Homeটুডে ওয়ার্ল্ডফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সফরের মধ্যেই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল দামেস্ক, লক্ষ্য কি ছিল...

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর সফরের মধ্যেই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল দামেস্ক, লক্ষ্য কি ছিল তাঁর বহর?

ফোর সিজনস হোটেলের কাছে পরপর দুই বিস্ফোরণ; আহত অন্তত ১৮, নিরাপত্তা ঘাটতির আশঙ্কা বিশ্লেষকদের। তবে ম্যাক্রোঁ নিরাপদে রাষ্ট্রপতি ভবনে বৈঠক চালিয়ে যান।

দামেস্ক | ৭ জুলাই ২০২৬

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফরের মধ্যেই পরপর দুটি শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ফোর সিজনস হোটেলের কাছে মঙ্গলবার বিস্ফোরণ দুটি ঘটে। এর কিছুক্ষণ আগেই প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ওই হোটেল থেকে বের হয়ে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট প্যালেসে রওনা দিয়েছিলেন।

ঘটনার পরপরই বিস্ফোরণস্থল থেকে কালো ধোঁয়া আকাশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক অ্যাম্বুলেন্স ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিস্ফোরণে অন্তত ১৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চারজন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

কী ঘটেছে?

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম বিস্ফোরণটি ঘটে ফোর সিজনস হোটেলের পাশের একটি ব্যস্ত এলাকায়। এর কয়েক সেকেন্ড পরই কাছাকাছি আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আগুন, ধোঁয়া এবং একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনী সন্দেহজনক বিস্ফোরক শনাক্ত করে তা নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করছিল। সেই সময় বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে এবং কারা এর পেছনে রয়েছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ম্যাক্রোঁ কি লক্ষ্যবস্তু ছিলেন?

এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন হামলার দায় স্বীকার করেনি।

তবে রয়টার্স, এএফপি এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ধারণা, বিস্ফোরণগুলোর সময় ও স্থান বিবেচনায় ফরাসি প্রেসিডেন্টের বহরই সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিস্ফোরকগুলো সম্ভবত আগের রাতেই সড়কের পাশে পেতে রাখা হয়েছিল এবং প্রেসিডেন্টের গাড়িবহর যাওয়ার সময় বিস্ফোরণের পরিকল্পনা ছিল। তবে সিরিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, বিস্ফোরণ ম্যাক্রোঁর নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে ঘটেছে এবং তাঁর সফরসূচি বা নিরাপত্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়েনি।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ও জানিয়েছে, ম্যাক্রোঁ বিস্ফোরণের শব্দ পর্যন্ত শোনেননি। তিনি নিরাপদে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে পৌঁছে নির্ধারিত বৈঠক চালিয়ে যান।

কেন এই সফর এত গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৪ সালে বাশার আল-আসাদের পতনের পর এটিই কোনো পশ্চিম ইউরোপীয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম সিরিয়া সফর।

বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ম্যাক্রোঁর এই সফরকে সিরিয়ার আন্তর্জাতিক পুনর্বাসনের একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

সফরের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—

  • যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনর্গঠন,
  • অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাত পুনরুদ্ধার,
  • জ্বালানি ও পরিবহন খাতে বিনিয়োগ,
  • ফরাসি কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ,
  • ইউরোপ-সিরিয়া সম্পর্ক পুনঃস্থাপন।

সফর চলাকালে ফরাসি শিপিং কোম্পানি CMA CGM-এর সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের ঘোষণা এবং সিরিয়ার জন্য জব্দ করা প্রায় ৫১ মিলিয়ন ইউরো ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন

ঘটনার পর সিরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, যদি সত্যিই বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের সফরের সময় বিস্ফোরক পেতে রাখা হয়ে থাকে, তাহলে এটি সিরিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে সিরিয়ার সরকার বলছে, এটি দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল দেখানোর একটি অপচেষ্টা হতে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে বিস্ফোরণের ঘটনা

মাত্র কয়েকদিন আগেই দামেস্কে বিচার মন্ত্রণালয়ের কাছের একটি ক্যাফেতে বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন নিহত এবং আরও বহু মানুষ আহত হয়েছিলেন।

ফলে মঙ্গলবারের বিস্ফোরণকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও সিরিয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি।

সফর অব্যাহত রাখার ঘোষণা

বিস্ফোরণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন,

“কোনো কিছুই সিরিয়ার জনগণের স্বাধীন, নিরাপদ, সার্বভৌম ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে বসবাসের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।”

তিনি আরও জানান, “আমার সফর অব্যাহত থাকবে।”

তাৎপর্য

বিশ্লেষকদের মতে, বিস্ফোরণের ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে সফর ব্যাহত না হলেও এটি স্পষ্ট করেছে যে, দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করা সিরিয়ায় এখনো নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। একই সঙ্গে এই ঘটনা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, রয়টার্স, এএফপি, সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments