শুভেন্দু সরকারের ২ সপ্তাহের মাথায় স্বরাষ্ট্র দপ্তরের হাই-অ্যালার্ট নির্দেশিকা; ২০২৪-এর ৩১ ডিসেম্বরের পরের অনুপ্রবেশকারীদের বিএসএফ-এর মাধ্যমে পুশব্যাকের প্রস্তুতি; সিএএ-এর বাইরে থাকা ব্যক্তিদের ওপর খাঁড়া
কলকাতা | ২৫ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গে নতুন নির্বাচিত ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় রাজ্যের অবৈধ অভিবাসন ও অনুপ্রবেশ ইস্যুতে সবচেয়ে বড় এবং নজিরবিহীন প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের ঘোষিত ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট’ (চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া এবং বহিষ্কার) নীতি কার্যকর করতে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলায় জরুরি ভিত্তিতে ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা ডিটেনশন সেন্টার (আটক কেন্দ্র) চালুর নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
আজ সোমবার (২৫ মে) পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সরকারের এই সাঁড়াশি অভিযানের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায় মোট ১২ জন বাংলাদেশিকে আটক করে নবনির্মিত হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে মালদার ইংরেজবাজারের চন্দনপার্কে ৩ জন নারী ও ৬ জন নাবালক-নাবালিকাসহ ৯ জন এবং মুর্শিদাবাদের লালগোলার পদ্মাভবনে ৩ জন বাংলাদেশি রয়েছেন।
🕒 পশ্চিমবঙ্গ স্বরাষ্ট্র দপ্তরের জরুরি নির্দেশিকা ও আইনি রূপরেখা
গত শুক্রবার ভারতের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের সচিবের পক্ষ থেকে রাজ্য পুলিশ প্রধান (DGP), কলকাতার পুলিশ কমিশনার, এফআরআরও (FRRO) এবং সমস্ত জেলার পুলিশ সুপারদের (SP) কাছে এই হাই-অ্যালার্ট নির্দেশিকা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশিকার মূল শর্তসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
- টার্গেট পিরিয়ড: ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পরে ভারতে প্রবেশ করা বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিহ্নিত করে হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। একইসঙ্গে সাজা শেষ হওয়া মুক্তিপ্রাপ্ত বিদেশি কয়েদিদেরও এখানে আনা হবে।
- ৩০ দিনের ডেডলাইন: আটককৃত সন্দেহভাজনদের এই হোল্ডিং সেন্টারে সর্বোচ্চ ৩০ দিন পর্যন্ত রাখা যাবে। এই সময়ের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসন ও ফরেনার্স ব্রাঞ্চ তাদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে।
- বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর: নাগরিকত্ব নিশ্চিতকরণ ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আটককৃতদের বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ বা ফেরত পাঠানোর জন্য সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
- সিএএ (CAA) সুরক্ষা কবচ: রাজ্য সরকার স্পষ্ট করেছে, যারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (CAA) আওতায় পড়েন (যেমন ধর্মীয় সংখ্যালঘু শরণার্থী), তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও বৈধ নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের সংখ্যাগুরু (মুসলিম) সম্প্রদায় যারা এই আইনের আওতাভুক্ত নন, তাদের ক্ষেত্রে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
📊 হোল্ডিং সেন্টারের বর্তমান চিত্র ও আটককৃতদের পরিসংখ্যান
| জেলার নাম | হোল্ডিং সেন্টারের অবস্থান | বর্তমান আটক সংখ্যা | আটককৃতদের বিবরণ ও এলাকা |
| মালদা | চন্দনপার্ক, ইংরেজবাজার | ০৯ জন | ৩ জন নারী ও ৬ জন নাবালক-নাবালিকা। (গাজোল থানার পান্ডুয়া থেকে ধৃত) |
| মুর্শিদাবাদ | পদ্মাভবন, লালগোলা | ০৩ জন | অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে সীমান্ত এলাকা থেকে ধৃত। |
| মোট আটক | — | ১২ জন | আইনি যাচাইকরণ ও পুশব্যাকের প্রক্রিয়ধীন। |
💬 “অনুপ্রবেশে জিরো টলারেন্স”: শুভেন্দু অধিকারী ও বিজেপি নেতৃত্বের হুংকার
পশ্চিমবঙ্গের নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী গত ২০ মে মহাকরণে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন:
“আমাদের নীতি অত্যন্ত পরিষ্কার—ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট। যারা সিএএ-এর সুরক্ষায় নেই এবং অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়ে বাংলায় ঢুকেছেন, রাজ্য পুলিশ তাদের খুঁজে বের করে গ্রেপ্তার করবে এবং বহিষ্কারের জন্য বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর করবে। প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই আমরা বাংলাদেশ সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য বিএসএফ-কে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
একই সুর শোনা গেছে উত্তর মালদার বিজেপি সাংসদ খগেন মুর্মুর কণ্ঠেও। আজ মালদার হোল্ডিং সেন্টার চালুর পর তিনি বলেন, “যারা আমাদের দেশের নাগরিক নন, তাঁদের নিজেদের দেশে ফিরতেই হবে। রাজ্য ও দেশের সুরক্ষায় এটা জরুরি। এতদিন ধরে তৃণমূল কংগ্রেস আমাদের এই রাজ্যটাকে রোহিঙ্গা, সন্ত্রাসী ও জেহাদিদের নিরাপদ করিডোর হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ করে দিয়েছিল, যা এখন বন্ধ করা হচ্ছে।”
হোল্ডিং সেন্টারের পরিকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নতুন নির্দেশিকায় জেলা প্রশাসনকে হোল্ডিং সেন্টারের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী ঢেলে সাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আটক কেন্দ্রে নারী ও পুরুষদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা কক্ষ, পৃথক শৌচাগার, নিয়মিত খাবার, সার্বক্ষণিক চিকিৎসা পরিষেবা, বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো কেন্দ্রটিকে সিসিটিভি (CCTV) নজরদারিতে রাখা এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর পাশাপাশি সিভিল ডিফেন্স কর্মী মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে সীমান্ত জেলাগুলোতে ব্যাপক চাঞ্চল্য ও রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
📌 তথ্যসূত্র:
- পশ্চিমবঙ্গ সরকার, স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রণালয় (ফরেনার্স ব্রাঞ্চ জরুরি নোটিশ, মে ২০২৬)
- দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস (The Indian Express) ব্যুরো রিপোর্ট
- মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশ প্রশাসন ও জেলা শাসক (DM) কার্যালয় দৈনিক ডায়েরি
- ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (MHA) নির্দেশিকা ফাইল (২ মে ২০২৫)



