Homeটুডে ওয়ার্ল্ডতৃণমূলে অভ্যুত্থান: মমতা-অভিষেকের অপসারণ, ঋতব্রতদের দখলে নতুন কমিটি — এক ভাঙনের ভেতর-বাহির

তৃণমূলে অভ্যুত্থান: মমতা-অভিষেকের অপসারণ, ঋতব্রতদের দখলে নতুন কমিটি — এক ভাঙনের ভেতর-বাহির

বিশেষ বিশ্লেষণী প্রতিবেদন | ২৪ জুন ২০২৬
ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে বিরল এক নাটকীয়তার সাক্ষী হয়ে রইল সোমবারের কলকাতা। একদা বাংলার রাজনীতির অবিসংবাদী ‘দিদি’ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর নিজেরই প্রতিষ্ঠিত দলের চেয়ারম্যান পদ থেকে ‘অপসারিত’ করার দাবি করল বিদ্রোহী বিধায়কদের একটি বড় অংশ। শুধু মমতা নন, সরিয়ে দেওয়া হলো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কেও। তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন চেয়ারম্যান হলেন হাওড়ার বিধায়ক অরূপ রায়। এই ঘটনা নিছক একটি দলীয় কোন্দল নয়; এটি গত কয়েক মাস ধরে তৃণমূলের অন্দরে জমে থাকা ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ, যার পেছনে রয়েছে বিধানসভা নির্বাচনের ভরাডুবি, সই-জালিয়াতির অভিযোগ এবং শীর্ষ নেতৃত্বের একগুঁয়ে মনোভাবের অভিযোগ। এই প্রতিবেদনে পুরো ঘটনার রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও আইনি মাত্রাগুলো বিশ্লেষণ করা হলো।


🔥 পটভূমি: সইকাণ্ড থেকে সিংহাসনের লড়াই

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ভরাডুবির পর থেকেই দলের ভেতরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। প্রথম বড় ফাটল ধরে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ ওঠে, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিধানসভার স্পিকার বীরেন্দ্র বসুর কাছে বিধায়কদের স্বাক্ষর-সংবলিত একটি চিঠি জমা দেন, যেখানে একাধিক বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়েছে বলে দাবি করেন উলুবেড়িয়া উত্তরের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দ্রুতই তৃণমূলের বিধায়কদের একটি বড় অংশ বিদ্রোহী শিবিরে চলে যায়। প্রথম দফায় ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন নিয়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা ঘোষণা করা হয়।

এরপর বিদ্রোহের আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শুধু পরিষদীয় দলেই নয়, সংসদীয় দলেও ভাঙন ধরে। একযোগে তৃণমূলের ২০ জন লোকসভা সাংসদ দল ছেড়ে ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দলে যোগ দেন। রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় ও সুস্মিতা দেবেরা পদত্যাগ করেন। রাজ্যের নিচুতলার সংগঠনেও তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। এই ক্রমাগত ভাঙনের মধ্যেই প্রশ্ন ওঠে: আসল তৃণমূল কোনটি? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকা সাংগঠনিক কাঠামো, নাকি ঋতব্রতদের নেতৃত্বাধীন পরিষদীয় দল?


📜 ২২ জুনের বৈঠক: যে নাটকে বদলে গেল ইতিহাস

সোমবার (২২ জুন) বিধানসভার বাজেট অধিবেশন শেষে নিউ টাউনের এক বিলাসবহুল হোটেলে জড়ো হন তৃণমূলের ৬০ জন বিধায়ক ও কলকাতার প্রায় ৭০ জন প্রাক্তন কাউন্সিলর। বিদ্রোহী শিবিরের নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকে তোলা হয় সাংগঠনিক পুনর্গঠনের প্রস্তাব।

বৈঠকের শুরুতে ঋতব্রত তৃণমূলের দলীয় সংবিধানের ২০ নম্বর ধারা উদ্ধৃত করে ব্যাখ্যা করেন, প্রতি তিন বছর অন্তর দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠক বাধ্যতামূলক হলেও ২০২২ সালের পর তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘদিন সংবিধান লঙ্ঘিত হওয়ায় আগের জাতীয় কর্মসমিতিকে ‘বিলুপ্ত’ ঘোষণা করে নতুন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে সেই প্রস্তাব পাস হয় এবং নিম্নোক্ত নেতৃত্ব নির্ধারিত হয়:

পদনাম
চেয়ারম্যানঅরূপ রায় (হাওড়া মধ্য বিধায়ক)
সহ-সভাপতিঅরূপ বিশ্বাস, ফিরহাদ হাকিম, রথীন ঘোষ, সাবিনা ইয়াসমিন
সাধারণ সম্পাদকঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা
কোষাধ্যক্ষআখরুজ্জামান আনসারি

উল্লেখ্য, বৈঠকে টাঙানো ব্যানারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনো ছবি ছিল না। পরিবর্তে রাখা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধী, বি আর আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের ছবি — যা নিছক মঞ্চসজ্জা নয়, বরং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা: ‘এটাই এখন আসল তৃণমূল, যেখানে ব্যক্তিপূজা বনাম আদর্শের রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে।’

একই বৈঠকে হাজির ছিলেন মমতা অনুমোদিত তৃণমূলের নতুন রাজ্য সভাপতি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পুত্র সৌরভ বসু, যিনি কলকাতা পুরসভার ৮৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। তাঁর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, বিদ্রোহী শিবিরের আকর্ষণ শুধু বিধায়কদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তা ঢুকে পড়েছে পুর-কাঠামোতেও।


🛡️ মমতা শিবিরের প্রতিক্রিয়া: ‘এটা করার এখতিয়ার ওঁদের নেই’

বিদ্রোহীদের এই বৈঠক ও নতুন কমিটির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রতিক্রিয়া আসে মমতা-ঘনিষ্ঠ মহল থেকে। কালীঘাটে মমতার বাসভবন থেকে বৈঠক সেরে বেরিয়ে বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “তৃণমূল আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সমার্থক। আমাদের দলের যা কাঠামো, তাতে এগুলি করার এক্তিয়ার ওঁদের (বিদ্রোহী) নেই।”

কুণাল ঘোষের এই মন্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়। প্রথমত, মমতা শিবির বিদ্রোহীদের দলের ‘অংশ’ হিসেবেই মানতে রাজি নয়; তারা পুরো প্রক্রিয়াটিকে ‘অসাংবিধানিক’ ও ‘ক্ষমতাবহির্ভূত’ বলে অভিহিত করছে। দ্বিতীয়ত, মমতা এখনও নিজেকে তৃণমূলের একচ্ছত্র নেত্রী হিসেবেই ভাবছেন — ‘তৃণমূল মানেই মমতা’ এই সমীকরণেই তারা আস্থাবদ্ধ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন একই দলের ৬০ জন বিধায়ক (যাঁরা মূল দলীয় টিকিটে নির্বাচিত) আলাদা বৈঠকে বসেন, ফিরহাদ হাকিমের মতো একদা ‘মমতা-ঘনিষ্ঠ’ নেতাও যখন নতুন কমিটির সহ-সভাপতি হন, তখন সেই দাবির রাজনৈতিক ওজন কতটুকু? আইনগতভাবে না হলেও রাজনৈতিক বৈধতার লড়াইটা এখন রীতিমতো জমাটি হয়েছে।


⚖️ সাংবিধানিক যুক্তি বনাম বাস্তব রাজনীতি

বিদ্রোহী শিবির যে ‘সংবিধানের ২০ নম্বর ধারা’ উদ্ধৃত করে তিন বছর অন্তর কমিটি গঠনের কথা বলেছে, তা আইনিভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতীয় দলীয় আইন ও নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক কাঠামো বজায় রাখতে হয়। তৃণমূল যদি সত্যিই ২০২২ সালের পর কোনো জাতীয় কর্মসমিতি বৈঠক না করে থাকে, তাহলে তা নির্বাচন কমিশনের কাছে আপত্তিকর হতে পারে। বিদ্রোহীরা সেই ‘সুপ্ত’ নিয়মকেই হাতিয়ার করে আগের কমিটি বাতিলের যুক্তি দিয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, দলীয় সংবিধানের লঙ্ঘন প্রমাণ করতে গেলে আইনি লড়াই দীর্ঘস্থায়ী হবে। নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটাই চূড়ান্ত আইনি বৈধতা নির্ধারণ করবে। এখনো পর্যন্ত দলের প্রতীক, নাম ও নির্বাচনী কর্তৃত্ব মমতার নেতৃত্বাধীন ‘পুরোনো’ কমিটির কাছেই আছে। ফলে ঋতব্রতদের এই ‘অভ্যুত্থান’ আপাতত রাজনৈতিক প্রতীকীবাদের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ — যদি না তারা নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি আদায় করতে পারেন।


🔍 ভেতরের গল্প: এই বিদ্রোহ কেবল ‘সইকাণ্ড’ নয়

এই বিদ্রোহকে শুধু পরিষদীয় পদ-পদবির বিবাদ বলে উড়িয়ে দিলে ভুল হবে। এর পেছনে তৃণমূলের জমে থাকা কয়েকটি বড় সাংগঠনিক সংকট কাজ করছে:

১. নির্বাচনে ভরাডুবির দায়: টানা তৃতীয়বার ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই দলের তৃণমূল পর্যায়ে মমতা ও অভিষেকের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। কুণাল ঘোষ ও ফিরহাদ হাকিমের মতো নেতারা প্রকাশ্যে দায় নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলেন। বিদ্রোহী শিবির সেটিকেই কাজে লাগিয়ে সাংগঠনিক ব্যর্থতার জন্য অভিষেক-মমতার নেতৃত্বকেই দায়ী করছে।

২. অভিষেকের এককেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ: অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগত ‘পরামর্শদাতা’ গোষ্ঠী দলের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে — এই অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফিরহাদের মতো পুরনো নেতারাও এই ‘নয়া প্রজন্মের’ কৌশলে অস্বস্তিতে ছিলেন। বিদ্রোহ তাই অভিষেক-বিরোধিতারও বহিঃপ্রকাশ।

৩. মমতার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা: তৃণমূলের জন্ম থেকেই মমতা দলের প্রতীক। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দৈনন্দিন সক্রিয়তা কমেছে, অথচ উত্তরসূরি প্রশ্নে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। অভিষেককে ঘিরে অস্বস্তি ও মমতার প্রতি আনুগত্যের দ্বন্দ্বই এই ভাঙনের গতি বাড়িয়েছে।

৪. বিধায়কদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ: ৬০ জন বিধায়ক যে বিদ্রোহে শামিল হয়েছেন, তার পেছনে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাঁচানোর তাড়নাও আছে। তৃণমূল ক্ষমতায় না থাকায় অনেকেরই নির্বাচনী এলাকায় টিকে থাকার চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে তারা নিজেদের পুনর্বাসনের পথ খুঁজছেন।


🧭 সম্মুখের পথ: যা হতে পারে

এই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক পরিণতি এখনো সম্পূর্ণ পরিষ্কার নয়, তবে কয়েকটি সম্ভাব্য দিক:

  • নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ: বিদ্রোহী শিবির দলের নাম ও প্রতীক দাবি করে কমিশনে আবেদন জানাতে পারে। সেক্ষেত্রে আইনি লড়াই দীর্ঘায়িত হবে।
  • আরও ভাঙনের আশঙ্কা: জেলা স্তরে বিদ্রোহীদের সমর্থন কতটা গভীর, তা এখনো স্পষ্ট নয়। কিন্তু পুরসভার কাউন্সিলরদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে সংগঠনের নিচুতলায়ও চিড় ধরেছে।
  • মমতার শেষরক্ষা: মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো দলের নাম, প্রতীক ও জাতীয় কমিটির স্বীকৃতি ধরে রেখেছেন। কিন্তু ফিরহাদ-অরূপ বিশ্বাসের মতো তাঁরই হাতে তৈরি নেতারা যখন বিপক্ষে, তখন রাজনৈতিক বৈধতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
  • বাম-কংগ্রেসের জন্য সুযোগ: তৃণমূলের এই গৃহযুদ্ধ বিরোধী শক্তির জন্য বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে, যদিও আপাতত তারা সংগঠনগতভাবে খুব শক্তিশালী নয়।

🕊️ উপসংহার

২২ জুনের বৈঠকের মধ্য দিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এমন এক অচেনা বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে, যার শুরু বা শেষ কোনোটিই এখনো নির্ধারিত নয়। একদিকে ঋতব্রতদের যুক্তি — তৃণমূলে গণতন্ত্র ফেরানো, সংবিধান মানা, নেতৃত্বের পরিবর্তন; অন্যদিকে মমতা শিবিরের অবস্থান — তৃণমূল মানেই মমতা, এর বাইরে সবই ‘ভুয়া’। রাজনীতির ইতিহাস বলে, দলের ভেতরের বিদ্রোহ সফল হতে গেলে প্রয়োজন হয় তিনটি জিনিস: জনসমর্থন, সাংগঠনিক শক্তি এবং আইনি স্বীকৃতি। বিদ্রোহীদের হাতে এখন বড় সংখ্যার বিধায়ক ও কাউন্সিলর আছে, কিন্তু জনসমর্থন ও আইনি স্বীকৃতি এখনো অনিশ্চিত। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার কি সত্যিই শেষের মুখে, নাকি তিনি আবারও ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়াবেন — তার উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু একটা জিনিস নিশ্চিত: আজকের এই কলকাতার বৈঠক বাংলার রাজনীতির গতিপথ চিরতরে বদলে দিল।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments