ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন কিছু নাম থাকে, যাদের খুঁজতে গেলে পরিসংখ্যানের বই খুলতে হয় না। খুলতে হয় ইতিহাসের বই।
শাপুর জাদরান সেই বিরল নামগুলোর একটি।
মাত্র ৩৮ বছর বয়সে থেমে গেল তাঁর জীবন। কিন্তু আফগানিস্তানের ক্রিকেটে তাঁর গল্প থামার নয়। কারণ তিনি শুধু একজন বাঁহাতি পেসার ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি অসম্ভব স্বপ্নের প্রথম বিশ্বাসীদের একজন।
আজকের আফগানিস্তানকে দেখলে অনেকেই বিস্মিত হন। বিশ্বকাপে বড় দলকে হারায়, আইসিসি টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালের লড়াই করে, বিশ্বের সেরা লিগে তাদের ক্রিকেটাররা আলো ছড়ান। কিন্তু এই গল্পের প্রথম অধ্যায় লেখা হয়েছিল অনেক কঠিন কালি দিয়ে।
সেই কালির নাম—সংগ্রাম।
আর সেই সংগ্রামের অন্যতম মুখ—শাপুর জাদরান।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশ। অনিশ্চয়তায় ভরা শৈশব। ক্রিকেট ছিল বিলাসিতা, টিকে থাকাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতা থেকে উঠে এসে নতুন বল হাতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দাঁড়িয়ে পড়া—এটাই ছিল শাপুরের সবচেয়ে বড় অর্জন।
তাঁর বোলিং ছিল নিখুঁত কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
কিন্তু তাঁর সাহস নিয়ে কোনও বিতর্ক নেই।
২০০৯ সালে যখন তিনি আফগানিস্তানের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নামেন, তখন প্রতিটি ম্যাচ ছিল নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের লড়াই। প্রতিটি উইকেট ছিল পৃথিবীকে জানিয়ে দেওয়া—আফগানিস্তান শুধু যুদ্ধের সংবাদ নয়, ক্রিকেটেরও সংবাদ হতে চায়।
২০১৫ বিশ্বকাপের সেই বিকেলটি আজও আফগান ক্রিকেটের স্মৃতিতে অমলিন। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে আসে বিশ্বকাপে প্রথম জয়। শাপুর সেখানে শুধু একজন বোলার ছিলেন না; ছিলেন লড়াইয়ের প্রতীক। বল হাতে আঘাত করেছেন, ব্যাট হাতে শেষ ধাক্কাটাও দিয়েছেন।
কিছু জয় স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে।
কিছু জয় লেখা থাকে একটি জাতির আত্মবিশ্বাসে।
শাপুর ছিলেন সেই দ্বিতীয় গল্পের নায়ক।
তিনি কখনও বিশ্বতারকা হননি। কোটি ডলারের চুক্তি পাননি। ব্যালন ডি’অর কিংবা আইসিসির বর্ষসেরা হওয়ার আলোও তাঁর গায়ে পড়েনি।
কিন্তু ইতিহাসের নির্মাতারা সব সময় আলোয় দাঁড়িয়ে থাকেন না।
অনেকে ভিত গড়ে দেন। তারপর অন্যরা সেই ভিতের ওপর প্রাসাদ বানান।
আজকের রশিদ খান, রহমানউল্লাহ গুরবাজ কিংবা আফগানিস্তানের নতুন প্রজন্ম যে আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নামে, তার পেছনে শাপুর জাদরানের মতো মানুষদের ঘাম শুকিয়ে আছে।
মৃত্যু মানুষকে থামিয়ে দেয়।
অবদানকে নয়।
শাপুর জাদরানের নাম হয়তো বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল তালিকায় লেখা থাকবে না। কিন্তু আফগান ক্রিকেটের ইতিহাস লেখা হলে প্রথম কয়েকটি পাতায় তাঁর নাম মোটা অক্ষরেই থাকবে।
কারণ সব নায়ক ট্রফি জেতেন না।
কেউ কেউ শুধু পথ বানিয়ে দেন।
আর সেই পথ ধরেই একদিন একটি দেশ বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে নিজের জায়গা করে নেয়।



