Homeটুডে স্পোর্টসমেসির অশ্রু, মিসরের ভাঙা হৃদয় আর ভিএআর-বিতর্ক: এক রাতে যা দেখল বিশ্বকাপ

মেসির অশ্রু, মিসরের ভাঙা হৃদয় আর ভিএআর-বিতর্ক: এক রাতে যা দেখল বিশ্বকাপ

২-০ থেকে ৩-২: ১৩ মিনিটের রূপকথায় মিসরকে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা; ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়ে বিস্ফোরক মিসর কোচ

আটলান্টা | ৮ জুলাই ২০২৬

স্কোরবোর্ড বলছে আর্জেন্টিনা জিতেছে ৩-২ গোলে। কিন্তু বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর এই ম্যাচ নিয়ে আলোচনা থামছে না গোলের হিসাবেই। মাঠের লড়াইয়ে মিসরের সাহসী ফুটবল, মেসির ব্যর্থতা থেকে পুনর্জন্ম, আর ম্যাচ শেষে রেফারিং নিয়ে মিসর কোচের সরাসরি অভিযোগ — সব মিলিয়ে এই ম্যাচ পরিণত হয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত লড়াইগুলোর একটিতে।

যেভাবে এগিয়ে গিয়েছিল মিসর

আটলান্টায় ম্যাচের শুরু থেকেই ভয়হীন ফুটবল খেলে মিসর। ১৫ মিনিটে ইয়াসের ইব্রাহিমের হেডে এগিয়ে যায় তারা। এই গোলের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান — ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের পর এই প্রথম কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা; এর আগে টানা ১০টি বিশ্বকাপ ম্যাচে মেসিরা কখনো পিছিয়ে পড়েনি।

বিরতির পর ৬৭ মিনিটে মোস্তাফা জিকোর চমৎকার ফিনিশে ব্যবধান দ্বিগুণ করে মিসর। সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনা ছিল ব্যাকফুটে, আর মিসর দাঁড়িয়ে ছিল ইতিহাসের দরজায় — বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের সম্ভাবনা তখন স্পষ্ট।

মাঝে ২২ মিনিটে হাইসেম হাসানের ট্যাকলে পেনাল্টি পায় আর্জেন্টিনা, কিন্তু মেসির নিচু শট রুখে দেন মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শৌবির। এটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির দ্বিতীয় পেনাল্টি মিস — বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক আসরে (টাইব্রেকার বাদে) দুটি পেনাল্টি মিস করা প্রথম ফুটবলার তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর মোট আটটি পেনাল্টির মধ্যে চারটিই মিস — অর্থাৎ মিসের হার ৫০ শতাংশ।

১৩ মিনিটের সেই মহাকাব্য

৭৮ মিনিট পর্যন্ত দুই গোলে পিছিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কোনো দল এত দেরি পর্যন্ত দুই গোলের বেশি পিছিয়ে থেকে নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ জিততে পারেনি — আর্জেন্টিনা নিজেও আগে এমন ১৩টি ম্যাচের একটিতেও জিততে পারেনি।

কিন্তু এরপরই বদলে যায় ম্যাচের ভাষা। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রস থেকে হেডে গোল করেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো — এই অ্যাসিস্টটি ছিল বিশ্বকাপে মেসির নবম, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। চার মিনিট পর ৮৩ মিনিটে নিজেই সমতা ফেরান মেসি — এটি ছিল বিশ্বকাপে তাঁর ২১তম গোল, দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পের চেয়ে দুই গোল বেশি। আর যোগ করা সময়ে, ৯১ মিনিট ৫৫ সেকেন্ডে, কাউন্টার অ্যাটাক থেকে জয়সূচক গোলটি করেন এঞ্জো ফার্নান্দেজ — যা বিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩,০০০তম গোল

এই জয়ে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে টানা পঞ্চম জয় তুলে নেয় — এর আগে তাদের সবশেষ পাঁচ ম্যাচ জয়ের ধারা ছিল ২০১৪ সালে। আর ১৯৬৫ সালের পর এই প্রথম কোনো টুর্নামেন্টে দুই বা তার বেশি গোলে পিছিয়ে থেকেও জয়ের নজির গড়ল তারা।

ভিএআর নিয়ে বিতর্ক: একই ম্যাচে দুই মানদণ্ড?

ম্যাচের ফলাফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এখন একটি শব্দ — ভিএআর। মিসরের একটি গোল ভিএআর পর্যালোচনার পর বাতিল করা হয়, রেফারির সিদ্ধান্ত ছিল আক্রমণ তৈরির সময় নিয়মভঙ্গ হয়েছে। কিন্তু আর্জেন্টিনার তৃতীয় তথা জয়সূচক গোলের ঠিক আগে মিসরের এক ডিফেন্ডার ফাউলের শিকার হয়েছেন বলে দাবি ওঠার পরও রেফারি খেলা থামাননি এবং ভিএআর থেকেও কোনো পর্যালোচনার আহ্বান আসেনি।

বিশ্লেষকদের প্রশ্ন এখানেই — একদিকে একটি গোল বাতিল করতে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলো, অন্যদিকে সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ঘটনায় প্রযুক্তির আশ্রয়ই নেওয়া হলো না। ভিএআর চালুর মূল উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা আনা — এই ম্যাচের পর সেই ধারাবাহিকতাই সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।

মিসর কোচের বিস্ফোরক অভিযোগ

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে সরাসরি ক্ষোভ ঝাড়েন মিসরের কোচ হোসাম হাসান। তিনি বলেন, “বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চেয়ে আমরা ভালো খেলেছি। প্রায় সব দিকেই আমরা এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু মাঠের ভেতরের কিছু সিদ্ধান্ত এবং মাঠের বাইরের কিছু বিষয় ম্যাচের ফলকে প্রভাবিত করেছে। হয়তো তারা চেয়েছিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক, হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি প্রতিযোগিতায় থাকুক।”

হাসান আরও অভিযোগ করেন, মোহাম্মদ সালাহর ওপর ফাউলের ঘটনায় সম্ভাব্য পেনাল্টি দেওয়া হয়নি এবং সেটিও ভিএআরে পর্যালোচনা করা হয়নি। আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টারের বিরুদ্ধে জার্সি টেনে ধরার অভিযোগ তুলেও তিনি বলেন, সেটিও ভিএআরে দেখা হয়নি।

ম্যাচের রেফারি ছিলেন ফ্রান্সের ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ে। হাসান জানান, ফ্রান্স-আর্জেন্টিনার অতীত সম্পর্কের কারণে তাঁর দল এই রেফারি নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল। ম্যাচ শেষে রেফারির সঙ্গে তাঁর সরাসরি বাদানুবাদও হয় — নিজের ভাষায়, “আমি রেফারিকে বলেছি, এটা অন্যায়। হয়তো তাঁর লুকানোর কিছু আছে।”

🔎 বিশ্লেষণ: কী প্রশ্ন রেখে গেল এই ম্যাচ

এই ম্যাচ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে। ভিএআর কি সব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় সমানভাবে প্রয়োগ হয়েছে? মিসরের বাতিল হওয়া গোলের মতো আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগের ফাউলের ঘটনাও কি একইভাবে পর্যালোচিত হওয়া উচিত ছিল? বড় দলের বিপক্ষে ছোট দলের ক্ষেত্রে রেফারিং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক কেন বারবার ফিরে আসে?

ফুটবলে রেফারির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত — এটি নিয়ম। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ফুটবলে দর্শকদের প্রত্যাশা ছিল, সন্দেহের জায়গাগুলো অন্তত প্রযুক্তি দিয়ে স্বচ্ছ করা হবে। অনেক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকের মতে, এই ম্যাচে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।

📊 সংক্ষিপ্ত স্কোর ও উল্লেখযোগ্য পরিসংখ্যান

তথ্যবিবরণ
ফলাফলআর্জেন্টিনা ৩–২ মিসর
গোলদাতা (মিসর)ইয়াসের ইব্রাহিম ১৫’, মোস্তাফা জিকো ৬৭’
গোলদাতা (আর্জেন্টিনা)ক্রিস্টিয়ান রোমেরো ৭৯’, লিওনেল মেসি ৮৩’, এঞ্জো ফার্নান্দেজ ৯২’
মেসির মিস করা পেনাল্টি২২’ (ঠেকান গোলরক্ষক মোস্তাফা শৌবির)
এঞ্জোর গোলবিশ্বকাপ ইতিহাসের ৩,০০০তম গোল
আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তন১৯৬৫ সালের পর প্রথম দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও জয়

এরপর কী

এই জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা, যেখানে শনিবার ক্যানসাস সিটিতে তাদের প্রতিপক্ষ কলম্বিয়া অথবা সুইজারল্যান্ড। ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পথ টিকে থাকলেও প্রতিটি ধাপে তাদের কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মিসরের জন্য এই বিদায় হৃদয়বিদারক হলেও তাদের এই লড়াই বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে থাকবে। কোচ হোসাম হাসানের ভাষায় তাঁর কাজ শেষ, তবে মিসরের এই পারফরম্যান্স এবং ম্যাচ ঘিরে ভিএআর বিতর্ক দীর্ঘদিন আলোচিত হতে থাকবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

সূত্র: রয়টার্স ম্যাচ রিপোর্ট ও লাইভ গ্রাফিক, প্রথম আলো

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments