‘আরাশ-ই কামানগির’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম সফল যুদ্ধকালীন ব্যবহার; কয়েক মাসের মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরও তেহরানের সামরিক সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকার ইঙ্গিত বিশ্লেষকদের
তেহরান | ২৯ মে ২০২৬
চলতি সপ্তাহের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির আকাশে যুক্তরাষ্ট্রের একটি অত্যাধুনিক ‘এমকিউ-৯ রিপার’ (MQ-9 Reaper) নজরদারি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইরান। দেশটির আধা-সরকারি গণমাধ্যম ফার্স নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, এই অভিযানে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ‘আরাশ-ই কামানগির’ (Arash-e Kamangir) নামের একটি নতুন ও গোপন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর কয়েক মাসের টানা বিমান হামলায় ইরানের মূল আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও তেহরান কীভাবে এই প্রতিরোধ গড়ে তুলল, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির ‘কেশম দ্বীপের’ (Qeshm Island) কাছে মার্কিন ড্রোনটিকে নিখুঁতভাবে নিশানা করা হয়। তেহরানের পক্ষ থেকে এই সফল ড্রোন ইন্টারসেপ্ট বা ভূপাতিত করার দাবি এমন এক সময়ে এল, যখন বন্দর আব্বাসের কাছে ইরানি সামরিক ঘাঁটিতে নতুন করে মার্কিন হামলার খবর পাওয়া গেছে। এর জবাবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) একটি “আমেরিকান বিমান ঘাঁটিতে” পাল্টা হামলা চালানোর দাবি করেছে। দুই পক্ষের এই ছায়াযুদ্ধ ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি আলোচনার মধ্যেই নতুন এই ইরানি সমরাস্ত্রের আত্মপ্রকাশ ঘটল।
🏹 পারস্য পুরাণের ‘তীরন্দাজ’ এবং ইরানের অসামঞ্জস্যপূর্ণ যুদ্ধকৌশল
ফার্সি ভাষায় ‘আরাশ-ই কামানগির’ শব্দটির অর্থ হলো ‘তীরন্দাজ আরাশ’। পারস্য উপাখ্যান ও লোকগাথায় আরাশ এমন এক বীর, যিনি নিজের ধনুকের তীর ছুড়ে প্রাচীন ইরানের সীমান্ত নির্ধারণ করেছিলেন এবং দেশকে বিদেশি আধিপত্য থেকে মুক্ত করেছিলেন। এই প্রতীকী নামটির ব্যবহার মূলত শত্রুভাবাপন্ন পরাশক্তিগুলোর প্রতি তেহরানের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক ও সামরিক বার্তা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানের এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক উৎস থেকে এখনো সরাসরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেহরানের এই দাবি সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
লন্ডনের কিংস কলেজের সিকিউরিটি স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মার্ক হিলবোর্ন আল জাজিরাকে বলেন:
“যদিও এই নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত তথ্য খুবই সীমিত, তবে এটি ইরানের সামগ্রিক যুদ্ধকৌশলের সাথে পুরোপুরি মিলে যায়। ইউক্রেনের মতো ইরানও যুদ্ধের অর্থনীতি বদলে দিতে বেশ সফল হয়েছে। তারা সস্তা ও সাধারণ প্রযুক্তির মোবাইল ডিফেন্স সিস্টেম তৈরি করে পশ্চিমাদের অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়বহুল সামরিক সরঞ্জামগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে।”
🛠 কেমন এই ‘আরাশ-ই কামানগির’ ব্যবস্থা?
সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ও বিশ্লেষকদের মতে, ‘আরাশ-ই কামানগির’ কোনো প্রথাগত বা বিশাল আকৃতির রাডার-নিয়ন্ত্রিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নয়। এটি মূলত একটি মোবাইল (সহজে স্থানান্তরযোগ্য), কম খরচের এবং ‘পপ-আপ’ সারফেস-টু-এয়ার মিসাইল (SAM) ব্যবস্থা।
| 📊 টেকনিক্যাল ও স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণ (মে ২০২৬) |
| গাইডেন্স সিস্টেম |
| লুকানোর সক্ষমতা (Stealth) |
| টার্গেট ভলনারেবিলিটি |
প্যারিসের সায়েন্সেস পো (Sciences Po) বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি জানান, রাশিয়ার সরবরাহ করা এস-৩০০ (S-300) বা ইরানের নিজস্ব বড় রাডার ব্যবস্থাগুলো মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও, তেহরানের মূল শক্তি তাদের এই অনমনীয়তা, স্থায়িত্ব এবং গতিশীলতা (Resilience & Mobility)।
📉 ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও মার্কিন-ইসরায়েল সীমাবদ্ধতা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই স্বল্পপাল্লার প্রতিরোধী ব্যবস্থা হয়তো আমেরিকার বড় কোনো বিমান হামলা বা অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান পুরোপুরি ঠেকাতে পারবে না, তবে এটি মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীকে অনেক দূর থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুল দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (Standoff Weapons) ব্যবহারে বাধ্য করবে। এর ফলে মার্কিন সামরিক তহবিলের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হবে, যেখানে ইরান তাদের সস্তা ‘শাহেদ’ ড্রোন ও লোকাল মিসাইল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্প্রসারণের আলোচনার টেবিলে হরমুজ প্রণালির আংশিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ওয়াশিংটনের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতেই ইরান এই সফল ইন্টারসেপ্টের ঘটনাটি সামনে এনেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- আল জাজিরা ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো রিপোর্ট
- ফার্স নিউজ এজেন্সি (ইরান)
- রয়টার্স মিলিটারি ড্যাশবোর্ড
- হরাইজন এনগেজ (নিউ ইয়র্কভিত্তিক স্ট্র্যাটেজিক ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্ম)
- কিংস কলেজ লন্ডন (স্কুল অব সিকিউরিটি স্টাডিজ ডেটা)



