বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ করেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংকের নতুন পূর্বাভাস সরকারের নির্ধারিত ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যের চেয়ে অনেক নিচে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরও অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি নেই
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে পুনরুদ্ধার প্রত্যাশা করা হয়েছিল, তা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। বিনিয়োগে দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা, কম ঋণপ্রবাহ এবং সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি টানা তৃতীয় বছরের প্রবৃদ্ধি কমার চিত্র। এর আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি।
ব্যাংক খাত ও বিনিয়োগে বড় চাপ
বিশ্বব্যাংক বলছে, বেসরকারি বিনিয়োগ টানা দ্বিতীয় বছরের মতো কমেছে। উচ্চ সুদের হার, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতের সমস্যা নতুন বিনিয়োগে বাধা দিচ্ছে। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
জুন ২০২৬-এ ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছেছে। মার্চে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
রপ্তানি খাতেও স্বস্তির বার্তা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চাহিদা দুর্বল থাকা এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধিতে চাপ থাকতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের নতুন চাপ
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬ শতাংশের মতো থাকতে পারে। দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং প্রকৃত মজুরিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সংস্থাটির হিসাবে, তিন ডলার দৈনিক আয়কে দারিদ্র্যসীমা হিসেবে ধরলে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সীমার নিচে থাকা মানুষের হার বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে উঠেছে। এতে আগের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে ওই দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে বলে অনুমান করেছে বিশ্বব্যাংক।
সামনে সংস্কারই বড় পরীক্ষা
বিশ্বব্যাংক বলছে, অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করাতে ব্যাংক খাত সংস্কার, রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং জ্বালানি খাতের সমস্যার দ্রুত সমাধান জরুরি। আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। তবে সেই পুনরুদ্ধার কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং কাঠামোগত সংস্কারের অগ্রগতির ওপর।
তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ; রয়টার্সের দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ




