ছয়টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ঋণঝুঁকি, দুর্বল ব্যাংকের সংকট ও পরিবারকেন্দ্রিক পরিচালনা নিয়ে প্রশ্ন। আমানতকারীর অর্থ ফেরত, ব্যাংকের মালিকানা ও আর্থিক খাতের সংস্কার—কোন পথে সমাধান?
আপনার ব্যাংকে টাকা জমা আছে। প্রতিদিনের আয়, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসার খরচ কিংবা সারাজীবনের সঞ্চয়—সবকিছুর ভরসা সেই আমানত। কিন্তু কোনো এক সকালে ব্যাংকে গিয়ে যদি দেখেন, প্রয়োজনের সময় টাকা তুলতে পারছেন না, তখন কী হবে? এটি নিছক ভয় দেখানোর প্রশ্ন নয়। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সাম্প্রতিক সংকট আমানতকারীদের সামনে এমন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—ব্যাংক খাতে মূলধনের ঘাটতি কিংবা খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া মানেই সব ব্যাংক দেউলিয়া, অথবা সব আমানতকারী একসঙ্গে টাকা হারাবেন, এমন নয়। বরং এসব সূচক দেখায়, আর্থিক খাতের ঝুঁকি কতটা গভীর হয়েছে এবং তা মোকাবিলায় কত দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত বা সিআরএআর নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। ২০২৪ সালের শেষে এ হার ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ। একই সময়ে ২০টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ২ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর অর্থ, ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি সামাল দেওয়ার জন্য যে মূলধনী সুরক্ষা থাকা প্রয়োজন, তার জায়গায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও চলতি বছরের এপ্রিলে ওয়াশিংটনে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।
খেলাপি ঋণ ছয় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে
ব্যাংকিং খাতের সংকট বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক খেলাপি ঋণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর শ্রেণিকৃত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সে সময় মোট ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছিল খেলাপি। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায়, যা মোট ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
অর্থাৎ, ব্যাংকগুলো যে অর্থ ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছে, তার বড় একটি অংশ নিয়মিতভাবে ফেরত আসছে না। এতে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা, আমানতকারীর অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা—সবকিছুর ওপর চাপ তৈরি হয়। তবে শ্রেণিকৃত ঋণের পুরো অর্থ একই মুহূর্তে চিরতরে হারিয়ে গেছে, এমন নয়। কোনো ঋণের অংশবিশেষ আদায় হতে পারে, কোনোটি পুনঃতফসিল হতে পারে; আবার অনেক ক্ষেত্রে অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই কমে যায়। তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি কতটা অর্থ আদায় করা সম্ভব, কতটা প্রভিশন রাখা হয়েছে এবং ব্যাংকের প্রকৃত মূলধন কত—সেসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সব ব্যাংকের অবস্থা এক নয়
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৬ সালের মার্চভিত্তিক ব্যাংকিং খাতের হালনাগাদ তথ্যে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের মার্চে, এ হার ছিল ২৯ দশমিক ২ শতাংশ। একই সময়ে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত নয়টি চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ২ শতাংশে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশের তুলনায় বেশি।
তারল্য পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর অগ্রিম-আমানত অনুপাত বা অ্যাডভান্সেস-টু-ডিপোজিট রেশিও ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে ১২০ দশমিক ৩ শতাংশে দাঁড়ায়। সাধারণভাবে এ অনুপাত বোঝায়, ব্যাংকের আমানতের তুলনায় ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ কত। অনুপাত ১০০ শতাংশের বেশি হলে আমানতের বাইরে অন্যান্য উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে এবং তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কিন্তু ১২০ টাকা ঋণ দেওয়ার অর্থ এই নয় যে ব্যাংক সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঠিক ২০ টাকা ধার নিয়ে খেলাপিদের দিয়েছে। আমানত ছাড়াও ব্যাংকের অন্যান্য অর্থায়নের উৎস থাকতে পারে। তাই অনুপাতটি তারল্যঝুঁকির সতর্কসংকেত হলেও এর ব্যাখ্যা করতে হয় ব্যাংকের সম্পূর্ণ হিসাব, ধার ও অন্যান্য দায়ের তথ্যের ভিত্তিতে।
২০১৩ সালে নতুন ব্যাংক অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় নতুন লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৩ সালে একসঙ্গে নয়টি নতুন প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পায়। এগুলো হলো মেঘনা ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক—বর্তমানে এনআরবিসি ব্যাংক নামে পরিচিত—এবং পরে নাম পরিবর্তন করা গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক ও ফার্মার্স ব্যাংক, যা পরে পদ্মা ব্যাংক নামে পরিচিত হয়।
লাইসেন্স দেওয়ার সময়ই রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যাংকের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ও নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে বলা হয়, এ নয়টি ব্যাংকের কয়েকটি খেলাপি ঋণের ভারে বিপর্যস্ত; বাকিগুলোরও কিছুতে উল্লেখযোগ্য ঋণঝুঁকি দেখা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি অংশের মতে, যথাযথ আর্থিক প্রয়োজন ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা যাচাই না করে ব্যাংক অনুমোদন দিলে এমন সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তবে ২০১৩ সালে লাইসেন্স পাওয়া সব ব্যাংকের অবস্থা এক নয়। কোনো কোনো ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ও আর্থিক দুর্বলতা অনেক বেশি, আবার কয়েকটি তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাই কোনো ব্যাংককে মূল্যায়ন করতে হলে তার নিজস্ব আর্থিক বিবরণী, খেলাপি ঋণ, মূলধন, তারল্য ও পরিচালনব্যবস্থার তথ্য আলাদাভাবে দেখতে হবে।
ফার্মার্স ব্যাংকের সংকট এই বিতর্কের বড় উদাহরণ। ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই অনিয়ম ও তারল্যসংকটে পড়ে। পরে এর নাম হয় পদ্মা ব্যাংক। এ ধরনের অভিজ্ঞতা নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই, উদ্যোক্তার যোগ্যতা, পর্যাপ্ত মূলধন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীন তদারকির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
পরিবারকেন্দ্রিক পরিচালনা: আইন পরিবর্তনের প্রভাব
ব্যাংক পরিচালনায় পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাব নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। ২০১৭ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগে একটি পরিবার থেকে সর্বোচ্চ চারজনকে একই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। পরিচালকদের মেয়াদও আগের তুলনায় বাড়ানো হয়। এ পরিবর্তনের সমালোচকেরা বলেছিলেন, এতে কোনো কোনো ব্যাংকে উদ্যোক্তা পরিবারের নিয়ন্ত্রণ অতিরিক্ত শক্তিশালী হতে পারে এবং পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে।
ব্যাংক একটি সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয়। এর প্রধান সম্পদ আমানতকারীদের অর্থ, আর সেই অর্থের একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। ফলে ব্যাংকের পরিচালকেরা যদি নিজেদের বা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদন, তদারকি ও আদায় প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেন, তাহলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। আন্তর্জাতিকভাবে এ সমস্যাকে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি বা ‘রিলেটেড-পার্টি লেন্ডিং’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
নিজস্ব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়ন, যথাযথ জামানত, ঋণ পরিশোধের বাস্তব সক্ষমতা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না হলে ব্যাংকের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। আবার ঋণ খেলাপি হলে ঋণদাতা ব্যাংক যদি একই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে আদায়ের উদ্যোগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণেই ব্যাংকের মালিকানা, পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতা এবং স্বাধীন তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছয়টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর ঋণঝুঁকি
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন নিয়ে ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনে ছয়টি বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠী বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে একাধিক ব্যাংকের উল্লেখযোগ্য ঋণঝুঁকির কথা উঠে আসে। তালিকায় রয়েছে—সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আরামিট গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, শিকদার গ্রুপ, নাসা গ্রুপ এবং ওরিয়ন গ্রুপ।
‘সিলেক্টেড লিড ব্যাংকস, ইমপ্যাক্টেড বাই সিক্স গ্রুপস’ শিরোনামের ওই মূল্যায়নে বিভিন্ন ব্যাংকের এসব গোষ্ঠী-সম্পর্কিত ঋণ ও আদায়সংক্রান্ত ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়। কয়েকটি ব্যাংককে সংশ্লিষ্ট ঋণ উদ্ধারের সমন্বয়কারী বা ‘লিড ব্যাংক’ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও প্রতিবেদনে উঠে আসে। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি একাধিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঋণঝুঁকির তালিকায় রয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকের বড় অঙ্কের ঋণসম্পর্ক বা ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ থাকার তথ্য নিজে থেকেই প্রতিটি ঋণকে জালিয়াতি কিংবা আত্মসাৎ প্রমাণ করে না। সংশ্লিষ্ট ঋণ কোন শর্তে দেওয়া হয়েছিল, কতটা খেলাপি হয়েছে, জামানত কী ছিল এবং কোথায় অনিয়ম পাওয়া গেছে—এসবের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করতে হয়। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং আইনগত প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ব্যাংক ও এস আলম-সম্পর্কিত ঋণের প্রশ্ন
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ঋণ বিতরণে এস আলম গ্রুপের ভূমিকা নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিতর্ক চলছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংকের তৎকালীন নতুন চেয়ারম্যানের বক্তব্যের বরাত দিয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, ওই বছরের জুন শেষে ব্যাংকটির মোট বকেয়া ঋণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা এবং এস আলম গ্রুপ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকা বলে ব্যাংক-সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে দাবি করা হয়।
এই অঙ্ক ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওতে একটি গোষ্ঠীর বড় এক্সপোজারের প্রশ্ন সামনে আনে। তবে এ ধরনের ঋণের পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির নাম, অনুমোদনকারী পর্ষদ, ঋণের ব্যবহার, জামানত, পরিশোধের অবস্থা এবং পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এস আলম গ্রুপ ও ব্যাংক দখল, ঋণ বিতরণ এবং অর্থ স্থানান্তরসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৪ সালে ফিন্যানশিয়াল টাইমস-কে দেওয়া বক্তব্যে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। গ্রুপটি সেই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিল, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ফলে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্তের ফলাফল ও আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী ব্যাংকে নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ, নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক নিয়োগ এবং পরে কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কিন্তু কতজন নিয়োগ পেয়েছিলেন, কতজনের নিয়োগ প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, কতজনকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে কিংবা চাকরিচ্যুত করা হয়েছে—এসব সংখ্যার পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি ছাড়া সব দাবিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
ঋণ আদায়ে ‘লিড ব্যাংক’ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর ঋণ উদ্ধারে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে, তার লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ব্যাংকে ছড়িয়ে থাকা ঋণ, জামানত ও সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য এক জায়গায় এনে আদায়ের প্রক্রিয়া জোরদার করা। একাধিক ব্যাংকের ঋণ এক গোষ্ঠীর কাছে থাকলে পৃথকভাবে মামলা ও আদায়ের চেষ্টা অনেক সময় ধীর হয়। সমন্বিত উদ্যোগে ঋণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
তবে লিড ব্যাংক মনোনীত করলেই ঋণ উদ্ধার নিশ্চিত হয় না। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকের নিজস্ব স্বার্থের সংঘাত আছে কি না, ঋণের নথি কতটা নির্ভরযোগ্য, জামানতের মূল্য কত এবং দেশ-বিদেশে সম্পদ শনাক্ত করা যাচ্ছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আদায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকের সিদ্ধান্ত স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক হওয়া দরকার। একই সঙ্গে অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকলে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনগত সহযোগিতা প্রয়োজন হতে পারে।
ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অভিজ্ঞতা কী শেখায়?
ব্যাংকিং খাতে মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, একটি দেশের কাঠামো অন্য দেশের হুবহু অনুকরণ না করেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে পারে।
ভারতে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানা ও শাসনব্যবস্থায় শেয়ারহোল্ডারদের যোগ্যতা, নিয়ন্ত্রণের সীমা এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাব কমানোর নীতি অনুসরণ করে। তবে সেখানে সব ক্ষেত্রেই একক মালিকানার সীমা ১০ শতাংশ—এমন সরল ব্যাখ্যা সঠিক নয়। শেয়ারহোল্ডারের ধরন ও প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী সীমা ভিন্ন হতে পারে, আর অনুমোদিত শর্তে প্রমোটারদের মালিকানার কাঠামোও আলাদা। ভারতের ব্যাংকিং সংস্কার এবং দেউলিয়াত্ব নিষ্পত্তির ব্যবস্থা খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় ভূমিকা রেখেছে। দেশটির বাণিজ্যিক ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত ২০১৮ সালের উচ্চ পর্যায় থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংকিং ও বাণিজ্যিক ব্যবসার মধ্যে স্বার্থের সংঘাত সীমিত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আইন ও তদারকি ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেখানে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কোনো অবস্থাতেই ব্যাংকের মালিক হতে পারে না—এমন দাবি ঠিক নয়। শিল্পঋণ প্রতিষ্ঠান বা ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল লোন কোম্পানি’ নামে কিছু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা রয়েছে। ২০০৫ সালে ওয়ালমার্ট এমন একটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন চাইলে বড় বিতর্ক তৈরি হয়; পরে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি আবেদন প্রত্যাহার করে। এ অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রেও উদ্বেগ রয়েছে।
চীনে আর্থিক খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নজির আছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান হুয়ারংয়ের সাবেক চেয়ারম্যান লাই শিয়াওমিনের বিরুদ্ধে বিপুল ঘুষ নেওয়া ও দুর্নীতির মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ২০২১ সালের ২৯ জানুয়ারি। রয়টার্স জানিয়েছিল, আদালতের হিসাবে ঘুষের অঙ্ক ছিল ১৭৯ কোটি ইউয়ান, যা সে সময় প্রায় ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সমতুল্য। তবে একটি দুর্নীতির মামলায় কঠোর শাস্তির ঘটনা দিয়ে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাফল্য ব্যাখ্যা করা যায় না। কার্যকর তদারকি, স্বাধীন নিরীক্ষা, স্বচ্ছ ঋণ অনুমোদন ও দায়বদ্ধতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে নতুন প্রতিষ্ঠান
বাংলাদেশের ব্যাংকিং সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে আলোচিত পদক্ষেপগুলোর একটি হলো পাঁচটি দুর্বল ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংকটি গঠন করা হয়। এর লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের তারল্যসংকটে থাকা আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করা এবং ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমকে একটি কাঠামোর অধীনে আনা।
বাংলাদেশ ব্যাংক আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের জন্য ব্যাংকটিকে ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা নির্দিষ্ট হিসাব থেকে তাঁদের মূল আমানত প্রয়োজন অনুযায়ী তুলতে পারবেন বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশনা দেয়। মুনাফা কেটে নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করার নির্দেশও দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমানত ফেরত কার্যক্রম শুরু হলে বহু গ্রাহক আবেদন করেন এবং অর্থ উত্তোলনও করেন।
এ পদক্ষেপ আমানতকারীদের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হলেও পুনর্গঠিত ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নির্ভর করবে খেলাপি ঋণ উদ্ধার, পর্যাপ্ত মূলধন, সুশাসন, নতুন আমানত সংগ্রহ এবং স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার ওপর। শুধু নতুন নাম ও একীভূত কাঠামো তৈরি করলেই আর্থিক দুর্বলতা দূর হয় না।
সাবেক মালিকদের ফেরার সুযোগ নিয়ে বিতর্ক
ব্যাংক পুনর্গঠনের আইনি কাঠামো নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ২০২৬ সালের এপ্রিলে পাস হওয়া ব্যাংক রেজুলেশন আইনে ১৮(ক) ধারা যুক্ত করা হয়। ওই বিধানে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে একীভূত বা পুনর্গঠনাধীন দুর্বল ব্যাংকের সাবেক মালিক বা পরিচালকদের আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছিল। শর্ত অনুযায়ী, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অগ্রিম দিয়ে অবশিষ্ট ৯২ দশমিক ৫ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে ১০ শতাংশ সরল সুদে পরিশোধের ব্যবস্থা ছিল।
সমালোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ বিধান দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুরোনো নিয়ন্ত্রণকারীদের আবার ফিরে আসার সুযোগ দিতে পারে। তাঁদের যুক্তি ছিল, যেসব ব্যাংক অনিয়ম, ঋণঝুঁকি ও তারল্যসংকটে পড়েছে, সেগুলোর পুনর্গঠনের উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে যদি পুরোনো মালিকেরা তুলনামূলক সহজ শর্তে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পান।
বিষয়টি নিয়ে সমালোচনার পর ২০২৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ব্যাংক রেজুলেশন (সংশোধন) আইন পাস হয়। এতে বিতর্কিত ১৮(ক) ধারা বাতিল করা হয়। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সংসদে জানান, ওই বিধানের শর্ত পূরণ করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন করেনি বলেই এটি বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা দেখায়, ব্যাংক সংস্কারে শুধু আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়, আইন প্রণয়নের স্বচ্ছতা এবং জনআস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে আপনার আমানত কতটা নিরাপদ?
ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ এবং তারল্যসংকট নিয়ে উদ্বেগ বাস্তব। কিন্তু একটি ব্যাংকের সিআরএআর ঋণাত্মক হওয়া, কোনো ব্যাংকের ঋণের বড় অংশ খেলাপি হওয়া এবং সব আমানতকারীর টাকা একই মুহূর্তে হারিয়ে যাওয়া—এগুলো এক বিষয় নয়। ব্যাংকভেদে আর্থিক অবস্থা ভিন্ন। তাই আমানতকারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী, তারল্য, মূলধন, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা এবং কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা।
এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, ব্যাংকের মালিকানা ও পরিচালনা পর্ষদে স্বার্থের সংঘাত কমানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধি কার্যকর করা। দ্বিতীয়ত, ঋণ অনুমোদন ও আদায়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত, ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ও পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বোর্ডে থাকার নিয়ম এমনভাবে নির্ধারণ করা, যাতে কোনো পরিবার বা গোষ্ঠী ব্যাংকের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। চতুর্থত, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, একীভূতকরণ অথবা প্রয়োজনে অবসায়নের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমানতকারী ও আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে—শুধু প্রভাবশালী মালিকের স্বার্থে নয়।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকির স্বাধীনতা, নিরীক্ষার মান, খেলাপি ঋণ শ্রেণিকরণের যথার্থতা এবং অর্থ উদ্ধারের অগ্রগতি জনসমক্ষে প্রকাশ করা প্রয়োজন। ঋণখেলাপি ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্তের ফলাফলও স্বচ্ছভাবে জানাতে হবে, যাতে অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য বজায় থাকে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, আর তা এক রাতেই দূর করাও সম্ভব নয়। তবে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ, কঠোর তদারকি, ঋণ আদায় এবং রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবমুক্ত ব্যাংক পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে আস্থা ফিরিয়ে আনার পথ তৈরি হতে পারে। ব্যাংক শুধু টাকা রাখার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পরিবার, ব্যবসা, কৃষি, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাই ব্যাংকিং খাতের সংস্কার মানে শুধু কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসাব ঠিক করা নয়—মানুষের সঞ্চয় ও অর্থনীতির প্রতি আস্থা রক্ষা করা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, রয়টার্স, ফিন্যানশিয়াল টাইমস, বাসস, রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া




