ইরানের প্রস্তাবকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট; পরমাণু কেন্দ্রে হামলার হুঁশিয়ারি নেতানিয়াহুর
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ১১ মে, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ছায়াযুদ্ধ অবসানে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তেহরানের পাঠানো শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প এই প্রস্তাবকে “সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহতের খবরের পর তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরম সীমায়।
কী ছিল ইরানের প্রস্তাবে?
পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো তেহরানের জবাবে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছিল, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য মানা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্রমতে, ইরানের উল্লেখযোগ্য দাবিগুলো ছিল:
- অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি: সব ফ্রন্টে (লেবাননসহ) অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধ করা।
- নৌ অবরোধ প্রত্যাহার: হরমুজ প্রণালি ও ইরানের বন্দরগুলো থেকে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ সরিয়ে নেওয়া।
- নিশ্চয়তা প্রদান: ভবিষ্যতে ইরান বা তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে না—এমন লিখিত নিশ্চয়তা।
- জব্দ সম্পদ মুক্তি: যুক্তরাষ্ট্রের হাতে থাকা ইরানের জব্দকৃত অর্থ ও সম্পদ অবিলম্বে ফেরত দেওয়া।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অনমনীয় অবস্থান
ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, “আমি তথাকথিত প্রতিনিধিদের জবাব পড়েছি। এটি আমার পছন্দ হয়নি—সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।” ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়তে শুরু করেছে।
এদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুধুমাত্র যুদ্ধবিরতি দিয়ে শান্তি আসবে না। তাঁর দাবি:
- ইরানের মজুত করা সমস্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
- ইরানের মাটির নিচে থাকা অবশিষ্ট পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে হবে।
🔎 বিশ্লেষণ: কেন এই সংঘাত জটিল হচ্ছে?
বর্তমানে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চললেও পর্দার আড়ালে পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিনটি প্রধান কারণে এই আলোচনা ব্যর্থ হচ্ছে:
- ১. হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ: ইরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে নিজস্ব পদ্ধতিতে টোল আদায়ের চেষ্টা করছে, যা যুক্তরাষ্ট্র ‘জলদস্যুতা’ হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প নিজেই মার্কিন বাহিনীর ইরানি জাহাজ দখলকে “লাভজনক ব্যবসা” বলে প্রশংসা করেছেন।
- ২. পরমাণু কর্মসূচি: ইরান তাদের ইউরেনিয়াম তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তরের প্রস্তাব দিলেও, চুক্তি ব্যর্থ হলে তা ফেরত পাওয়ার শর্ত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এই ‘ফেরত পাওয়ার’ শর্তটি মানতে নারাজ।
- ৩. রাজনৈতিক নেতৃত্ব: তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে যে, তারা ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো প্রস্তাব লেখে না। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, “আলোচনা মানেই আত্মসমর্পণ নয়।”
📊 বর্তমান সংকটের টাইমলাইন (২০২৬)
| তারিখ | ঘটনা | ফলাফল |
| ২৮ ফেব্রুয়ারি | পেন্টাগন ও ইসরায়েলের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু | ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধ শুরু। |
| ৭ এপ্রিল | বড় আকারের গোলাগুলি বন্ধ হয় | একটি অনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। |
| ১০ মে | ট্রাম্প ইরানের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন | মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হামলার শঙ্কা। |
| ১১ মে | আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি | ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলারে পৌঁছেছে। |
💬 উভয় পক্ষের প্রতিক্রিয়া
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিভাবাদি:
“শুধুমাত্র ইরানই এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। ব্রিটেন বা ফ্রান্সের কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। আমাদের জাহাজে হামলা হলে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।”
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প:
“ওরা যদি প্রত্যাঘাত করার সাহস দেখায়, তবে আমরা এমন আঘাত করব যা আগে কখনও দেখা যায়নি। আমরা কোনো খেলা করছি না।”
উপসংহার
বর্তমানে পারস্য উপসাগরে ড্রোন হামলা এবং পাল্টা ড্রোন প্রতিহতের ঘটনা আবারও নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতারের উপকূলে মার্কিন পতাকাবাহী জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে পাকিস্তান বা চীনের মধ্যস্থতা প্রচেষ্টাও এখন ব্যর্থ হওয়ার পথে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ‘ইগো’ এবং ‘অস্তিত্বের লড়াই’ বিশ্বকে আরও একটি ভয়াবহ জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: তাসনিম নিউজ (তেহরান), এএফপি (AFP), রয়টার্স ও ট্রুথ সোশ্যাল।



