Homeটুডে ওয়ার্ল্ডপশ্চিমবঙ্গে কড়াকড়ির জেরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরার ঢল, হাকিমপুরে জেরা ও কড়া...

পশ্চিমবঙ্গে কড়াকড়ির জেরে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ফেরার ঢল, হাকিমপুরে জেরা ও কড়া নজরদারি

অমিত শাহের আইনি অভয় ও শুভেন্দু অধিকারীর হুঁশিয়ারির পর বাড়ছে ভিড়; ভোটার তালিকা থেকে নাম কর্তন ও পুলিশের ধরপাকড়ের আতঙ্কে সীমান্ত চৌকিতে শত শত মানুষ

উত্তর ২৪ পরগনা | ২৯ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নতুন সরকার গঠনের পর ‘অনুপ্রবেশকারী’দের বিরুদ্ধে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কড়া অবস্থানের জেরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের স্বদেশে ফেরার ঢল নেমেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ‘স্বেচ্ছায় ফিরলে মামলা না দেওয়ার’ ঘোষণা এবং পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কড়া হুঁশিয়ারির পর গত এক সপ্তাহে উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অধীন হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে প্রতিদিন ভিড় করছেন শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু। সেখানে কড়া নিরাপত্তা, নিবিড় জেরা এবং দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শেষে তাদের ওপারে পাঠানো কিংবা সাময়িক হোল্ডিং সেন্টারে (আটক শিবির) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

🚨 ঘোষণার প্রভাব ও সীমান্তে উপচে পড়া ভিড়

সীমান্তবর্তী অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত সপ্তাহখানেক ধরে প্রতিদিন সকাল থেকেই সাতক্ষীরা ও যশোর জেলা লাগোয়া হাকিমপুর সীমান্তে মানুষ জড়ো হতে শুরু করেছে। হাকিমপুরের স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর গাজি বলেন, “শুরুর দিকে দৈনিক ১০-১২ জন করে আসছিল। কিন্তু দিন তিনেক আগে থেকে এই সংখ্যাটা কয়েকশোতে গিয়ে ঠেকেছে।” হাকিমপুর এলাকাটি উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অন্তর্গত। বিএসএফের (BSF) চেকপোস্ট পেরিয়ে কিছুটা গেলেই তারালি গ্রাম এবং তারপর সোনাই নদী, যার ওপারেই বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফা শাওজি জানান, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের রাজ্যে আর থাকতে দেওয়া হবে না এবং তাদের ফেরত পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই মূলত অবৈধভাবে বসবাসকারীরা গ্রেফতারির ভয়ে সীমান্তমুখী হচ্ছেন।

🔍 সীমান্ত চৌকির প্রক্রিয়া: জেরা, বায়োমেট্রিক ও হোল্ডিং সেন্টার

হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে গিয়ে দেখা যায়, সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে চলে যাওয়ার জন্য আসা মানুষদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে। সেখান থেকে ভারতীয় পুলিশ কর্মীরা একেকটি পরিবারকে ডেকে এনে নিবিড়ভাবে নথি যাচাই করছেন। এ সময় তাদের বাংলাদেশের পরিচয়পত্র, নাম, পরিচয় এবং বাংলাদেশের কোন জেলায় আদি বাড়ি ছিল—সেই সব তথ্য লিখে নেওয়া হচ্ছে এবং ছবি তোলা হচ্ছে।

📋 সীমান্ত চৌকিতে অনুসৃত প্রক্রিয়া (মে ২০২৬)
নথি ও পরিচয়পত্র যাচাই: বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য আসা ব্যক্তিদের পূর্বের আফগান বা বাংলাদেশি নাগরিকত্বের প্রমাণ বা আদি ঠিকানা যাচাই করা হচ্ছে।
বায়োমেট্রিক ও তথ্য সংগ্রহ: নিরাপত্তা স্বার্থে সীমান্ত চৌকিতেই তাদের নাম, ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য সরকারিভাবে নথিবদ্ধ করা হচ্ছে।
সীমান্ত পারাপার: স্থানীয়দের দাবি, নথি যাচাই শেষে বিএসএফ জোয়ানেরা তাদের সীমান্ত চৌকি থেকে ৪ কিমি দূরের ‘আমোদিয়া’ নামক একটি হাঁটা সীমান্ত দিয়ে ওপারে পার করে দিচ্ছে।
হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর: যেসব মানুষের নথি যাচাইয়ের কাজ দিনে শেষ হচ্ছে না, সন্ধ্যা নামতেই তাদের বাসে করে স্বরূপনগর থানা এলাকায় তৈরি ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা অস্থায়ী আটক শিবিরে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

🪪 ভারতের ভোটার কার্ড ও ২০২৬-এর তালিকা সংশোধন জটিলতা

সীমান্তে অপেক্ষমাণ অনেকের কাছেই ভারতের একাধিক বৈধ পরিচয়পত্র থাকার তথ্য নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রায় ৩৮ বছর আগে ১০ বছর বয়সে মা-বাবার হাত ধরে কলকাতায় চলে আসা বাচ্চু মুন্সি জানান, তিনি কলকাতার দমদম বিমানবন্দর লাগোয়া এলাকায় থাকতেন। এখানেই বিয়ে করেছেন, সন্তানদের বিয়েও দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “অনেক চেষ্টা করে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড করিয়েছিলাম। প্রথমবার ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ভোটও দিয়েছিলাম।” কিন্তু বিপত্তি বাঁধে ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর। সংশোধিত এই তালিকা থেকে বাচ্চু মুন্সির পুরো পরিবারের নাম বাদ পড়ে যায়। এরপর নতুন সরকার আসার পর কড়াকড়ি শুরু হওয়ায় তিনি সপরিবারে খুলনায় নিজের আদি ভিটায় ফেরার জন্য সীমান্তে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

💬 “আর অবৈধ পথে আসব না” — আতঙ্কের আড়ালে দেশত্যাগের আকুতি

সীমান্তে জড়ো হওয়া যশোর ও সাতক্ষীরার বাসিন্দারা জানান, বিজেপির সরকার আসার পর স্থানীয় স্তরে কড়াকড়ি বহুগুণ বেড়েছে। একদিকে পুলিশ এসে এলাকা ছাড়ার তাগিদ দিচ্ছে, অন্যদিকে বাড়িওয়ালারাও আর তাদের ভাড়া বাড়িতে থাকতে দিতে চাইছেন না।

বাংলাদেশের যশোর জেলার বাসিন্দা নাজমা বলেন:

“বিজেপি এখানে সরকারে আসার পর থেকেই তো বলে দিয়েছে আমাদের আর থাকতে দেবে না। বাংলাদেশের লোক ধরলেই জেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এখন মামলা ছাড়া ফেরত চলে যাওয়ার সুযোগ দিয়েছে, তাই নিজের দেশে চলে যাচ্ছি।”

সাতক্ষীরার রাইসা পারভিন ও শেখ মাসুদ রাণাও জানান একই কথা। তাদের দাবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের ঝামেলার কারণে তারা বাধ্য হয়েই ফিরে যাচ্ছেন। অন্যদিকে, শাহিন আলম মোল্লা নামের এক ব্যক্তি জানান, ভারতে জীবনযাপনের অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচতেই এই সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “যাই দেখি দেশে কী কাজকর্ম করতে পারি। তবে ভারতে আর কোনোদিন অবৈধ পথে ফিরে আসব না। যদিও বা আসি, তাহলেও বৈধভাবে পাসপোর্ট করিয়েই আসব।”

উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় ‘বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের’ জন্য পৃথক আটক শিবির (ডিটেনশন ক্যাম্প) গড়ে তোলার প্রশাসনিক নির্দেশনার পর থেকেই এই সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ ও স্বদেশে ফেরার তোড়জোড় আরও তীব্র রূপ নিয়েছে।

📌 তথ্যসূত্র:

  • বিবিসি নিউজ বাংলা অন-গ্রাউন্ড সীমান্ত রিপোর্ট
  • পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশ ও বিএসএফ (BSF) হাকিমপুর চেকপোস্ট ডায়েরি
  • ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তি (মে ২০২৬)
  • স্থানীয় সীমান্ত প্রশাসন ও স্বরূপনগর থানা হোল্ডিং সেন্টার রেকর্ডস
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular