মামলায় তাঁর বাড়ি ও তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে যুক্ত টেলিভিশন চ্যানেলে সিবিআই তল্লাশি চালিয়েছিল এবং তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। পরে ২০১৫ সালে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।

তবে হিমন্তের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। তিনি নিজে বলেছিলেন, সিবিআই তাঁকে অভিযুক্ত নয়, সাক্ষী হিসেবে দেখেছে। পরে সিবিআই-সূত্রভিত্তিক সংবাদেও তাঁর বিরুদ্ধে আর্থিক সুবিধা পাওয়ার প্রমাণ না পাওয়ার কথা প্রকাশিত হয়েছিল।

তাই হিমন্তের ঘটনাকে শুভেন্দুর নারদা মামলার সঙ্গে হুবহু এক করে দেখা ঠিক হবে না।

কিন্তু বৃহত্তর প্রশ্নটি একই—

কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে থাকা কোনো নেতা বিজেপিতে যাওয়ার পর তাঁর মামলার গতি কীভাবে বদলায়?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রয়োজন একই মাপকাঠিতে সব মামলা পরীক্ষা করা।

২৫ নেতার অনুসন্ধান: কেবল শুভেন্দু নন

২০২৪ সালে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২০১৪ সালের পর কেন্দ্রীয় সংস্থার দুর্নীতি-সংক্রান্ত তদন্তের মুখে থাকা ২৫ জন গুরুত্বপূর্ণ বিরোধী নেতার দলবদলের ঘটনা বিশ্লেষণ করে। পত্রিকাটির অনুসন্ধান অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ২৩ জন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর তদন্তে হয় স্থবিরতা এসেছে, নয়তো উল্লেখযোগ্য ছাড় মিলেছে; কিছু মামলা আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধও হয়েছে।

এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে ২৩ জনই অপরাধী ছিলেন এবং বিজেপিতে গিয়ে সবাইকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করা হয়েছে। কিন্তু এটুকু অবশ্যই বলা যায়—দলবদল ও তদন্তের গতির মধ্যে এমন একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক পাওয়া গেছে, যা রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধানের দাবি রাখে।

কারণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শুধু মামলা শুরু হওয়াই গুরুত্বপূর্ণ নয়; একই ধরনের অভিযোগে একই ধরনের আইনি পদক্ষেপ হচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রশ্নটি আসলে সিবিআই বা ইডির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে

এই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে বড় ক্ষতি রাজনৈতিক দলগুলোর নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার।

কোনো বিরোধী নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত হলে সাধারণ মানুষ যদি ভাবেন—দল বদলালে মামলা থেমে যাবে, তাহলে তদন্তকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

আবার বিজেপির কোনো নেতার বিরুদ্ধে মামলা হলে যদি বিরোধীরা ধরে নেন যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই তদন্ত হচ্ছে, তাহলেও একই সমস্যা।

তাই এই প্রশ্নের স্থায়ী সমাধান কোনো দলের প্রচার দিয়ে হবে না। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, প্রকাশ্য মামলার অগ্রগতি এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই আইনি মানদণ্ড।

নরেন্দ্র মোদীর পুরোনো বক্তব্যের সামনে ২০২৬-এর বাস্তবতা

২০১৬ সালের প্রচারে নরেন্দ্র মোদী যে নারদা ও সারদাকে তৃণমূল সরকারের দুর্নীতির প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন, সেই সময় শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন সেই তৃণমূলেরই অন্যতম নেতা।

ছয়-সাত বছর পর সেই একই শুভেন্দু অধিকারী বিজেপির হয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হন। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করে এবং শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

অতএব রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে তীব্র বৈপরীত্যটি এখানেই—

যে দল একসময় নারদার ভিডিও হাতে নিয়ে তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসভা করেছিল, সেই দলই পরে সেই ভিডিওতে থাকা একজন নেতাকে নিজেদের দলে নেয়; আর সেই নেতাই শেষ পর্যন্ত রাজ্যের ক্ষমতার শীর্ষে উঠে যান।

এই ঘটনাপ্রবাহই ‘ওয়াশিং মেশিন’ বিতর্ককে এত শক্তিশালী করেছে।

তদন্ত থেমেছে—এ কথা বলার আগে যে প্রশ্নের উত্তর দরকার

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, “শুভেন্দু বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন, তাই তাঁর মামলা বন্ধ হয়েছে”—এই বাক্যটি সরাসরি কারণ-সম্পর্ক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও নির্দিষ্ট নথি দরকার।

কিন্তু তার মানে এই নয় যে প্রশ্ন করার মতো কিছু নেই।

বরং প্রশ্নগুলো আরও ধারালো:

শুভেন্দুর নাম সিবিআই এফআইআরে ছিল—তারপর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়েছিল?

যে চারজনের বিরুদ্ধে দ্রুত গ্রেপ্তার ও চার্জশিট হলো, তাঁদের সঙ্গে শুভেন্দুর তদন্তগত অবস্থানের পার্থক্য কোথায়?

প্রয়োজনীয় অনুমোদন কেন পাওয়া গেল না এবং সেটি পেতে পরবর্তীতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল?

বিজেপিতে যোগ দেওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নারদা ভিডিও সরানোর সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিল?

বিজেপি কেন প্রকাশ্যে ওই অপসারণের ব্যাখ্যা দেয়নি?

২০১৬ সালে যে ভিডিওকে দুর্নীতির রাজনৈতিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, ২০২০-এর পরে সেটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেল কেন?

এগুলোই সেই প্রশ্ন, যেগুলো উত্তরহীন থাকলে ‘ওয়াশিং মেশিন’ তত্ত্ব বারবার ফিরে আসবে।

টুডে টিভি বিডির বিশ্লেষণ

নারদা স্টিংকে নিয়ে আজ একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই—শুভেন্দু অধিকারী ওই ভিডিওতে নগদ অর্থ গ্রহণের দৃশ্যে দেখা গিয়েছিলেন; ২০১৭ সালের সিবিআই এফআইআরে তাঁর নাম ছিল; তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত হয়েছিল; এরপর তিনি বিজেপিতে যোগ দেন; যোগদানের পরপরই বিজেপির নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম থেকে নারদা ভিডিও সরানো হয়; আর ২০২১ সালে একই মামলায় তৃণমূলের চার নেতার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও চার্জশিট হলেও শুভেন্দু ও মুকুল রায় চার্জশিটে ছিলেন না।

এই ঘটনাগুলো আলাদা আলাদা সত্য। এগুলো একত্রে দেখলে রাজনৈতিক পক্ষপাত, দ্বৈত মানদণ্ড এবং তদন্তকারী সংস্থার ব্যবহারের অভিযোগ কেন এত জোরালো হয়েছে, তার একটি বাস্তব ভিত্তি বোঝা যায়।

তবে সবচেয়ে শক্তিশালী সাংবাদিকতা হবে এখানেই থেমে না গিয়ে নথি চাওয়া—চার্জশিট, অনুমোদনের আবেদন, তদন্তের নথি, আদালতের আদেশ এবং তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপ।

কারণ গণতন্ত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তখনই তৈরি হয়, যখন জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে—

অপরাধের বিচার নয়, রাজনৈতিক পরিচয়ই ঠিক করে দেবে তদন্তের গতি।

শুভেন্দু অধিকারীর নারদা অধ্যায় সেই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নগুলোর একটি।

আর আজকের প্রশ্নটি তাই শুধু শুভেন্দু অধিকারীকে নিয়ে নয়।

আগামীকাল কোনো বিরোধী নেতা বিজেপিতে যোগ দিলে তাঁর পুরোনো দুর্নীতির মামলার তদন্ত কি একই গতিতে চলবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বিজেপিকে নয়—সিবিআই, ইডি, আদালত এবং ভারতের গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেই দিতে হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দ্য টেলিগ্রাফ, এনডিটিভি, ইন্ডিয়া টুডে, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, স্ক্রল এবং প্রকাশ্য সিবিআই-আদালত-সংশ্লিষ্ট নথি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments