আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তৃতিতে প্রথমবার ইরানি ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক অভিযান রিয়াদের; পরবর্তীতে উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের মধ্যে গোপন সমঝোতা।
রিয়াদ/দুবাই | ১৩ মে ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের আবহে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যকার দীর্ঘদিনের স্নায়ুযুদ্ধ নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। নিজস্ব ভূখণ্ডে ক্রমাগত হামলার জবাবে গত মার্চ মাসের শেষদিকে প্রথমবারের মতো সরাসরি ইরানি ভূখণ্ডে বেশ কিছু গোপন বিমান হামলা চালিয়েছে সৌদি আরব. পশ্চিমা এবং ইরানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি বিমান বাহিনীর এই অপারেশনগুলো মূলত ইরানের পক্ষ থেকে আসা ড্রোন ও মিসাইল হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে পরিচালিত হয়েছে.
সরাসরি হামলা ও পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে বিমান হামলা শুরু করার পর থেকেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে. এই যুদ্ধকালীন সময়ে ইরান লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় সবকটি আরব রাষ্ট্রে ড্রোন ও মিসাইল হামলা চালায়, যার লক্ষ্যবস্তু ছিল মূলত তেল অবকাঠামো এবং বেসামরিক বিমানবন্দর. রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে.
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সরাসরি হামলার বিষয়টি নিশ্চিত না করলেও জানান, রিয়াদ সবসময়ই সংযম ও উত্তেজনা প্রশমনের পক্ষে কাজ করে. তবে গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, রিয়াদ তার ঐতিহ্যগত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে গিয়ে প্রথমবার সরাসরি আক্রমণাত্মক অবস্থান নিয়েছে.
হামলা পরবর্তী কূটনৈতিক সমঝোতা
ইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, সৌদি আরব হামলার বিষয়টি ইরানকে অবহিত করার পর দুই দেশের মধ্যে নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়. রিয়াদের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, ইরান যদি তাদের হামলা বন্ধ না করে তবে আরও বড় আকারের প্রতিশোধ নেওয়া হবে.
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ এই পরিস্থিতিকে উভয় পক্ষের “বাস্তবসম্মত স্বীকৃতি” হিসেবে বর্ণনা করেছেন. তার মতে, উভয় দেশই বুঝতে পেরেছে যে অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের ফলাফল কারো জন্যই শুভ হবে না. এরই ধারাবাহিকতায় ৭ এপ্রিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঠিক এক সপ্তাহ আগে রিয়াদ ও তেহরান উত্তেজনা কমানোর একটি অনানুষ্ঠানিক সমঝোতায় পৌঁছায়.
পরিস্থিতির পরিবর্তন ও পরিসংখ্যান
মার্চের শেষ সপ্তাহে সৌদি আরবে ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলার সংখ্যা ছিল ১০৫টির বেশি. কিন্তু গোপন পাল্টা হামলা এবং কূটনৈতিক আলোচনার পর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে মাত্র ২৫টিতে দাঁড়ায়. গোয়েন্দা বিশ্লেষণ বলছে, ইরান সরাসরি হামলা কমিয়ে দিলেও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাক থেকে হামলা অব্যাহত রেখেছে. গত ১২ এপ্রিল ইরাকি ভূখণ্ড থেকে হামলা চালানোর প্রতিবাদে বাগদাদের রাষ্ট্রদূতকে তলবও করেছিল সৌদি আরব.
🔎 এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
- হামলার সময়কাল: ২০২৬ সালের মার্চের শেষ ভাগ.
- আক্রমণকারী: সৌদি বিমান বাহিনী (Saudi Air Force).
- মূল কারণ: সৌদি তেল অবকাঠামো ও বেসামরিক সাইটে ইরানি হামলার প্রতিশোধ.
- পরিসংখ্যান: ১-৬ এপ্রিলের মধ্যে সৌদি আরবে হামলার পরিমাণ ৭৫% কমেছে.
- সহযোগিতা: উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পাকিস্তান সৌদি আরবে যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে সংহতি প্রকাশ করেছে.
💬 বিশেষ নোট
সাবেক সৌদি গোয়েন্দা প্রধান প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল একটি নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, ইরান যখন সৌদি আরবকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে চেয়েছিল, তখন রিয়াদের নেতৃত্ব অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে নাগরিকদের জানমাল রক্ষা করেছে. বর্তমান সমঝোতাটি অত্যন্ত ভঙ্গুর হলেও এটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত এড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা.
তথ্যসূত্র: রয়টার্স (Reuters)



