ডেস্ক রিপোর্ট | TODAY TV BD
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত নতুন এক বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে মার্কিন সেনাদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে দীর্ঘদিনের জল্পনার অবসান ঘটিয়ে এবার প্রথমবারের মতো পেন্টাগন স্বীকার করেছে, গত দুই সপ্তাহে ইরানের হামলায় প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। একই সময়ে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাও নিশ্চিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই স্বীকারোক্তি এমন সময় এলো, যখন দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন সংকটে পড়েছে। (Reuters)
পেন্টাগনের স্বীকারোক্তি
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল জানান, ৭ জুলাই থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সেনা মাথায় আঘাত বা কনকাশনের মতো তুলনামূলক হালকা ধরনের চোট পেয়েছেন এবং আহতদের প্রায় ৯৬ শতাংশ ইতোমধ্যে আবার দায়িত্বে ফিরেছেন। এই তথ্য প্রকাশ করা হয় এমন এক প্রতিবেদনের পর, যেখানে অভিযোগ ওঠে যে মার্কিন প্রশাসন যুদ্ধক্ষেত্রে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে। পার্নেল অবশ্য সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। (The Guardian)
নিহত সেনার সংখ্যা বাড়ছে
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে, জর্ডান ও ইরাকে সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যে কোনো মার্কিন সেনা নিহত হলে ইরানকে “বহুগুণ মূল্য” দিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের কঠোর প্রতিক্রিয়ার নির্দেশ দেওয়ার কথাও জানান। (Reuters)
যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, তারা টানা দশম দিনের মতো ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলোতে বিমান হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুগুলোর মধ্যে ছিল কেশম দ্বীপ, বন্দর আব্বাসের আশপাশের সামরিক ঘাঁটি, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌ সক্ষমতা এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC)-সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা। (Reuters)
ইরানের পাল্টা আঘাত
অন্যদিকে ইরান জানিয়েছে, তারা বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) দাবি করেছে, কিছু অভিযানে মার্কিন রাডার ও সামরিক অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব দাবির স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি। (Reuters)
হরমুজ প্রণালিতে নতুন সংকট
সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হরমুজ প্রণালিতে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং কয়েকটি ট্যাংকার হামলার শিকার হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে নতুন অবরোধের হুমকি দিয়েছে, যা সংকটকে আরও বিস্তৃত আকার দিতে পারে। (Reuters)
কূটনীতির দরজা কি এখনও খোলা?
হোয়াইট হাউস একদিকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও অন্যদিকে বলছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো কূটনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তবে প্রতিদিনের হামলা–পাল্টা হামলা এবং উভয় পক্ষের কঠোর বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। (AP News)
বিশ্লেষণ
প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসা যুদ্ধের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। যদিও পেন্টাগন বলছে অধিকাংশ সেনা আবার দায়িত্বে ফিরেছেন, তবুও এটি দেখায় যে ইরানের পাল্টা হামলা যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোকে উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির অস্থিতিশীলতা শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে, সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক লড়াইও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে।



