রক্ষণভাগের ভুল ও ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতায় গ্রুপ রানার্সআপ মারিয়ারা; সিনিয়রদের পেশাদারত্ব নিয়ে পিটার বাটলারের প্রশ্ন
গোয়া | ০১ জুন ২০২৬
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের গ্রুপ পর্বের অলিখিত ফাইনালে ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামে ৩১ মে ২০২৬ রাতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছে বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল। রক্ষণভাগের মারাত্মক ভুল, মাঠের চিরচেনা বোঝাপড়ার অভাব এবং স্ট্রাইকারদের ফিনিশিং ব্যর্থতার কারণে হ্যাটট্রিক মিশনের এই ম্যাচে বড় ব্যবধানে হারতে হয়েছে মারিয়া-মনিকাদের। এই পরাজয়ের ফলে ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ হিসেবে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ, যেখানে আগামী ৩ জুন তাদের কঠিন প্রতিপক্ষ গ্রুপ ‘এ’র চ্যাম্পিয়ন নেপাল। ম্যাচ শেষে হারের দায় খেলোয়াড়দের ওপর চাপিয়ে তাঁদের পেশাদারত্ব ও নিবেদন নিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধান কোচ পিটার বাটলার।
মাঠের চেনা ছন্দহীনতা ও রক্ষণের মারাত্মক বিপর্যয়
ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট বাংলাদেশের মেয়েরা কিছুটা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার চেষ্টা করলেও ধীরে ধীরে খেলার নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় ভারত। বিশেষ করে বাংলাদেশের রাইট উইংয়ে এদিন শামসুন্নাহার জুনিয়র ছিলেন অনেকটাই নিষ্প্রভ, যার ফলে গোটা দলই নিজেদের ছায়া হয়ে মাঠে অবস্থান করে। শুরুর দিকে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারের ভুলে বল পেয়ে বাংলাদেশের আনিকা সুযোগ তৈরি করলেও তাঁর শট সরাসরি ভারতীয় গোলকিপারের হাতে চলে যায়। এরপর মারিয়ার ক্রস থেকে শামসুন্নাহার জুনিয়র লাফিয়ে উঠেও মাথায় বলের নাগাল পাননি। প্রথমার্ধে আনিকার ওই একটি শট ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো অন-টার্গেট শট ছিল না।
ম্যাচের ৩৬ মিনিটে রক্ষণের এক মুহূর্তের অসতর্কতায় প্রথম গোল হজম করে বাংলাদেশ। দলের নিয়মিত সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকারকে এই প্রথম একাদশের বাইরে রেখে সুরমা জান্নাতকে সুযোগ দিয়েছিলেন কোচ বাটলার। নিজেদের সীমানা থেকে ভারতের ডিফেন্ডার নির্মলা দেবী একটি লম্বা বল বাড়ান। সেটি ক্লিয়ার করতে সুরমা জান্নাত হেড করলেও বল সামনে না গিয়ে উল্টো পেছনে চলে যায়, যেখানে অরক্ষিত ছিলেন ভারতীয় স্ট্রাইকার পিয়ারি জাজা। এমন সুবর্ণ সুযোগে নিখুঁত কোনাকুনি শটে বাংলাদেশের গোলকিপার মিলিকে পরাস্ত করেন ওডিশার ক্লাব নিতা স্পোর্টস একাডেমিতে খেলা পিয়ারি। এটি জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ৪৫তম ম্যাচে ২০তম গোল।
পেনাল্টি ও শেষ মুহূর্তের গোলে সুরমাদের খেই হারানো
দ্বিতীয়ার্ধে বাংলাদেশ দল খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও স্ট্রাইকারদের ফিনিশিং দুর্বলতার কারণে বারবার ভেস্তে যায় সমতায় ফেরার সুযোগ। ম্যাচে গতি ফেরাতে ৬৫ মিনিটে একসঙ্গে তিনটি বড় পরিবর্তন আনেন কোচ পিটার বাটলার। স্ট্রাইকার আনিকার জায়গায় নামেন সাগরিকা, মনিকার পরিবর্তে শিউলি আজিম এবং শামসুন্নাহার জুনিয়রের জায়গায় উমেলাহ মারমা মাঠে নামেন। তবে কোচের এই কৌশলগত পরিবর্তনও কাজের কাজ করতে পারেনি।
উল্টো ম্যাচের ৭৭ মিনিটে সুরমা জান্নাত ভারতের বদলি ফরোয়ার্ড মালাভিককে ডি-বক্সে ফেলে দিলে ভুটানি রেফারি ওম চোকি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। পেনাল্টি থেকে ভারতের আরেক বদলি খেলোয়াড় লিয়েন্ডা সহজেই মিলিকে পরাস্ত করে ব্যবধান ২-০ করেন। এরপর খেলা শেষের ঠিক আগ মুহূর্তে ৮৯ মিনিটে মালবিকা তৃতীয় গোলটি করলে বাংলাদেশের রক্ষণভাগ পুরোপুরি ছত্রখান হয়ে পড়ে এবং ৩-০ গোলের বড় পরাজয় নিশ্চিত হয়।
📦 ম্যাচের সারসংক্ষেপ
- ম্যাচের ফলাফল: ভারত ৩-০ গোলে জয়ী হয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন এবং বাংলাদেশ রানার্সআপ হিসেবে সেমিফাইনালে।
- ম্যাচের ভেন্যু: ভারতের গোয়ার মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়াম।
- গোল সময়রেখা: ৩৬ মিনিটে পিয়ারি জাজা, ৭৭ মিনিটে লিয়েন্ডা (পেনাল্টি) এবং ৮৯ মিনিটে মালবিকা।
- কৌশলগত পরিবর্তন: মালদ্বীপ ম্যাচের একাদশ থেকে ডিফেন্ডার আফঈদা খন্দকার ও উমেলাহ মারমাকে বেঞ্চে রেখে সুরমা জান্নাত ও মনিকাকে নামানো হয়।
📊 সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে দুই দেশের মুখোমুখি পরিসংখ্যান
সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ইতিহাসে দুই দেশের মাঠের লড়াইয়ের একটি সংক্ষিপ্ত ডেটা ব্রেকডাউন নিচে দেওয়া হলো:
| বিষয় | পরিসংখ্যান |
|---|---|
| মোট মুখোমুখি ম্যাচ | ৮ বার |
| ভারতের জয় | ৫টি |
| বাংলাদেশের জয় | ২টি |
| ড্র ম্যাচ | ১টি |
| ভারতের মোট গোল | ২২টি |
| বাংলাদেশের মোট গোল | ৭টি |
💬 কোচের বিস্ফোরক মন্তব্য ও খেলোয়াড়দের কাঠগড়ায় তোলা
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে প্রধান কোচ পিটার বাটলার দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের পেশাদারত্ব ও অনুশীলনের মানসিকতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে সরাসরি গণমাধ্যমের সামনে বলেন:
“আমি আসলে দলটাকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করছি; কারণ, আমি জানি কিছু খেলোয়াড় তাঁদের ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে চলে এসেছে। আমি খেলোয়াড়দের আগুনের মুখ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি, কারণ আমি জানি আসলে কী ঘটছে।”
খেলোয়াড়দের মাঠের বাইরের অলসতার তুলনা টেনে তিনি আরও বলেন:
“আপনি যদি একজন ভারতীয় খেলোয়াড়কে ওয়ার্ম-আপ করতে বলেন, সে দৌড়ে যাবে; কারণ সে মাঠে নামার জন্য উদগ্রীব। কিন্তু আমাদের কিছু খেলোয়াড়কে বললে তারা হেঁটে হেঁটে যায়, সময়মতো ওয়ার্ম-আপ এলাকায় যায় না।”
- গোয়ায় উপস্থিত সাংবাদিকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নেপালের কোচ সেমিফাইনালে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশকেই প্রতিপক্ষ হিসেবে বেশি পছন্দ করছিলেন, যা বাংলাদেশের এই হারের ফলে সত্যি প্রমাণিত হলো।
সেমিফাইনাল:
- ভারত ও বাংলাদেশ দুই দলই সেমিফাইনালে উঠেছে এবং ৩ জুন সেমিফাইনালের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে।
- গ্রুপ ‘এ’ থেকে শ্রীলঙ্কাকে ২-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ সেরা হয়ে সেমিতে এসেছে নেপাল।
⏭ সামনে সেমিফাইনালের কঠিন অগ্নিপরীক্ষা
গ্রুপ পর্বের এই বড় ধাক্কা সামলে নিয়ে আগামী ৩ জুন সেমিফাইনালে নেপালের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। কোচ পিটার বাটলার অবশ্য ব্যর্থতার মাঝেও আশাবাদী। তিনি জানিয়েছেন, ১ জুন থেকেই সব ঝেড়ে ফেলে দল আবার অনুশীলনে ফিরবে এবং নেপালের বিরুদ্ধে এমন একটি দল মাঠে নামানো হবে যারা আসলেই হৃদয় থেকে খেলতে চায়। সেমিফাইনালের এই অগ্নিপরীক্ষায় মারিয়ারা নিজেদের চেনা ছন্দ ফিরে পান কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
📌 তথ্যসূত্র:
- Official Data: বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ম্যাচ রিপোর্ট।
- Verified Local Media: প্রথম আলো ক্রীড়া ডেস্ক ও গোয়া থেকে পাঠানো বিশেষ প্রতিবেদন



