Homeটুডে ওয়ার্ল্ডকঠোর আইনি কড়াকড়িতে ভিন্ন আমেজের বকরি ঈদ পার করল কলকাতা, রেকর্ড দামে...

কঠোর আইনি কড়াকড়িতে ভিন্ন আমেজের বকরি ঈদ পার করল কলকাতা, রেকর্ড দামে বিক্রি হলো খাসি

১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন বলবৎ থাকায় এবার পশুর বাজারে ছিল নজিরবিহীন মন্দা; ঝামেলার আশঙ্কায় গরুর বদলে খাসি কোরবানি দিয়েছেন সিংহভাগ ক্রেতা

কলকাতা | ২৯ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জানতা পার্টির (বিজেপি) নতুন সরকার গঠনের পর ১৯৫০ সালের ঐতিহাসিক প্রাণিসম্পদ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার জেরে গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ মে) কলকাতায় এক ব্যতিক্রমী ও ভিন্নধর্মী আমেজে পবিত্র বকরি ঈদ (ঈদুল আজহা) উদযাপিত হয়েছে। সরকারের কড়া নির্দেশিকা, আদালতের সবুজ সংকেত এবং ভিন রাজ্য থেকে আসার পথে গবাদি পশুর গাড়ি আটকে হয়রানির আশঙ্কায় এবার কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অস্থায়ী পশুর হাটগুলো থেকে গরু প্রায় সম্পূর্ণ উধাও ছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছিল ছাগল, খাসি ও দুম্বার বাজারে, যার ফলে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে এসব পশু।

কলকাতা পৌরসভার অধীনে থাকা ঐতিহ্যবাহী ‘ট্যাংরা স্লটার হাউজ অ্যান্ড লাইভ স্টক’ বা কসাইখানা সংলগ্ন বিশালাকার শেড, যা প্রতি বছর ঈদের আগে ও ঈদের দিন শত শত গরুর উপস্থিতিতে গমগম করত, এবার তা ছিল সম্পূর্ণ ফাঁকা ও খাঁ খাঁ। গত ৩৫ বছর ধরে এই কসাইখানায় কর্মরত মুহাম্মদ জাভেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কোরবানির ঈদের আগে এমন পরিস্থিতি আমি কখনো দেখিনি। অন্যান্য বছর এখানে দাঁড়ানোর জায়গা থাকত না। এবার পরিস্থিতি এতটাই মন্দা ছিল যে দেখে বোঝার উপায় ছিল না বকরি ঈদ এসে গেছে।”

📜 আইনের কড়াকড়ি ও আদালতের সবুজ সংকেত: কেন এই স্থবিরতা?

চলতি মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার ১৯৫০ সালের প্রাণিসম্পদ আইন কড়াভাবে মেনে চলার বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এই আইনের প্রধান শর্তগুলো হলো—পৌরসভা চেয়ারম্যান বা পঞ্চায়েত সভাপতি এবং একজন সরকারি পশুচিকিৎসক যৌথভাবে পশুর বয়স ১৪ বছরের বেশি বা শ্রম করতে স্থায়ীভাবে অক্ষম—এই মর্মে সার্টিফিকেট দিলেই কেবল ষাঁড়, বলদ বা গরু জবাই করা যাবে। এর পাশাপাশি প্রশাসন নির্ধারিত কসাইখানার বাইরে প্রকাশ্যে কোনো পশু জবাই করার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

আইনের এই কড়াকড়ির বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টে একাধিক মামলা দায়ের করা হলেও আদালত সরকারি বিজ্ঞপ্তিই বহাল রাখে। ট্যাংরার কসাইখানার কর্মী শেখ জাহিদ জানান, এ বছর ১৪ বছরের বেশি বয়সের উপযুক্ত গরু পাওয়া মুশকিল হওয়ায় এবং উত্তর প্রদেশ বা অন্য রাজ্য থেকে আসার পথে গবাদি পশুর গাড়ি আটকে ঝামেলা করায় ব্যবসায়ীরা আর ঝুঁকি নেননি। ফলে ঈদের দিন কসাইখানায় পশুর সরবরাহ ছিল নামমাত্র।

📈 গরুর বদলে খাসির চাহিদা: চাঙ্গা ছিল ‘বকরি মার্কেট’

গরু বিক্রির ওপর অঘোষিত স্থবিরতা নেমে আসায় এবার কলকাতার নারকেলডাঙা, খিদিরপুর, মোমিনপুর ও ইকবালপুরের অস্থায়ী বাজারগুলোতে ছাগল ও খাসির চাহিদা রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

পশুর প্রকার📊 বকরি ঈদ ২০২৬-এর বাজার চিত্র ও পরিস্থিতি
গরু / বলদকলকাতা এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণা, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদের বাজারে বেচাকেনা ছিল প্রায় শূন্যের কোঠায়
ছাগল / খাসিচাহিদা ছিল তুঙ্গে। উত্তর প্রদেশ থেকে আসা বিক্রেতারা জানান, গাড়িতে ছাগল দেখলে পুলিশ ঝামেলা না করায় শেষ মুহূর্তে ভালো দাম মিলেছে।
দুম্বাবাজারে সরবরাহ থাকলেও অতিরিক্ত চড়া দামের কারণে সাধারণ ক্রেতারা ছাগল বা খাসি কিনতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন।

খিদিরপুরের বাসিন্দা আব্দুল সায়েদ জানান, “সিপিএম বা তৃণমূলের সময় অন্য নিয়ম ছিল, এখন অন্য নিয়ম। আমাদের কোরবানি দেওয়া নিয়ে কথা, সরকার যা বলবে তাই হবে। তাই আমরা এবার ছাগল কোরবানি দিয়েছি।” অন্যদিকে বীরভূমের রামপুরহাটের আব্দুল করিমও কোনো প্রকার ‘ঝামেলা’ এড়াতে এবার খাসি কোরবানি দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন।

💬 “গরু কিনবেন না, ছাগল কিনুন” — নাখোদা মসজিদের ইমামের ঐতিহাসিক আহ্বান

আইন বলবৎ হওয়ার পরপরই কলকাতার বিখ্যাত নাখোদা মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ শফিক কাসমি মুসলিম সম্প্রদায়কে গরু কোরবানি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। বার্তা সংস্থা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এক তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে বলেছিলেন:

“আইন অনুযায়ী সার্টিফিকেট দেওয়ার দায়িত্ব তো সরকারের। তাদের উচিত ছিল আগে অবকাঠামোগত ব্যবস্থা করা। তবে আমি রাজ্যের সব মুসলিমদের বলব, আপনারা এবার গরু জবাই করবেন না। এতে কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে লোকসান হবে আমাদের হিন্দু ভাইদের, কারণ গরু মূলত বিক্রি করেন হিন্দু ব্যবসায়ীরাই। পক্ষান্তরে মুসলিমরা ছাগল পালন বেশি করেন। ফলে মুসলিমরা ছাগল কিনলে লাভবান হবেন মুসলিম খামারিরাই।”

নাখোদা মসজিদের আরেক ইমাম মোহাম্মদ নূর আলম জানান, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা অত্যন্ত ধর্মনিরপেক্ষ ও সেকুলার চিন্তাধারার। তাই আইনি নিয়ম মেনে চলায় ঈদ উদযাপনের মূল মেজাজে বা মানুষের মেলবন্ধনে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি, সবাই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে উৎসবের দিনটি অতিবাহিত করেছেন।

📌 তথ্যসূত্র:

  • পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের প্রাণিসম্পদ বিকাশ মন্ত্রণালয় (আইন বলবৎ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি, মে ২০২৬)
  • কলকাতা পৌরসভা (KMC) স্লটার হাউজ অ্যান্ড লাইভ স্টক উইং অন-গ্রাউন্ড ডায়েরি (২৮ মে ২০২৬)
  • ভারতের সংবাদ সংস্থা এএনআই (ANI) ও কলকাতা হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রুলিং আর্কাইভ
  • বিবিসি নিউজ বাংলা অন-গ্রাউন্ড খিদিরপুর, নারকেলডাঙা ও ট্যাংরা ব্যুরো রিপোর্ট
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular