মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর শপথের পর প্রশাসনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বড় রদবদল; বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন থেকে নিরাপত্তা প্রত্যাহার।
কলকাতা | রবিবার, ১০ মে ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ এক দশকের রাজনৈতিক সমীকরণে আমূল পরিবর্তন এসেছে। সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক জয়ের পর আজ শনিবার কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। এই পরিবর্তনের রেশ এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কলকাতা পুলিশের অফিশিয়াল হ্যান্ডেল থেকে যেমন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তেমনি তাঁর বাসভবন ‘কালীঘাট’ থেকেও তুলে নেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘আনফলো’ ও নতুন সমীকরণ
শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পরপরই কলকাতা পুলিশের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টের ‘ফলো’ তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। পুলিশ প্রশাসন তাদের তালিকা থেকে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘আনফলো’ করে দিয়েছে।
পরিবর্তে পুলিশের অনুসরণ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, নবনিযুক্ত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (PMO) অ্যাকাউন্ট।
বায়ো পরিবর্তন করলেও নিজেকে ‘সাবেক’ বলতে নারাজ মমতা
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রোফাইল বায়ো পরিবর্তন করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সেখানে কোথাও তিনি নিজেকে ‘সাবেক’ বা ‘প্রাক্তন’ হিসেবে পরিচয় দেননি। তাঁর নতুন বায়োতে লেখা হয়েছে:
“Founder Chairperson, All India Trinamool Congress. Chief Minister of West Bengal (15th, 16th and 17th Vidhan Sabha).”
বিশ্লেষক নিজেকে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তুলে ধরেছেন, তিনি বলেছেন, লড়াকু ভাবমূর্তি তৈরি করার চেষ্টা করছেন।
নিরাপত্তা প্রত্যাহার ও কালীঘাটে উত্তেজনা
বিজেপির সরকার গঠনের পর মমতার কালীঘাটের বাসভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হয়েছে। দীর্ঘদিনের ‘সিজার্স ব্যারিকেড’ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ওপর কড়াকড়ি তুলে দেওয়া হয়েছে। লালবাজারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল নির্ধারিত প্রটোকল ও নিরাপত্তা পাবেন। একইভাবে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কার্যালয় ও বাসভবন থেকেও মেটাল ডিটেক্টরসহ যাবতীয় সরকারি সুরক্ষাসামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, আজ সন্ধ্যায় ভবানীপুর এলাকায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন লক্ষ্য করে বিজেপি সমর্থকদের ‘চোর-চোর’ স্লোগান দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
🔎 বিশ্লেষণ: প্রশাসনিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসানের পর ২০১১ সালে তৃণমূল যে পরিবর্তন এনেছিল, ২০২৬ সালে বিজেপির এই জয়কে তার চেয়েও বড় প্রশাসনিক মোড় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। পুলিশ প্রশাসনের এই তড়িৎ পদক্ষেপ—যেমন অ্যাকাউন্ট ‘আনফলো’ করা বা দ্রুত নিরাপত্তা সরানো—ইঙ্গিত দেয় যে, রাজ্যের আমলাতন্ত্র ও পুলিশ বিভাগ দ্রুত নতুন শাসকদলের অনুগত হয়ে উঠছে।
📊 তথ্যচিত্র: এক নজরে পশ্চিমবঙ্গের পটপরিবর্তন
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| নতুন মুখ্যমন্ত্রী | শুভেন্দু অধিকারী (বিজেপি) |
| বিজেপির আসন | ২০৭টি (বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬) |
| নিরাপত্তা পরিবর্তন | কালীঘাট ও ক্যামাক স্ট্রিট থেকে অতিরিক্ত বলয় প্রত্যাহার। |
| পুলিশের ফলো তালিকা | মমতা-অভিষেক বাদ; মোদি-শুভেন্দু-অমিত শাহ যুক্ত। |
| মমতার অবস্থান | বাসভবনে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন ও ঐক্যের আহ্বান। |
💬 মন্তব্য
কলকাতা পুলিশের সদর দপ্তর লালবাজারের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে:
”প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নিয়ম অনুযায়ী যেটুকু প্রটোকল বরাদ্দ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেবল সেটুকুই পাবেন। বাসভবনের সামনে অতিরিক্ত পুলিশি পাহারা আর থাকছে না।”
উপসংহার
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে। একদিকে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির নতুন মন্ত্রিসভা গঠন, অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বিরোধী নেত্রী’ হিসেবে নতুন লড়াই—সব মিলিয়ে উত্তপ্ত গঙ্গার এপাড়-ওপাড়। প্রশাসনিক রদবদলের এই প্রক্রিয়া আগামী দিনগুলোতে আরও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



