VAR বিতর্ক, পক্ষপাতের অভিযোগ আর মিশরের আনুষ্ঠানিক আপিল—বিশ্বকাপের রেফারিং বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
স্পোর্টস ডেস্ক | ঢাকা | ৯ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নাটকীয় ফুটবলের চেয়েও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি বাঁশি, একটি VAR সিদ্ধান্ত এবং একজন রেফারি। আর্জেন্টিনার ৩-২ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচ শেষ হওয়ার পর এখন আলোচনার কেন্দ্রে খেলোয়াড় নয়, বরং ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেসিয়ে।
মিশরীয় ফুটবল ফেডারেশন (EFA) আনুষ্ঠানিকভাবে ফিফার কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ম্যাচে ধারাবাহিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত মিশরের বিপক্ষে গেছে এবং সেগুলো ম্যাচের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ফিফা বিষয়টি পর্যালোচনা করছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে লেতেসিয়েকে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো থেকে সরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ফিফা এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।
যে দুটি সিদ্ধান্তে আগুন ছড়ায়
বিতর্কের শুরু দ্বিতীয়ার্ধে। মোস্তফা জিকোর করা একটি গোল উদযাপনও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু VAR রিভিউয়ের পর সেই গোল বাতিল হয়। রেফারিদের ব্যাখ্যা ছিল, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন।
নিয়মের দিক থেকে VAR-এর সেই হস্তক্ষেপ বৈধ হলেও প্রশ্ন উঠেছে অন্য জায়গায়—আক্রমণ অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ সেই ফাউল খুঁজে বের করা হলো কেন? অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের মতে, এমন “সফট ফাউল”-এ গোল বাতিল করা অত্যন্ত কঠোর সিদ্ধান্ত।
এরপর আসে আরও বড় বিতর্ক।
ম্যাচের যোগ করা সময়ে মোহাম্মদ সালাহ বল হারানোর আগে ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি করে মিশর। সেই বল থেকেই আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণ এবং এঞ্জো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোল। কিন্তু এবার রেফারি খেলা থামাননি, VAR-ও রিভিউ ডাকেনি।
ফুটবলবিশ্বের প্রশ্ন এখানেই—এক ঘটনায় VAR এত সক্রিয়, অন্য ঘটনায় সম্পূর্ণ নীরব কেন?
মিশরের বিস্ফোরক অভিযোগ
ম্যাচ শেষে ক্ষোভ চেপে রাখেননি মিশরের কোচ হোসাম হাসান।
তাঁর ভাষায়, দলটি শুধু ম্যাচ হারেনি, বরং “গভীর অবিচারের শিকার” হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, রেফারি শুরু থেকেই মিশরের বিপক্ষে ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ম্যাচে ফেয়ার প্লের ন্যূনতম মানও বজায় থাকেনি। এমনকি তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে টুর্নামেন্টে এগিয়ে রাখার জন্য বাইরের কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না।
ম্যাচ শেষে গোলদাতা মোস্তফা জিকো কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তাদের মনে হয়েছে বিশ্বকাপ যেন “আর্জেন্টিনাকে দিয়ে দেওয়া হচ্ছে”।
ফিফার অবস্থান কী?
অভিযোগের পরও ফিফা এখন পর্যন্ত রেফারিকে দোষী বলেনি।
রেফারিং কমিটির প্রধান পিয়েরলুইজি কলিনা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, ম্যাচ অফিসিয়ালরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদের ওপর বাইরের কোনো প্রভাব নেই। তাঁর মতে, জিকোর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত VAR প্রটোকল অনুযায়ী হয়েছে এবং সালাহর ঘটনাটি ছিল সাধারণ ফুটবলীয় সংস্পর্শ, যেখানে VAR হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ছিল না।
কলিনা আরও সতর্ক করেছেন, প্রমাণ ছাড়া রেফারিদের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা তাদের নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
তদন্তের মুখে লেতেসিয়ে
ফরাসি সংবাদমাধ্যম L’Équipe এবং স্প্যানিশ দৈনিক AS জানিয়েছে, মিশরের অভিযোগের পর লেতেসিয়ের ম্যাচ পরিচালনা ফিফার রেফারিং বিভাগ পর্যালোচনা করছে।
যদি তদন্তে গুরুতর ত্রুটি বা আচরণগত অসঙ্গতি পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলোতে তাঁকে দায়িত্ব না দেওয়ার সিদ্ধান্তও আসতে পারে। তবে এ মুহূর্তে এটি সম্ভাবনার পর্যায়ে; কোনো আনুষ্ঠানিক শাস্তি ঘোষণা হয়নি।
বিশ্লেষণ | আসল বিতর্ক কোথায়?
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আর্জেন্টিনার জয় নয়, বরং VAR ব্যবহারের ধারাবাহিকতা।
যদি একটি গোল বাতিল করতে কয়েক ধাপ পেছনে গিয়ে ফাউল খুঁজে দেখা যায়, তাহলে প্রতিপক্ষের জয়সূচক গোলের আগে সম্ভাব্য ফাউল কেন একইভাবে যাচাই করা হলো না?
ফুটবলে ভুল সিদ্ধান্ত নতুন নয়। কিন্তু একই ম্যাচে প্রযুক্তির প্রয়োগে ভিন্ন মানদণ্ড দেখা গেলে, প্রশ্ন ওঠে প্রযুক্তি নয়—তার ব্যবহারের ওপর।
বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে প্রতিটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি ম্যাচ নয়, কোটি সমর্থকের বিশ্বাসকেও প্রভাবিত করে। তাই ফিফার সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল একটি অভিযোগের তদন্ত নয়; বরং VAR ব্যবস্থার প্রতি বিশ্ব ফুটবলের আস্থা অটুট রাখা।
তথ্যসূত্র: Reuters, BBC Sport, AP, L’Équipe, Diario AS, FIFA.



