Homeটুডে ওয়ার্ল্ডবারুইপুরে এনকাউন্টারে অভিযুক্তের মৃত্যু: ‘যা করেছে, তার ফল পেয়েছে’—ছেলের মরদেহ নিতেও অস্বীকৃতি...

বারুইপুরে এনকাউন্টারে অভিযুক্তের মৃত্যু: ‘যা করেছে, তার ফল পেয়েছে’—ছেলের মরদেহ নিতেও অস্বীকৃতি মায়ের

ঘটনার পুনর্নির্মাণে নিয়ে গেলে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা—দাবি পুলিশের; মানবাধিকার প্রশ্নেও নতুন বিতর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ৮ জুলাই ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার মামলার অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে ঘটনাস্থলে পুনর্নির্মাণ (ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন) চলাকালে তিনি পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালান বলে দাবি করেছে পুলিশ। পাল্টা গুলিতে আহত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তবে ঘটনাটির পর সবচেয়ে আলোচিত হয়ে উঠেছে অভিযুক্তের মা সন্ধ্যা মণ্ডলের প্রতিক্রিয়া। তিনি ছেলের মরদেহ গ্রহণ করতেও অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেছেন, “ও যা করেছে, তার ফল পেয়েছে। একটা মেয়েকে কষ্ট দিয়ে মেরেছে, ও সেই শাস্তিই পেয়েছে। আমি ওর মুখও দেখতে চাই না।”


🔴 এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে

  • শনিবার (৪ জুলাই) বারুইপুরের সূর্যপুর এলাকা থেকে ১২ বছরের এক কিশোরী নিখোঁজ হয়।
  • পরদিন একটি পুকুর থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
  • তদন্তে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
  • গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—প্রভাস মণ্ডল, আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দার ও কবীর মোল্লা।
  • মঙ্গলবার রাতে প্রভাসকে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে পুনর্নির্মাণের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
  • পুলিশের দাবি, অভিযুক্ত অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়।

পুলিশের দাবি কী?

পুলিশ জানিয়েছে, রাত প্রায় ১২টা ৪৫ মিনিটে প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া হয়েছিল।

সেখানে তিনি হঠাৎ একজন পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি এক রাউন্ড গুলিও ছোড়েন।

এরপর আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালায় পুলিশ।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে বারুইপুর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এই ঘটনার স্বাধীন তদন্তের বিষয়ে পুলিশ এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি।


মায়ের প্রতিক্রিয়া: “ওর দেহও আনব না”

বুধবার সকালে পুলিশ প্রভাসের বাড়িতে গিয়ে মৃত্যুর খবর জানায়।

এরপর সংবাদমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত আবেগঘন প্রতিক্রিয়া জানান তার মা সন্ধ্যা মণ্ডল।

তিনি বলেন,

“ও যেরকম দুষ্কর্ম করেছে, তার ফল পেয়েছে। একটা মেয়েকে কষ্ট দিয়ে মেরেছে। আমি ওর দেহ আনতে যাব না। ওর মুখও দেখতে চাই না।”

তিনি আরও জানান,

“মায়ের কথা শুনত না। নেশা করত। এখন আমার আর কোনো কষ্ট নেই।”

প্রভাসের পরিচয়পত্র চাইলেও তিনি পুলিশকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, পরিবারের কেউ মরদেহ গ্রহণ করতে যাবে না।


কীভাবে সামনে আসে এই মামলা?

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী—

নিখোঁজ হওয়ার পর কিশোরীকে স্থানীয় একটি ঝুপড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে অভিযুক্তরা তার ওপর যৌন নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ।

পরবর্তীতে সে অচেতন হয়ে পড়লে বস্তায় ভরে পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেওয়া হয়।

প্রভাস মণ্ডলকে গ্রেপ্তারের পর তার দেখানো স্থান থেকেই কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে তদন্তকারীরা।


এলাকায় উত্তেজনা

কিশোরীর মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই বারুইপুরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

  • রাস্তা অবরোধ করা হয়।
  • রেল চলাচল ব্যাহত হয়।
  • পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
  • এক সন্দেহভাজনকে গণপিটুনিতে হত্যা করে উত্তেজিত জনতা।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়।


তদন্ত কোথায় দাঁড়িয়ে?

পুলিশ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • ধর্ষণ ও হত্যা
  • গণপিটুনিতে মৃত্যু
  • পুলিশকে বাধা দেওয়া
  • সরকারি কাজে বাধা
  • রেল অবরোধ

তদন্ত এখনও চলছে।


❓ যেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি

  • প্রভাস সত্যিই পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন কি না—তার স্বাধীন প্রমাণ কী?
  • ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি বা বডি-ক্যামেরা ফুটেজ রয়েছে কি?
  • এনকাউন্টারটি ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনা হবে কি?
  • অভিযুক্তের মৃত্যুর পর মূল মামলার বিচারপ্রক্রিয়ায় এর কী প্রভাব পড়বে?

⚖️ আইনি ও মানবাধিকার প্রেক্ষাপট

ভারতে পুলিশের তথাকথিত “এনকাউন্টার” বা বন্দুকযুদ্ধে অভিযুক্তের মৃত্যুর ঘটনা অতীতেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

আইন অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে কারও মৃত্যু হলে সাধারণত স্বাধীন তদন্ত এবং ম্যাজিস্ট্রেট পর্যায়ের অনুসন্ধানের বিধান রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ধরনের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়ে থাকে।

অন্যদিকে, বারুইপুরের নৃশংস ধর্ষণ-হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ অভিযুক্তদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে আসছেন।


কেন এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ

বারুইপুরের এই ঘটনা শুধু একটি ভয়াবহ ধর্ষণ-হত্যা মামলাই নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা, জনরোষ, পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ—এই চারটি স্পর্শকাতর প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

একদিকে নাবালিকার পরিবারের জন্য দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির দাবি জোরালো হচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশের অভিযানের বৈধতা ও জবাবদিহি নিয়েও নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, টিভি৯ বাংলা, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ সূত্র।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments